আমাদের দেশে কখন যে কোন জিনিসটা দুষ্প্রাপ্য, দামি এবং আলোচিত হয়ে উঠবে, তা বলা মুশকিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর দাম কেন জানি হঠাৎ-হঠাৎ লাফ দেয়। কখনো চিনি, কখনো লবণ, কখনো তেল, কখনো ডিম, কখনো পেঁয়াজ। এবারের ঈদে আকস্মিকই কাঁচা মরিচ হয়ে উঠেছে সারা দেশের সবচেয়ে আলোচিত উপাদান। কোথাও কোথাও নাকি হাজার টাকা কেজি দরে বিকিয়েছে এই কাঁচা মরিচ। কয়েক দিনের ব্যাপক-আলোচনা ও শোরগোলের পর সরকার যখন বিদেশ থেকে কাঁচা মরিচ আমদানির উদ্যোগ নেয়, তখন রাতারাতি দাম ধপ করে নেমে যায়। যদিও তা এখনো ডাবল সেঞ্চুরির মধ্যেই রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, কাঁচা মরিচের দাম কেন এমন আকস্মিক লাফ দিয়ে বেড়ে গেল? এটা সোনাও না, ডলারও না। বিদেশি কোনো জুস বা সঞ্জীবনী সুধাও না। তাহলে কাঁচা মরিচের দাম কী করে প্রতি কেজি ডাবল-ট্রিপল সেঞ্চুরি করল? ভদ্রলোকেরা এই জিনিস বড? বেশি খায়ও না। চাষাভুষারা খেলেও ভাত কিংবা মুড়ির মতো খায় না। একটা-দুটো কাঁচা মরিচ হলেই তাদের হয়ে যায়। তার পরও এই জিনিসের এত দাম কেন? এটা কি কোনো বিশেষ ষড়যন্ত্র? দেশের মানুষকে ‘ঝালবঞ্চিত’ করে নিস্তেজ বানানোর কোনো প্রকল্পের অংশ? বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে।
বলা হচ্ছে, টানা বৃষ্টিপাত ও বর্ষার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় মরিচের দাম বেড়েছে। ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানিও ঠিকঠাকমতো হচ্ছে না। ফলে দামের এই ঊর্ধ্বগতি। হবেও হয়তো। যদিও আমাদের দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার জন্য কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ লাগে না। এটা এমনি এমনিই বাড়ে, বাড়তেই থাকে। কোনো একটা ছুতো পেলেই অদৃশ্য এক আঁতাতের ভিত্তিতে সুচতুর ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকেরা একযোগে একেকটা জিনিসের দাম বাড়িয়ে দেন। আর আমরা যত কষ্টই হোক, সেই বাড়তি দাম দিয়ে জিনিসপত্র কিনতেই থাকি। বেশি দামের কারণে কেউ কিনছে না—এমন উদাহরণ আমাদের দেশে খুব একটা নেই। যা আছে, তা হলো আহাজারি আর ‘হায় হায়’ রব!
কাঁচা মরিচের অর্থনীতি নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বরং এর ইতিহাস ও ভূগোল নিয়ে খানিকটা আলোচনা সেরে নেওয়া যেতে পারে।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে যখন সূর্য অস্ত যেত না, সাহেবরা তখন নাকি এই একটা জিনিসকে যমের মতো ভয় পেতেন। অথচ তারাই মরিচকে গ্লোব-ট্রটার বানিয়েছিলেন। মুখে দিলে জ্বলে যায়, বাপ রে, কী সৃষ্টি! এই ফলের আদিভূমি, যত দূর জানা যায়, দক্ষিণ আমেরিকা। অন্তত ১০ হাজার বছর আগেই তার ব্যবহার ছিল সেখানে। তার পর মরিচের কায়কারবার ঘটে পনেরো শতকে কলম্বাস ও সহশিল্পীবৃন্দের মাধ্যমে। পতুর্গিজ বণিকেরাই মরিচ নিয়ে যান নানা দেশে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের উপকূলে কেন রান্নাবান্নায় মরিচের এমন দাপট, বুঝতে কোনো অসুবিধে নেই। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া বাদ দিয়ে বাকি দুনিয়াতেই মরিচের প্রতিপত্তি। তবে এশিয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল হলো তার হেডকোয়ার্টার্স।
বলে রাখা ভালো, খুব ঝাল মরিচও সবার ঝাল লাগে না। যেমন পাখির। ওরা তাই দিব্যি মরিচ খেয়ে ফেলে। অনেক মানুষ আছেন, পাখির কাছাকাছি, আপনি যখন নাকের জলে চোখের জলে অস্থির, তখন তিনি আপনার পাশে বসে দিব্যি তারিয়ে তারিয়ে ঐ একই পদ খাচ্ছেন আর বলছেন, ‘কই, তেমন ঝাল হয়নি তো!’
