আমরা ডিসকভারি চ্যানেলে ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’-এ বেয়ার গ্রিলসের অনেক দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ড দেখিয়াছি। যদিও সেই সকল পর্বের শুরুতে সতর্কীকরণে বলা থাকে বন্য বা প্রতিকূল পরিবেশে ঐরকম দুঃসাহস না দেখাইতে। ঐ প্রোগ্রামগুলি করা হইয়াছে এক্সপার্টদের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করিয়া। কিন্তু যুগটা এখন টিকটক, ইউটিউবের শর্টস এবং ফেসবুকের রিলস-এর। ইহার সহিত নিজেকে দুঃসাহসিক করিবার একটি অদম্য এবং নির্বোধ মানসিকতা তো রহিয়াছেই। তাহারই ছোট্ট উদাহরণ আমরা দেখিতে পাইলাম সিলেটের সাদা পাথর এলাকায় এক পর্যটকের মৃত্যুর মাধ্যমে।
ঈদুল আজহার কয়দিন ধরিয়া বৃষ্টি হইতেছে সিলেটের বৃহৎ এলাকা জুড়িয়া। বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও ভারতের মেঘালয় রাজ্যের জৈন্তাহিল পাহাড়ের পাদদেশে সিলেটের ভোলাগঞ্জে ‘সাদা পাথর’ দেখিতে ভিড় করিয়াছিল ঈদের ছুটি উপভোগ করা মানুষজন। ধলাই নদীর বুকে ছড়াইয়া-ছিটাইয়া থাকা পাথরের শুভ্র বিছানা আর মেঘালয় হইতে নামিয়া আসা ঝরনার পানির তীব্র স্রোত দেখিতে কয়েক হাজার পর্যটক ভিড় জমাইয়াছেন সেইখানে। ইহাকে বলা যাইতে পারে ভয়ংকর সুন্দর প্রকৃতি। ভোলাগঞ্জ সীমান্তে প্রাকৃতিক প্রাচীর হইয়া দাঁড়াইয়া আছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সারি সারি পাহাড়। বর্ষাসিক্ত সবুজ পাহাড়, মেঘের হাতছানি আর বর্ষার পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড় হইতে নামিয়া আসা সাদা পাথর ধলাই নদীর বুকে মিলিয়া-মিশিয়া ভোলাগঞ্জের সৌন্দর্য অপরূপ করিয়া তুলিয়াছে। উপরে নীল আকাশ আর তাহার ঠিক নিচেই সবুজ পাহাড়—পাশে জলকেলি আর সাদা পাথর। সেইখানে গত বত্সর ৩১ মার্চে নিহত হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মো. জুনাইদ আহমদ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থী সাদা পাথর এলাকার পানিতে গোসল করিতে নামিলে প্রচণ্ড স্রোতে জুনাইদ আহমদ পানির নিচে তলাইয়া যান। জায়গাটি যে সাঁতারের জন্য বিপজ্জনক, তাহা লইয়া সন্দেহ নাই। কিন্তু পর্যটকরা অতীত হইতে শিক্ষা লয় নাই। গত রবিবার পুনরায় ঐ এলাকায় একইভাবে মৃত্যু হইয়াছে ঢাকার মিরপুরের আবদুস সালামের। নিখোঁজ যুবকের সঙ্গে আসা অন্য পর্যটকরা জানাইয়াছেন, তাহারা ধলাই নদীতে সাঁতার কাটিতে নামিলে একপর্যায়ে প্রবল স্রোতে আবদুস সালাম নিখোঁজ হন। গত বত্সর মারা যাওয়া জুনাইদ আহমদের বয়স ছিল ২৪, আর এই বৎসরের আবদুস সালামের বয়স ২৩ বছর। ইহা তো অফুরান প্রাণশক্তি লইয়া নতুন জীবনের পথে যাত্রা করিবার বয়স। কী করিয়া তাহারা এই ভুল করিল? অল্পবয়সি এই সব তাজা প্রাণ কি বাস্তব বোধবুদ্ধিরহিত?
বিপদ কেবল এই সকল পাহাড়ি এলাকাতেই নহে, আমরা দেখিয়াছি সমুদ্র স্নানে নামিয়া অনেকেরই হুঁশ থাকে না—উহা জোয়ারের সময়, নাকি ভাটার সময়। জোয়ারে জলে নামাটা বিপদের নহে। কিন্তু ভাটার সময় চোরা স্রোত বহিয়া যায়, তখন পানিতে নামিবার পরিণাম মারাত্মক হইতে পারে। সমুদ্রে পানিতে নামা বিপদের নাকি নিরাপদ—তাহার জন্য লাল বা সবুজ পতাকা টানানো থাকে। অন্যান্য পর্যটন এলাকাতেও বিপদের পরিবেশ ও পরিস্থিতি বুঝিয়া এই ধরনের বিপত্সংকেত-সংবলিত পতাকা ও নোটিশ ঝুলাইয়া রাখিবার নিয়ম রহিয়াছে। সিলেটের সাদা পাথর এলাকায় ইতিপূর্বে যেই হেতু সাঁতার কাটিতে গিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মৃত্যু হইয়াছে, সেই হেতু এই উৎসবের কালে কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল বর্ষার ঢলে স্ফীত ধলাই নদীতে নামিতে না দেওয়া। এই ধরনের সতর্কবার্তা গুরুত্বের সহিত টানাইতে হইবে। কারণ পিপীলিকারা যখন আগুনের সৌন্দর্য দেখিয়া সেইখানে ঝাঁপ দেয়, তখন বুঝিতে পারে না উহাতে তাহার মৃত্যু হইবে। পিপীলিকাবত্ অপরিণামদর্শী অনেকেই বুঝিতে পারে না, কোথায় সাঁতার কাটা যায় আর কোথায় যায় না। তাহা ছাড়া আমরা কয় জনই মহামতি সক্রেটিসের সেই সারসত্য জানি—সর্বাগ্রে নিজেকে জানিতে হইবে। নিজেকে জানিলে নিজের সীমানা ও সীমাবদ্ধতাও জানা যায়। সুতরাং সকল ক্ষেত্রে নিজেকে জানিতে হইবে, নচেত্ নিজের রক্ষা হইবে না।
