মুদ্রানীতি সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

আপডেট : ২৭ জুন ২০২৩, ০০:২৬

বহুমুখী সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এ সমস্যা শুরু হয়েছে ২০২১-২০২২ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে হোঁচট খাওয়ার ভেতর দিয়ে। তখন বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৩৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিল ১৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার। এর ফলে ব্যালেন্স অব পেমেন্টের (বিওপি) ঘাটতি দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার। এখন ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি বেড়ে ৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার দাঁড়িয়েছে। এ পরিসংখান থেকে বলা যায় যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো অস্বস্তিকর অবস্থায় আছে। বিগত এক বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আবার এ বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, যা বিগত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। 

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবাহ তুলনামূলক হারে এখন কমে যাচ্ছে। ২০২২-এর জুলাই থেকে ২০২৩-এর মে মাস পর্যন্ত রপ্তানির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ১১ শতাংশ, যা এক বছর আগের একই সময়ে ছিল ৩৪ দশমিক ০৯ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের প্রবাহ ছিল নেগেটিভ—১৫ দশমিক ১ শতাংশ। বাংলাদেশের অর্থনীতি একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, টাকার অবমূল্যায়ন, রিজার্ভ সংকট, অনাকাঙ্ক্ষিত রপ্তানি আয় দেখতে পাচ্ছে। এক কথায় বলা যায় যে, সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো এই মুহূর্তে মোটেই সন্তোষজনক নয়। এ অবস্থা বেশি দিন চলতে থাকলে স্মার্ট বাংলাদেশ হওয়ার স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক টেনে ওঠানোর জন্য মুদ্রানীতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছুদিন আগে এ বছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। এ মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি কমানো। সর্বোপরি সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীল আনা হলো এ মুদ্রানীতির একমাত্র লক্ষ্য। এছাড়াও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর শর্ত অনুযায়ী এবারের মুদ্রানীতিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রথমে ব্যাখ্যা করা উচিত যে, এ মুদ্রানীতি বহুল আলোচিত মূল্যস্ফীতি কমাতে সক্ষম হবে কি না? মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের লক্ষ্যে রেপো রেট বা পলিসি রেট ৬ দশমিক ০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে টাকার জোগান কমার সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে । কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে হারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে টাকা ধার দেয়, সেটাকে পলিসি রেট বলে। এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ধার নেওয়াকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নিরুত্সাহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে রিভার্স রেপোর সুদের হার ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। যে রেটে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা তুলে নেয়, সেটা রিভার্স রেপো। এ হার আরো ০.৫০ বাড়ালে মন্দ হতো না। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে ব্যাংকিং সেক্টর থেকে টাকা ধার করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এ সিদ্ধান্ত বলবত্ থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ব্যর্থ হবে। জাতীয় বাজেটে বলা হয়েছে যে, সরকার ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা ধার নেবে। মূলত বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য এ সিদ্ধান্ত। সরকার যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বেশি পরিমাণ টাকা ধার নেয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। এই মুহূর্তে টাকা ছাপিয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। বলা প্রয়োজন যে, এ বছরে জানুয়ারি-জুন সময়ে মুদ্রাস্ফীতি কমাতে মুদ্রানীতি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতা আবার আসবে যদি বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ধার দেয়। মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণ নাকি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ কথা কি এখন যুক্তিযুক্ত? এ যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় কীভাবে অন্য দেশগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করল? এ বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করা উচিত। এ বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ভারতে মূল্যস্ফীতির হার ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ব্রাজিলে ৪ দশমিক ২ শতাংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। মে মাস পর্যন্ত থাইল্যান্ডে মূল্যস্ফীতির হার ছিল শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৩ দশমিক ১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৪ দশমিক শূন্য শতাংশ রের্কড করা হয়। ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমলেও বাংলাদেশে এর প্রভাব দেখা যায়নি, যা দুঃখজনক। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দোষ দেওয়া এখন আর উচিত হবে না। 