মরিচ নিয়ে যার যেমন মনোভাবই থাকুক না কেন, বাঙালি আসলে মরিচপ্রেমী। কমবেশি সবাই মরিচ পছন্দ করে। আমাদের দেশে বছরে ২ লাখ টনেরও অধিক মরিচ উৎপাদন হয়। এছাড়া ভারত থেকে আমদানি করা হয়। সব মিলিয়ে বছরে মাথাপিছু প্রায় দেড় কেজি এবং খানা বা পরিবারপ্রতি ৯ কেজি মরিচ খাওয়া পড়ে। এলাকাভেদে এমনকি একেক পরিবারে মরিচ খাওয়ার পরিমাণ আলাদা।
তবে সব মরিচ নয় সমান। কিছু কিছু মরিচ আছে, যা ফার্মের মুরগির মতো নাদুস-নুদুস। ঝাল পরীক্ষা করতে কামড় লাগান, দেখবেন স্বাদ ঝিঙের মতো, ঝাল বলে কিছুই নেই! তবে বগুড়া কিংবা পাহাড়ি এলাকার মরিচ নিয়ে কোনো পরীক্ষা না চালানোই ভালো। এসব মরিচ থেকে আপনি দূরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন। বেশি ঝাল লাগলে বরং এই ভেবে শান্তি পান যে, মরিচেও চিনি আছে। খাদ্য গবেষকদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম মরিচে থাকে প্রায় পাঁচ গ্রাম শর্করা!
যারা ঝাল খান না, তারা বলেন, মরিচ খেলে শরীর খারাপ হয়। মরিচ খুব বেশি খাওয়া নিশ্চয়ই ঠিক নয়, বিশেষ করে শুকনো মরিচ। তবে সে তো কোনো জিনিসই বেশি খাওয়া ভালো নয়। কিন্তু নানা রকম মসলার মতোই মরিচ কেবল স্বাদ বাড়ায় না, পুষ্টিও দেয়।
কী আছে মরিচে? পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলেন, আছে ভিটামিন এ, বি-সিক্স, সি; আছে আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম। ভিটামিন ‘এ’ আমাদের দৃষ্টিশক্তি, মজবুত দাঁত ও শক্ত হাড়ের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। ভিটামিন ‘সি’ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, যে কোনো ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে। আছে অল্প প্রোটিন, বেশ কিছুটা কার্বোহাইড্রেট। আর এনার্জি? হ্যাঁ, তা-ও।
ভুল করে মরিচ চিবিয়ে ফেললে যে রকম আলজিভ ঝনঝন করে ওঠে, সে রকম এনার্জির কথা বলছি না, মরিচ থেকে সত্যিই অনেকটা ক্যালরি সংগ্রহ করে নিতে পারেন। এনার্জি ড্রিংকের থেকে কোনো অংশে কম উপকারী নয় এই জিনিস। যারা ডায়েট করছেন, তারা কিন্তু একটু সাবধান। বেশি খেলে ফ্যাট বেড়ে যেতে পারে!
