বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। সম্রাট বাবরের মুঘল আমল থেকে পাকিস্তান আমল, মোট পাঁচ বার ঢাকাকে রাজধানী করা হয়েছে। বর্তমানে এই রাজধানী শহরে প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ বসবাস করে। আর এই মানুষগুলোর কারো কাছে ঢাকা ভালোবাসার শহর, কারো কাছে জাদুর শহর আবার কারো কাছে মায়ার শহর।
তবে এই অপূর্ব ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানের রয়েছে লুকিয়ে থাকা রূপ, রয়েছে নামকরণের মজাদার ইতিহাস। গেণ্ডারিয়া, ভূতের গলি, মহাখালী, মাহুতটুলি, পিলখানা, এলিফ্যান্ট রোড, ইন্দিরা রোড, কাকরাইল, রমনাপার্ক, গোপী বাগ, পরীবাগ, পুরানো পল্টন, পাগলা পুল, ফার্মগেট কিংবা বকশিবাজার এলাকা গুলোর নামকরণের পিছনে রয়েছে বিভিন্ন ইতিহাস। তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের মজাদার ইতিহাস।
গেণ্ডারিয়া
ঢাকা শহরের একসময়কার বিখ্যাত এলাকা ছিল গ্র্যান্ড এরিয়া। তৎকালীন জমিদার ও প্রভাবশালীদের বাস ছিল বলে ইংরেজরা এমন নাম দিয়েছিল। কিন্তু বাঙালিদের কাছে নামটি কঠিন লাগায় তারা গ্র্যান্ড এরিয়াকে নিজেদের মতো করে গেণ্ডারিয়া করে নিয়েছিল। তবে এই তত্ত্বের বিরুদ্ধমতও আছে। অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, এলাকাটিতে নাকি একসময় প্রচুর গেণ্ডারি বা আখ জন্মাত। আর সেখান থেকেই এসেছে গেণ্ডারিয়া নামটি।
ভুতের গলি
এলাকাটি বিখ্যাত তার নামের কারণে। কারণ নামটি যে ভূতের গলি! পূর্বে এখানে এক ইংরেজ সাহেব বাস করতেন। নাম তার মিস্টার বুথ। ওই এলাকায় তিনিই ছিলেন প্রথম কোনো ইংরেজ সাহেব। তাই তার নামানুসারে জায়গাটির নাম হয়েছিল বুথের গলি। কিন্তু কালানুক্রমে বুথের গলি ভূতের গলিতে পরিণত হলো।
মহাখালি
জানা যায়, মহা কালী নামের এক মন্দীরের নাম থেকে হয়েছে বর্তমানের মহাখালী।
মাহুতটুলি
মাহুত অর্থ হস্তিচালক। যারা হাতির পোষ মানানো ও দেখাশোনার কাজ করে তাদের মাহুত বলা হয়। মোগল শাসনামলে হাতির সাথে সাথে ঢাকায় এসেছিল বিপুল সংখ্যক মাহুতও। তারা নিজেদের বসবাসের জন্য যে এলাকাটি গড়ে তুলেছিল, সেটিই আজ পরিচিত মাহুতটুলি নামে।
পিলখানা
পিলখানা নামটিও এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। ফারসি ভাষায় ‘পিল’ অর্থ হাতি আর ‘খানা’ অর্থ জায়গা। পিলখানা মানে হাতি রাখার জায়গা। মুঘল শাসকদের খুব পছন্দের একটি খেলা ছিল হাতির লড়াই। তাই সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে হাতি এনে রাখা হতো ধানমণ্ডির এক এলাকায়। যা পরবর্তীতে লোকমুখে পরিচিতি পেয়ে যায় পিলখানা হিসেবে।
এলিফ্যান্ট রোড
পিলখানা হতে হাতিগুলোকে নিয়ে যাওয়া হতো হাতির ঝিলে গোসল করাতে, তারপর রমনা পার্কে নেওয়া হতো রোদ পোহাতে। সন্ধ্যা নামার আগেই হাতির দলগুলোকে পিলখানায় নিয়ে আসা হতো। হাতিদের যাতায়াতের রাস্তাটির নামকরণ সেই কারণে এলিফ্যান্ট রোড রাখা হয়।