আইএমএফের দেওয়া শর্ত পূরণ করার জন্য ২০২০ সালের এপ্রিলে আরোপ করা ল্যান্ডিং রেট ক্যাপ উঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে মুদ্রানীতিতে। ট্রেজারি বিলের ছয় মাসের গড় সুদের সঙ্গে ৩ দশমিক শূন্য শতাংশ মার্জিন যোগ করে ব্যাংকের লেন্ডিং রেট নির্ধারণ করা হবে। এ সিদ্ধান্ত অর্থনীতিবিদদের কাছে সমালোচিত হয়েছে। নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের জন্য ৫ দশমিক শূন্য শতাংশ সুদের হার যোগ করা হবে। অন্যদিকে ভোক্তা এবং এসএমই লোনের ক্ষেত্রে ৪ দশমিক শূন্য শতাংশ যোগ করে সুদের হার নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জুলাই মাস থেকে কার্যকর করা হবে। এ ধরনের পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতি কমাতে কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, এটা নিয়ে সন্দেহ আছে। ব্যাংকের লোন যদি সস্তা হয়, তাহলে অর্থনীতিতে অপ্রয়োজনে টাকা ঢুকবে। এর ফলে আবার মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। 

যেখানে ট্রেজারি বিলের সুদের হার নির্ধারণ করা হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সেখানে ব্যাংক খাতের লোন সস্তা হয়ে যেতে পারে। ব্যাংকের লোন ব্যয়বহুল করা এখন সময়ের দাবি। অপর পক্ষে লোন যদি সস্তা হয়ে যায়, এর মাশুল দিতেই হবে। এবারের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে লোনের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। যেখানে জুন মাস পর্যন্ত ছিল ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। অবশ্যই ১৪ দশমিক ১ শতাংশ টর্গেটের বিপরীতে ১১ দশমিক ১০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে (মে, ২০২৩ পর্যন্ত)। এদিকে সরকারি খাতে লোনের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৪৩ দশমিক শূন্য শতাংশ। এ দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান এত বেশি কেন? বেসরকারি খাতে লোনের প্রবৃদ্ধি না হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে না, যদি বেসরকারি খাতে লোনের প্রবৃদ্ধি না বাড়ে। আবার বাজেট ঘাটতি পূরণ করার জন্য সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে লোন নিলে বেসরকারি খাতে লোনের প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। ব্যাংকে তারল্য সংকটের কারণে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বেশি পরিমাণ লোন নিতে পারে নাই। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক ১৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে বিক্রি করায় ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। টাকা চলে যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। বেসরকারি খাতে লোন প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ ভারত অনেক এগিয়ে আছে। সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, ভারতে এ হার ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ, ভিয়েতনামে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ২ দশমিক ৮ শতাংশ। 

এবারের মুদ্রানীতি প্রশংসনীয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো গ্রস ইন্টারন্যাশনাল রিজার্ভের নিট হিসাব রাখা। আইএমএফের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট এবং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম-৬) অনুযায়ী রিজার্ভের হিসাব রাখা হবে। মুদ্রানীতি প্রকাশের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন যে, গ্রস ও নিট পদ্ধতিতে রিজার্ভের হিসাব রাখা হবে। কিছু বিষয় প্রকাশ করা হবে না। কেন হবে না? জনগণ সবকিছু জানার অধিকার রাখে। বহুদিন থেকে ডলারের বিনিময় হার নিয়ে বিতর্ক চলছিল। এতদিন আমদানি-রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের জন্য ডলারের ভিন্ন ভিন্ন রেট ছিল। জুলাই মাস থেকে ডলারের রেট হবে বাজারভিত্তিক। মার্কেটে অস্থিরতা দূর করার জন্য এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আদৌ কি এ অস্থিরতা দূর হবে? ডলার-সংকটের কারণে যদি আমদানি ব্যাহত হয়, তাহলে কীভাবে দেশে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন কীভাবে বাড়বে? একসময় রপ্তানি আয় কমতে থাকবে। রপ্তানি আয় কমে গেলে ডলার-সংকট কীভাবে নিরসন করা হবে? এই মুহূর্তে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো ভালো রাখাই হলো মুদ্রানীতির চ্যালেঞ্জ। তবে আইএমএফের উপদেশ অনুযায়ী ব্যাংকের নন-পারফরমিং লোন কমিয়ে আনতে পারলে সেটাই হবে বর্তমান সময়ের সফলতা, যা মুদ্রানীতিতে গুরুত্বের সঙ্গে আলোকপাত করা হয়নি। বলা প্রয়োজন যে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি করা হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় বাজেট সম্প্রসারণমূলক করা হয়েছে। তাহলে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা কোথায়? 

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন