তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুকুল রায় কি আবার বিজেপিতে?

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৩, ১০:১৮

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম হয় মমতা ব্যানার্জী ছাড়া আর যে কয়েকজনের হাতে, তাদের অন্যতম মুকুল রায় এখন কোন দলে আছেন, তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে তুমুল আলোচনা চলছে। আবার তার পুত্র শুভ্রাংশু রায় 'বাবা নিখোঁজ হয়ে গেছেন' বলে পুলিশের কাছে ডায়েরি দায়ের করেছিলেন। 

তিনিই আবার সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, তার বাবা মানসিকভাবে অসুস্থ। আবার এই আলোচনাও হচ্ছে যে কোনো কেন্দ্রীয় তদন্ত থেকে নিজেকে এবং ছেলেকে বাঁচাতেই কি তিনি বিজেপিতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন?

মুকুল রায়

মুকুল রায় তৃণমূল কংগ্রেস দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং মমতা ব্যানার্জীর একদা ঘনিষ্ঠ নেতা হলেও ২০১৭ সালে নাটকীয়ভাবে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাকে ২০২১ সালে বিজেপি বিধানসভা ভোটে দাঁড় করিয়েছিল আর তিনি জিতে বিধায়কও হন।

ভোটের পরে হঠাৎ তিনি ফিরে আসেন তার পুরনো দল তৃণমূল কংগ্রেসে। দলীয় কার্যালয়ে খোদ মমতা ব্যানার্জীর উপস্থিতিতে তাকে দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এসময় তার গলায় পরিয়ে দেওয়া হয় উত্তরীয়। এর পরে বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকেন তিনি এবং সোমবার (১৭ এপ্রিল) রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হয়ে যান। 

দলীয় কার্যালয়ে খোদ মমতা ব্যানার্জীর উপস্থিতিতে তাকে দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

পরে তাকে দিল্লি বিমানবন্দরে দেখা যায়। এরপরেই মুকুল রায় দিল্লি থেকে নিজেই ঘোষণা করেছেন, তিনি বিজেপিতেই ছিলেন, বিজেপিতেই থাকবেন। তিনি সজ্ঞানে দিল্লিতে গেছেন এবং বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করবেন এটাও বলেছেন বুধবারের (১৯ এপ্রিল) সংবাদ সম্মেলনে।

মুকুল রায় বলেছেন, 'আমি বিজেপিতে ছিলাম, বিজেপিতেই থাকব। মাঝে অসুস্থ ছিলাম, এখন সুস্থ হয়েছি। বিজেপি যা কাজ দেবে, সেটাই করব।' অথচ মমতা ব্যানার্জীর উপস্থিতিতেই রায় এবং তার পুত্র দুইজনেই তৃণমূল কংগ্রেসে ফিরে এসেছিলেন ২০২১ সালে।

পরে তাকে দিল্লি বিমানবন্দরে দেখা যায়।

মুখ্যমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, 'কে দিল্লি যাবে, না বম্বে যাবে না পাঞ্জাবে যাবে সেটা তার ব্যাপার। তিনি বিজেপির বিধায়ক আছেন। তার ছেলে যে অভিযোগ করছেন তার ভিত্তিতে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। হতেই পারে যে ওঁকে ভয় দেখানো হয়েছে।'

যদিও মুকুল রায় তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু বিজেপির বিধায়কই রয়ে গেছেন খাতায় কলমে। তার বিধানসভার সদস্যপদ খারিজ করার জন্য বিজেপি আদালতে মামলাও করেছে। 

বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার

বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেন, 'মুকুল রায় বিজেপির বিধায়ক। বিজেপির টিকিটে জিতেছেন। যদিও তার সদস্যপদ খারিজের জন্য আমরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি, কারণ উনি তৃণমূলের পতাকা গ্রহণ করেছেন। এর বেশি এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।'

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অরুন্ধতী মুখার্জী জানিয়েছেন, মুকুল রায় যে সব কথা বলেছেন এবিপি আনন্দ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে, তাতে মনে হচ্ছে ওর ছেলে যে মানসিক অসুস্থতার কথা বলছেন, সেটাই সঠিক। তিনি বলছেন যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সিপিআইএম দলকে হঠানোই বিজেপির লক্ষ্য হওয়া উচিত।

'মুকুল রায় বিজেপির বিধায়ক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অরুন্ধতী মুখার্জী প্রশ্ন করেন, 'ওই সাক্ষাতকারের এক জায়গায় তিনি বলেছেন, বাংলায় যদি সার্বিকভাবে সিপিএম ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দল করতে হয়, তৃণমূলের বিরুদ্ধে দল করতে হয়, তাহলে তৃণমূলের বিরুদ্ধেই থাকা উচিত। এইসব বাক্যগুলো তো সুস্থ মস্তিষ্কে কোনও রাজনৈতিক নেতা বলতে পারেন না। ২০১১ সালে সিপিএম ক্ষমতা থেকে সরে গেছে, তাদের হঠানোর কথা আসবে কেন!'

