সারা দেশে বিরাজ করছে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ। চলতি মাসের শুরু থেকেই চরম গরম। বিরূপ আবহাওয়ায় একটা ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে বেশ কয়েক দিন ধরেই। এখন এটা বাস্তবে ঘটতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে গতকাল বিশেষত উপকূল এলাকায় মহাবিপদ সংকেত জারি করা হয়েছে। এটাই এখন দেশের বড় খবর।
দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ক্রমান্বয়ে নিম্নচাপ ও গভীর নিম্নচাপে রূপ নিচ্ছে। গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিয়ে সৃষ্টি হলো মোখা। মোখা উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাষ অনুযায়ী এটি শিগগির উলটো দিকে ঘুরে যাবে। দিক পরিবর্তন করে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকবে। তখন ঘূর্ণিঝড়টি চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও মিয়ানমার উপকূলের মাঝামাঝি বরাবর অগ্রসর হতে পারে। এমনকি এটি সুপার সাইক্লোনেও রূপ নিতে পারে, এমনটাই জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। আজ সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আমাদের চলাফেরায় সাবধান হতে হবে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাতাসের গতিবেগ ৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটার হলে সেটি হয় সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড়। গতিবেগ ৮৮ থেকে ১১৭ কিলোমিটার হলে তাকে বলা হয় তীব্র ঘূর্ণিঝড়। বাতাস যদি ১১৭ থেকে ২০০ কিলোমিটার বেগে হয়, তবে তা অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড়। ২২০ কিলোমিটার ওপরে বাতাসের গতিবেগ উঠলে তাকে বলা হয় সুপার সাইক্লোন।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ইন্টিগ্রেটেড ফোরকাস্টিং এ-যাবত মোখার ৫১টি মডেল তৈরি করেছেন। এই মডেলগুলোর বেশির ভাগ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানবে। মোখার কেন্দ্র কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপ, টেকনাফ, কুতুবদিয়া ও মহেশখালাী। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে সতর্ক সংকেত দেখানো হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে ও গভীর সাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে নিরাপদ স্থানে থাকতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৫১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে, কক্সবাজার সমুদ্র বন্দর থেকে ১ হাজার ৪৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে, মোংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ১ হাজার ৫১০ কিলোমিটার দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৪৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছে নিম্নচাপটি। গভীর নিম্নচাপ কেন্দ্রের ৪৮ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের নদীবন্দরগুলোতেও সর্তকতা সংকেত দেখানো হয়েছে।
এ ঘূর্ণিঝড়ের নাম নিয়েও বিভ্রান্তি আছে। কেউ বলে মোকা, কেউ মোচা, আবার অনেকে ডাকেন মোখা। ঘূর্ণিঝড়টির নামকরণ করেছে লোহিত সাগর তীরবর্তী দেশ ইয়েমেন। ইংরেজিতে নাম ‘Mocha’। যার বাংলা মোচা নাকি মোকা? তা নিয়েই প্রবল বিতর্ক। ইয়েমেনের রাজধানী শহর সানার একটি বন্দরের নাম ‘মোখা’ বা ‘মুখা’, যা উচ্চারণ করা হয় মোকা হিসেবে। দুনিয়া জুড়ে কফি রপ্তানির জন্য বিখ্যাত ইয়েমেন। সুতরাং কফিপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত নাম ‘মোকা’। সেই অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরে ক্রমশ সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নাম ‘মোকা’ বা ‘মোখা’। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থা ঘূর্ণিঝড়ের নাম ঠিক করে থাকে। সেই আঞ্চলিক আবহাওয়া সংস্থার সদস্য দেশ ১৩টি। এবার সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নাম হিসেবে ইয়েমেনে ব্যবহূত শব্দ মোখা রাখা হয়েছে। এটি একটি কফির নামও।
২০০৭ সালে ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরে বাতাসের গতিবেগ ছিল ২২৩ কিলোমিটার। প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র থেকে আমরা বুঝতে পারি, সচেতনতা একমাত্র পথ, যা আমাদের রক্ষা করতে পারে। যদিও অনেকে সচেতন, তবু বিষয়টি অনেকে আবার আমলে নেয় না। কোনো ঘূর্ণিঝড় দেখা দিলে সরকার মানুষের সুরক্ষায় ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেয়, যা ইতিবাচক। এক্ষেত্রে উপকূলীয় এলাকার মানুষকেও আরো দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। নিকট অতীতের ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় এলাকার দুর্বল বাঁধের কারণে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বর্তমান এলাকায় উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকায় যে মানের বাঁধ রয়েছে তাতে অনুমান করা যায়, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হবেই। তাই উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ জরুরি। জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলের নিম্নাঞ্চলের মানুষের কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে, তা বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জোর তাগিদ দিতে হবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে আগাম ব্যবস্থা ও সর্বোচ্চ সর্তকতা গ্রহণ করা উচিত। আম্পানের ক্ষেত্রে আগাম ও সর্তকতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্ধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে পূর্বপ্রস্তুতি ও সর্তকতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এমনিতে বহু মানুষের আয়-রোজগারের পথ সুঠাম নয়, তার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতিতে মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়বে। তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে আসতে হবে। সচেতনতায় ক্ষয়ক্ষতি রোধ করতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
