বাঁক বদলের মাহেন্দ্রক্ষণ ১১ জুন

আপডেট : ১১ জুন ২০২৩, ০৩:৩৫

আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিবস আজ। সেনাসমর্থিত এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই গ্রেফতারের পর প্রথমে তাকে নেওয়া হয় ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালতে। সেখান থেকে নিয়ে কয়েদ করা হয় সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগারে। ১১ মাস কারাভোগের পর মুক্তি দেওয়া হয় ২০০৮ সালের আজকের এই দিনে। উপরোক্ত চার বাক্যের এ ঘটনা পূর্বাপর নানা ঘটনায় ঠাঁসা।

শেখ হাসিনাকে আটক, গ্রেফতার, কারাবাস, কারামুক্তিসহ ঘটনাপ্রবাহের একটিও খণ্ডিত বা সাদামাটা ছিল না। কারামুক্তির আগে, সাবজেলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন শেখ হাসিনা। মুক্তি পেয়ে তিনি চিকিত্সার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তার অস্থায়ী জামিনের মেয়াদ বাড়ানো হয় কয়েক দফা। সমান্তরালে তাকে রাজনীতি থেকে মাইনাসের জোর আয়োজনও চলে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে লন্ডন হয়ে দ্রুত দেশে চলে আসেন ২০০৮ সালের ৬ নভেম্বর। সামনেই ছিল ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যে নির্বাচনে তার নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জেতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় মহাজোট সরকার।

তার কারাবন্দি ও কারামুক্তির ইতিহাস ঐ একবারই নয়, ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর ১৯৮৩, ১৯৮৫ এবং ১৯৯০ সালেও তিনি রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ করেন। ওয়ান ইলেভেন সরকারের জমানায় গ্রেফতার ও কারামুক্তির আবহ ভিন্ন, গুরুত্বও আলাদা। প্রথমে একজন ঠিকাদারকে দিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করানো হয়  চাঁদাবাজির মামলা। এফআইআরে নাম না থাকার পরও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়। আর সরকারি প্রেসনোটে তাকে উল্লেখ করা হয় ‘বিপজ্জনক ব্যক্তি’ হিসেবে। তার দেশে ফিরে আসার ওপর জারি করা হয় নিষেধাজ্ঞাও।

সেই আলোকে বিমান ও স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে বলা হয় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে। নমুনা বুঝতে পেরে দ্রুত দেশমুখী হন শেখ হাসিনা। তারিখটি ৭ মে ২০০৭, যা বাংলাদেশের রাজনীতির পথপরিক্রমায় আরেকটি ফুট নোটে রাখার ঘটনা। ইতিহাসে এটি তার দ্বিতীয় স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। আর প্রথমটি ১৭ মে ১৯৮১। তার দ্বিতীয় স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না ঘটলে বাংলাদেশে কী ঘটতে পারত সেই আলোচনা এখনো অসম্পূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র মূলে যে আঘাত পড়েছে, বিএনপি এবং দলটির প্রধান বেগম খালেদা জিয়াও এর বেনিফিশিয়ারি। শেখ হাসিনা বেঁকে না বসলে ঐ তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংস্কারের মোড়কে দল ভাঙা ও দল গড়ার ‘খেলা’ সাঙ্গ করে নিতে পারত অনায়াসে। জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসাসহ আরো অনেক কিছুই ঘটিয়ে দিতে পারত ইয়াজউদ্দিন-ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন মিলিয়ে তিন উদ্দিনের সরকার। হতো না যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বা জঙ্গিবাদ নির্মূল। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারও দাবিতেই ঘুরত। উন্নয়নের মহাসড়কে উঠত না বাংলাদেশ। সেই বিবেচনায় দিনটি কেবল শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিবস নয়, গণতন্ত্রেরও একটি মুক্তি দিবস। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ৯টি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৬টিসহ মোট ১৫টি মামলা করা হয়। একটি মহল তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এবং তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে দুদককে ব্যবহার করে।

টানা ১১ মাস কারাবাসের সময়টা তিনি কেবল আওয়ামী লীগকে ফের রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা নয়, ভবিষ্যত্ সরকারের ছকও এঁকেছেন। সাজিয়েছেন তার ওয়ার্ক প্ল্যান। চালিয়েছেন লেখনীও।  প্রকাশের জন্য তৈরি করেছেন বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘আমার দেখা গণচীন’-এর মতো কালজয়ী গ্রন্থ। পঁচাত্তরের আগস্ট ট্র্যাজেডির সময় বোন শেখ রেহানাসহ তিনি তিনি ছিলেন জার্মানিতে। এরপর ভারতে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর কয়েক দিন আগে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরেন শেখ হাসিনা। ফেরার পর এইচ এম এরশাদের শাসনামলে তাকে কয়েক দফা গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির পর বন্দি করে রাখা হয় ক্যান্টনমেন্টে। কারাযন্ত্রণায় তাকে আবার নিক্ষেপ করে ওয়ান ইলেভেন সরকার। বলা বাহুল্য, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হওয়ার একটি নীলনকশা প্রায় বাস্তবায়ন করে ফেলা হয়েছিল। তা ব্যর্থ করে দিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণ-আন্দোলনের মুখে দেশ হয়ে ওঠে অগ্নিগর্ভ। তা রুখতে শুরুতে ইয়াজউদ্দীন, পরে ফখরুদ্দীন-মঈন উদ্দীনদের অ্যাকশন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়।