অরুন্ধতী মুখার্জী জানিয়েছেন, কিছুদিন আগে তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার হয় আর তারপর থেকেই অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছিলেন। বেশ কিছুদিন তো রায় প্রকাশ্যেই আসেন নি। রায়ের ছেলে শুভ্রাংশু রায় গত দুইদিনে একাধিকবার সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন যে তার বাবার মানসিক ভাবে অসুস্থ।

 সিপিএম

তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, 'তিনি নিজেই কিছুদিন আগে বলেছিলেন যে বিজেপিতে নাকি তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কাজ করতে পারছেন না। সেদিনের মুকুল বাবু ঠিক না আজকের মুকুল বাবু ঠিক, সেটাই তো বুঝতে পারছি না আমরা। ব্যাপারটা অনেকটা হয়ে যাচ্ছে সোম, বুধ, শুক্র একটা দলে আবার মঙ্গল, বৃহস্পতি আর শনিবার আরেক দলে, রোববারটা বিশ্রাম। উনি নিজেই একটা সিদ্ধান্ত নিন যে কোন দলে থাকবেন।'

তবে একই সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস বলছে, তাকে কোনও কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি দিয়ে ভয়ও দেখানো হয়ে থাকতে পারে। চক্রবর্তীর কথায়, 'বিজেপি যখনই কাউকে কব্জা করতে পারছে না, তখনই এজেন্সিগুলোকে ব্যবহার করছে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ক্ষেত্রে করেছে, আমাদের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জীর ক্ষেত্রে চেষ্টা করেছে। এখানেও হয়তো সেভাবেই মুকুল বাবুকে কোনোভাবে ভয় দেখানো হয়েছে।'

তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী

তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান নেত্রী সবসময়েই মমতা ব্যানার্জীই ছিলেন, কিন্তু তার ভূমিকা আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে। অন্যদিকে, ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসারও অনেক আগে থেকে মুকুল রায় দলের সংগঠন চালাতেন।

অরুন্ধতী মুখার্জী বলেন, 'একসময়ে সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাসের যেরকম সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল, মুকুল রায়ও ছিলেন তৃণমূলের মূল সংগঠক। প্রতিটা জেলায় তার নিজস্ব নেটওয়ার্ক ছিল। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পরেও দীর্ঘদিন তিনিই সংগঠনের হাল ধরে রেখেছিলেন। সংগঠন বিস্তারেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।'

তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান নেত্রী সবসময়েই মমতা ব্যানার্জীই ছিলেন, কিন্তু তার ভূমিকা আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে।

রায় একাধিকবারের সংসদ সদস্য ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে, কিছুদিনের জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হয়েছিলেন। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পরে সিপিআইএমসহ নানা বামপন্থী দল আর কংগ্রেস থেকে অনেক নেতা-নেত্রী তৃণমূলে চলে আসেন। 

বলা হয়ে থাকে, মুকুল রায়ই অন্যান্য দল থেকে ‘নেতা ভাঙ্গিয়ে’ নিয়ে আসতেন। আবার ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বহু তৃণমূল কংগ্রেস নেতা-মন্ত্রী বিজেপিতে যোগ দেন। আবার ভোটে বিজেপির হারের পরেই মুকুল রায়সহ তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়া অনেক নেতা নেত্রী মমতা ব্যানার্জীর দলে ফিরে আসেন।

এক সময়ে যে মুকুল রায়ের হাত ধরে দলবদল হত, এখন তিনি নিজে কোন দলে রয়েছেন, সেটা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এবং রাজনীতিকদের কাছে মুখরোচক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। নানা ধরনের মীম ছড়াচ্ছে সামাজিক মাধ্যমেও।

ইত্তেফাক/ডিএস