ইন্দিরা রোড
১৯৩০ সালের দিকে এই এলাকায় থাকতেন দ্বিজদাস বাবু নামের এক বিত্তশালী ব্যক্তি। তার ছিল বিশাল বাড়ি, আর সেই বাড়ির পাশ দিয়েই গিয়েছিল রাস্তাটি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, দ্বিজবাবুর বড় মেয়ে ইন্দিরা অকালে মারা যায়। সেই মৃত মেয়ের নামানুসারেই দ্বিজবাবু রাস্তাটির নাম রাখেন ইন্দিরা রোড।
কাকরাইল
উনিশ শতকের শেষ দশকে ঢাকার কমিশনার হিসেবে যখন দায়িত্ব পালন করছিলেন মি. ককরেল, তাকে সম্মান জানিয়ে একটি রাস্তার নামকরণ করে ফেলা হয়। কালক্রমে সেই ককরেলই পরিণত হয়েছে কাকরাইলে, আর এখন একটি গোটা এলাকাই পরিচিত সে নামে।
রমনা পার্ক
রমনা এলাকায় বাস করতেন রম নাথ বাবু নামে এক বিশাল ধনাঢ্য বাবু। তিনি নিজের নামানুসারে তৈরি করেছিলেন রমনা কালী মন্দির। আর সেই মন্দিরের পাশে ছিল ফুলের বাগান ও খেলাধুলার পার্ক। সময়ের স্রোতে গোটা এলাকাটির নামই হয়ে যায় রমনা আর পার্কটির নাম হয় রমনা পার্ক।
গোপীবাগ
এলাকাটি ছিল গোপীনাথ সাহা নামক একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর নিজস্ব সম্পত্তি। তিনি এখানে স্থাপন করেছিলেন গোপীনাথ জিউর মন্দির। এবং সেই মন্দিরের (কিংবা তার নিজের) নামানুসারেই এলাকাটির নাম হয়ে যায় গোপীবাগ।
পরীবাগ
নবাব সলিমুল্লাহর সৎ বোন ছিলেন পরীবানু। নবাব সলিমুল্লাহ এই এলাকায় তার সৎ বোনের জন্য একটি বাগানবাড়ি গড়ে তোলেন। সেই বাগানবাড়িতেই বসবাস করতে থাকেন পরীবানু এবং তার নামানুসারেই এলাকাটির নাম দাঁড়িয়ে যায় পরীবাগ।
পুরানো পল্টন, নয়া পল্টন
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঢাকাস্থ সেনানিবাসে এক প্ল্যাটুন সেনাবাহিনী ছিল। সেই প্ল্যাটুন থেকে নামকরণ হয় পল্টন। পরবর্তীতে আগাখানিরা এই পল্টনকে দুইভাগে ভাগ করেন। নয়া পল্টন ছিল আবাসিক এলাকা আর পুরানো পল্টন ছিল বাণিজ্যিক এলাকা।
পাগলাপুল
সতেরো শতকে এখানে একটি নদী ছিল। নদীটির নাম ছিল পাগলা। পরবর্তীতে মীর জুমলা এই নদীর উপর সুন্দর একটি পুল তৈরি করেছিলেন। অনেকেই সেই দৃষ্টিনন্দন পুল দেখতে আসতো। সেখান থেকেই জায়গাটির নাম হয়ে যায় পাগলাপুল।
ফার্মগেট
কৃষি উন্নয়ন, কৃষি ও পশুপালন গবেষণার জন্য ব্রিটিশ সরকার এখানে একটি ফার্ম বা খামার তৈরি করেছিল। সেই ফার্মের প্রধান ফটক বা গেট থেকে এলাকাটির নাম হলো ফার্মগেট।
বকশিবাজার
বকশি মূলত মুসলিমদের ব্যবহৃত একটি উপাধি বা পদবি বিশেষ। মুঘল আমলে যেসব রাজকর্মচারী বেতন বণ্টনের কাজে নিয়োজিত ছিল, তাদেরকে ডাকা হতো বকশি নামে। আর এই এলাকাতেই ছিল তাদের সরকারি বাসস্থান। তাছাড়া এখানে তারা একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করে। সেই হিসেবে এলাকাটির নাম হয়েছে বকশিবাজার।

অধরা পান্থুমাই ঝরনা দেখা
মটকা চায়ের কাপে
আম-নামা
মুঘল সাম্রাজ্যের বেগম সাহেবা