বাজেট ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদান

আপডেট : ২১ জুন ২০২৩, ০৫:৩০

গত পহেলা জুন বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন। চলতি অর্থবছরে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষা খাতের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৮ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। এই ব্যয় প্রস্তাবিত মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং  জিডিপির ১ দশমিক ৮১ শতাংশ। এ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় ১৭ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা বেশি। গত বছরের বাজেট বরাদ্দ ছিল ৭০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে ১২ দশমিক ০০ শতাংশ। কিন্তু  জিডিপির ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। তাই টাকার অঙ্কে বাড়লেও শিক্ষায় বরাদ্দের ব্যাপারে সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেনি।

স্মর্তব্য, জাতীয় শিক্ষানীতিতে মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ৪ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ২০২১-২২ অর্থবছরে শিক্ষায় বরাদ্দ যদিও জিডিপির ২ শতাংশের ওপরে ছিল ২০২২-২৩ সালে তা কমে ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ হয়। কিন্তু এবার সেটি আরো কমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ দশমিক ৮১ শতাংশে নেমে এসেছে। ইউনেসকোর পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন অনুযায়ী একটি দেশের শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত বাত্সরিক মোট বাজেটের অন্তত ২০ শতাংশ এবং জিডিপির ৬ শতাংশ।

প্রশ্ন হলো, শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ এবং বেশি বাজেট বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ কেন?  কারণ দেশ কত উন্নত হবে অথবা রাষ্ট্রের ভবিষ্যত্ কতটুকু উন্নয়নের পথে ধাবিত হবে, তা বোঝা যায় শিক্ষাসংক্রান্ত পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে। মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষা এমন একটি পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা যার উদ্দেশ্য হলো সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীকে সাহায্য করা যেন শিক্ষার্থীরা তাদের পূর্ণ সম্ভাবনার বিকাশ ঘটিয়ে সমাজের জন্য এক জন পূর্ণাঙ্গ ও উত্পাদনশীল নাগরিক হয়ে গড়ে উঠতে পারে। গুণগত শিক্ষা শিক্ষার্থীদের সততা, ন্যায়বোধ, কর্তব্যপরায়ণতা, শৃঙ্খলা, সৌজন্যতা, আচরণবিধি, নাগরিক দায়িত্ববোধ,  ধর্মনিরপেক্ষতা, বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব, সহাবস্থান, অনুসন্ধিত্সু, দেশপ্রেমিক, দেশের অতীত ও বর্তমান ইতিহাস, দেশের গুণীজন ও সাধারণ জনগণের প্রতি ভালোবাসাবোধ, দায়বদ্ধতা, অধ্যবসায়সহ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অন্তর্নিহিত গুণাবলি অর্জনে, উন্মোচনে ও আচরণে সহায়তা করে। এই গুণাবলি অর্জন করে তারা কর্মজীবনের জন্য তৈরি হবে এবং বৈশ্বিক পরিবেশে যে কোনো দেশের যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে সক্ষম হবে। জাতিসংঘের শিক্ষাবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এবং ইউনেসকো মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষার অনুরূপ সংজ্ঞা দিয়েছে।

গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষার আরো কিছু দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসজিডি) অভিষ্ট ৪-এ। এসজিডির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বিশেষজ্ঞদের মত হলো, কতগুলো সুনির্দিষ্ট উপাদান যথযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। উপাদানগুলো হচ্ছে, মানসম্মত শিক্ষকের পর্যাপ্ততা, শিক্ষকদের বাজার চাহিদা মোতাবেক পারিতোষিক ও যথাযথ সামাজিক মর্যাদা ও স্বীকৃতি,  যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন, মানসম্মত শিখন সামগ্রী ব্যবহার, শিখন-শেখানো পদ্ধতির ও কৌশলের কার্যকর ব্যবহার, নিরাপদ, সকল প্রকার হয়রানিমুক্ত ও সহযোগিতামূলক শিখন পরিবেশ, উপযুক্ত মূল্যায়ন ব্যবস্থা, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে সুসম্পর্ক, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সকল প্রকার সুযোগসুবিধা সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করা।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ‘ক’ ইউনিটে স্নাতক ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এতে পাশের হার মাত্র ৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ৯০ দশমিক ৫৭ ভাগ অকৃতকার্য হয়েছে। এটি একটি উদাহরণ মাত্র। এটি পর্যালোচনা করলে আমাদের সামনে একথা স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রদত্ত শিক্ষার গুণমানে ঘাটতি রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রদত্ত প্রশ্ন উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্যক্রমের ভিত্তিতেই করা হয়েছে। বাইরে থেকে কোনো প্রশ্ন দেওয়া হয়নি। তত্সত্ত্বেও অকৃতকারোর সংখ্যা এত বেশি কেন তা নিয়ে বিশেষজ্ঞমহলে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার মান নিয়েও উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা লক্ষ করা যাচ্ছে।

শিক্ষার গুণমান নিশ্চিত করতে হলে সর্বাগ্রে এর নানাবিদ প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করতে হবে। শিক্ষা নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদন পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা, কারিগরি, সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষকের অভাব, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, শিক্ষার সঙ্গে কর্মের দূরত্ব, ত্রুটিপূর্ণ মূল্যায়ন ব্যবস্থা, শিক্ষা বাজেটের অপ্রতুলতা, শিক্ষাঙ্গনে অপরাজনীতির বিস্তার, বুলিংসহ যৌনহয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং সেন্টারের প্রাধান্য, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, ইত্যাদি বিষয় বহুলাংশে দায়ী। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে গুণগত শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে শিক্ষা হতে পারে আনন্দদায়ক, গুণগত, মানসম্মত ও টেকসই। এছাড়া শিক্ষকদের স্বশাসিত হতে হবে। তাড়িত হতে হবে বিবেক দ্বারা। শিক্ষার্থীদের আত্মোপলব্ধির প্রয়োজনে চমত্কার উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকবে শিক্ষকদের। এরূপ যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেজন্যে  শিক্ষকদের বেতন কাঠামো বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের পরীক্ষানির্ভরতা কমিয়ে মানসিক চাপমুক্ত করতে সহায়তা করা শিক্ষকের একান্ত দায়িত্ব। আর শুধু জিপিএ-৫ ও পাশের হার বৃদ্ধি করা নয়, শিক্ষার্থীরা কতটুকু কার্যকর জ্ঞানার্জন করতে পারছে, সেটাই মুখ্য বিষয় হওয়া উচিত।

লেখক :উপদেষ্টা, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি), সাভার, ঢাকা

ইত্তেফাক/এএইচপি