ওষুধ হিসেবেও মরিচের গুণ কম নয়। ব্যথার ওষুধে, বিশেষ করে নানা ধরনের বাত ও নার্ভের ব্যথা কমানোর ওষুধে মরিচ ব্যবহার করা হায়। এ ছাড?া আছে মরিচের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল। উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসের বিভিন্ন ওষুধে মরিচ মিশ্রিত থাকে। হজমের সহায়ক এনজাইমগুলোয় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে মরিচ ব্যবহার করা হয়।
ভিটামিন ‘বি-কমপ্লেক্স’ সিরাপে নির্দিষ্ট পরিমাণ মরিচ মিশ্রিত থাকে। ত্বকে কোলাজেনে রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখতে মরিচ খুবই উপকারী। বিজ্ঞানের সীমানা পার হলেই বিশ্বাসের দুনিয়া। দক্ষিণ ভারতের মানুষ ভাবে, বেশি ঝাল খেলে বুদ্ধি বাড়ে। বাঙালিরা যেমন ভাবে, মাছের মুড়ো খেলে বাড়ে!
সব ধরনের মরিচেই আছে ক্যাপসেইসিন নামের একটি উপাদান। এই ক্যাপসেইসিন প্রদাহ কমায়, বাতের ব্যথা কমায়, ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। আমেরিকার ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ বলছে, তাজা সবুজ কাঁচা মরিচে যে ক্যাপসেইসিন আছে, তা ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি রোধ করতে পারে। তাই কাঁচা মরিচে কেবল ঝালই নেই, আছে নানা উপকারও।
দুনিয়ায় সম্ভবত মরিচই একমাত্র ফল, যা কামড়ালে পাল্টা কামড় দেয়। এই পাল্টা কামড়ের প্রতিক্রিয়া মরিচের জাতভেদে নানা ধরনের হতে পারে। কোনোটা কামড় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখের ভিতর জ্বালা শুরু হয়, কোনোটা গলাধঃকরণ না করা পর্যন্ত টের পাওয়া যায় না, কোনোটা জিহবার আগায় জ্বালা ধরিয়ে দেয়, কোনোটা আবার সমস্ত মুখগহবরে আগুন ধরিয়ে দেয়। কোনোটার তেজ টের পাওয়ার জন্য পরদিন সকালের মলত্যাগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়! বিশ্বে প্রায় ২০ থেকে ২৭টি জাতের মরিচ আছে। এর মধ্যে পাঁচটি জাতের আবাদ হয়। রং, আকার, আকৃতিতে ও ঝালের মাত্রায় সবগুলোই ভিন্ন ধরনের।
অনেকে মরিচ পছন্দ করেন না, কারণ তারা মনে করেন ঝাল হওয়ায় খাদ্যের স্বাদ বোঝা যায় না। আসলে ব্যাপারটা উলটো। ঝাল মুখের ভেতরে খাদ্যের স্বাদ উপলব্ধিকারী কোষগুলোর মধ্যে সাড়া জাগিয়ে খাবারের সুবাস গ্রহণে উজ্জীবিত করে তোলে।
যে মরিচের এত গুণ, তার দাম হঠাৎ-হঠাৎ বাড়বেই। মরিচের দাম বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বৃষ্টি, বর্ষা, আমদানি কম হওয়া, ব্যবসায়ীদের অর্থ লোপাটের ধান্দা তো আছেই। পাশাপাশি সরকারের মতলব থাকাও অসম্ভব নয়। কারণ আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে যতটুকু তেজ বা ঝাঁজ, তা মোটামুটি কাঁচা মরিচের গুণ। এখন মরিচের সীমাহীন দামের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যদি এই জিনিস খাওয়া বাদ দিতে বাধ্য হয়, তাহলে দেশের মানুষের সামগ্রিক তেজ আরো নিম্নগামী হতে বাধ্য। আর এ কথা কে না জানে যে, শাসকের তেজহীন জড় মানুষই পছন্দ করে। তেজহীন মানুষ প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ইত্যাদি করে না। ব্যারামওয়ালা মুরগির মতো ঝিমায়। পুরো জাতিকে নিস্তেজ, ঘুমকাতুড়ে বানাতে কাঁচা মরিচের দাম বাড়ানো হয়নি—এই নিশ্চয়তা কে দেবে?
লেখক : রম্য রচয়িতা