শেখ হাসিনা ঐ রাজনৈতিক নোংরামি আঁচ করতে ভুল করেননি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন খুব ঠান্ডা মাথায়। জরুরি আইন জারির পর তিনি লাগাতার অবরোধ-হরতালসহ আন্দোলনের কর্মসূচি প্রত্যাহার করলেও কথা বলা ক্ষ্যান্ত দেননি। জনগণের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষার কথা উচ্চারণ করতেই থাকেন। গ্রেফতারের পর শেখ হাসিনার বিচারকাজ চলে বিশেষ আদালতে। শুনানির দিনগুলোতে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী আদালতের আশপাশে জমায়েত হতে থাকেন। জরুরি আইনের সময়ও নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার  সক্ষমতা দেখান দলের কয়েক জন নেতা। মুক্তির পর শেখ হাসিনা আরো গতিময়তায় রাজনীতির ময়দান কাঁপাতে থাকেন। নিতে থাকেন নির্বাচনের প্রস্তুতি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে গঠন করা মহাজোটকে করেন আরো সম্প্রসারণ। রাজনীতির বাঁকবদলের ঐ অভিযাত্রায়  তিনি ফল ঘরে তোলেন ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে। মূলত কারাবন্দিত্বের সময়টিতে ডিজিটাল বাংলাদেশ শিরোনামসহ নির্বাচনের ইশতেহার প্রণয়ন, ক্ষমতা পেলে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ কিছু এজেন্ডা ঠিক করে ফেলেন। ক্ষমতায় এসে শুরু করেন বাস্তবায়ন, যা সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার ঐ কারামুক্তি ও টানা ক্ষমতায় থাকার সুবাদে। সেই বিবেচনায় ১১ জুন তারিখটি কেবল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনের জন্য নয়, বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁক বদলেরও মাহেন্দ্রক্ষণ।

কারামুক্তির পর শেখ হাসিনা বুঝেশুনে দেশে ফিরেছেন, ক্ষমতার কুশীলব মহলটিও ভালোভাবে জেনেই তাকে দেশান্তরি রাখতে চেয়েছিল। কিন্ত সফল হয়নি। তবে দমেনি তারা। মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে বিনা ওয়ারেন্টে কোর্টকাছারি সেরে বন্দি করে সাবজেলে। দলের ক্রমাগত চাপ, আপসহীন মনোভাব ও অনড় দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে মুক্তি দিতেও বাধ্য হয়। তার অবিরাম হার না মানার সুফল পেয়ে চলছে বাংলাদেশ। এর আগে পঁচাত্তর থেকে পঁচানব্বই দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় আনেন। পরে ২০০৯ থেকে আছেন আজতক। মাঝে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের যাতনা এবং ওয়ান ইলেভেন সরকারের জুলুম সয়েছেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার শিকারও হয়েছেন, কিন্তু দমেননি। পিছু হটেননি। সংসদ ভবনসংলগ্ন সাবজেলের ঐ বাড়ির জানালা দিয়ে গণভবন দেখা যেত। যেখানে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় থেকেছেন। কারাগার আর ক্ষমতা যে খুব কাছাকাছি, শেখ হাসিনা তার জীবন্ত উদাহরণ।

১৯৮১ সালের ১৭ মের পর থেকে এযাবৎ তাকে ২০-২১ বার হত্যার চেষ্টা চলেছে। ওয়ান-ইলেভেনে সাবজেলে তাকে স্লো পয়জনিংয়ে হত্যার ষড়যন্ত্রও চলেছিল বলে অভিযোগ আছে। জেলে থাকার কারণে স্বজনদের কাছে থাকতে না পারার কষ্টের কথা শেখ হাসিনা তার লেখায়ও তুলে ধরেছেন। তার ‘সবুজ মাঠ পেরিয়ে’ প্রন্থে রয়েছে মর্মস্পর্শী কিছু বর্ণনা। রাজনীতির জন্য পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনার বর্ণনা রয়েছে বঙ্গবন্ধুর লেখনীতেও।  এখানে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই গ্রেফতার হওয়ার সময় দেশবাসীর উদ্দেশে শেখ হাসিনার লেখা চিঠিটির কয়েক লাইন বেশ প্রাসঙ্গিক। ‘...প্রিয় দেশবাসী! আমার ছালাম নিবেন। আমাকে সরকার গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। কোথায় জানি না। আমি আপনাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যেই সারা জীবন সংগ্রাম করেছি। জীবনে কোনো অন্যায় করিনি। তার পরও মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। ওপরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ও আপনারা দেশবাসী আপনাদের ওপর আমার ভরসা ...।’

শেখ হাসিনার যে চিঠির সাহসী ও প্রজ্ঞামণ্ডিত উচ্চারণগুলোতে রাজনীতিকদের জন্য রয়েছে শিক্ষার সঙ্গে দীক্ষা নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।  ১১ জুন মুক্তির পর থেকে আজতক নেতৃত্বের প্রতিটি পর্যায়ে তার সেই সাহসের আলোকরশ্মি ও ঔজ্জ্বল্য দীপ্যমান।

লেখক:সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন 

 

 

ইত্তেফাক/ইআ