বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জ প্রত্যক্ষ করা যায়, তা তিন রকম। প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঘাটতির চাপ সামাল দেওয়া। বাজেট মানে তো একটি নির্দিষ্ট সময়ের আয়-ব্যয়ের সম্ভাব্য খতিয়ান। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে হয়। সংগৃহীত আয় যথাযথভাবে ব্যয় করতে হয়। যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেটকে দেখা হয়, তাহলে সেখানে অগ্রাধিকারের প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয়। এছাড়া মূল্যবোধের বিষয়টিও থাকে। বাজেটের টেকনিক্যালি যে চ্যালেঞ্জটি রয়েছে, তাহলো—আয়কেও বাড়াতে হবে। আবার ব্যয়কেও বাড়াতে হবে। বাজেটে আয় বাড়ানোর জন্য দুটি রাস্তা রয়েছে। একটি হচ্ছে প্রত্যক্ষ করের আওতা ও হার বাড়ানো এবং কার্যকরভাবে তা আদায় নিশ্চিত করা। আর দ্বিতীয় রাস্তাটি হচ্ছে—পরোক্ষ করের আওতা, হার ও পরিধি বাড়ানো এবং তা আদায়ের ব্যবস্থা করা। পরোক্ষ কর বাড়ালে তা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সেই চাপের কারণে জনগণ বিক্ষুব্ধ হলে এটা সরকারের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে। প্রত্যক্ষ কর আদায় জোরদার করা হলে সাধারণ মানুষ তাতে খুব একটা বিক্ষুব্ধ হয় না। সমাজে যারা বিত্তবান, তাদের করজালের আওতায় আনাটা একটি চ্যালেঞ্জ। কারণ তারা খুবই শক্তিশালী। সংখ্যায় জনগণই বেশি, তাই জনগণের ওপর ট্যাক্স আরোপের মাধ্যমেই সরকার তার ব্যয় সংকুলানের ব্যবস্থা করে থাকে। তাদের ধারণা, জনগণই সরকারি ব্যয়ের সিংহভাগ সুবিধা ভোগ করছেন। সুতরাং তাদেরই বেশি করভার বহন করতে হবে। আর সাধারণ মানুষের বক্তব্য হচ্ছে—আমাদের ওপর আর কর বসিয়ো না। আমাদের এমনিতেই নাভিশ্বাস ওঠে গেছে। কাজেই ধনীদের ওপর কর বসাও। এই দ্বিমুখী সংকট মোকাবিলা করাটাই হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় চাপ হচ্ছে, এ বছর শেষের দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই নির্বাচনে জয়লাভ করতে হবে। কাজেই সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করা যাবে না। তাদের জন্য দৃশ্যত কিছু জনতুষ্টিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। জনতুষ্টি অর্জন করতে হলে সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য কমাতে হবে। সারের মূল্য কমাতে হবে। সার এক অর্থে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। কারণ সারের দাম সাধারণ কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে না থাকলে তারা কৃষি উত্পাদন করতে পারবে না। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। জ্বালানি এমনই এক উপকরণ, যা সব কাজেই প্রয়োজন হয়। রান্না করতেও জ্বালানির প্রয়োজন হয়। আবার গাড়ি চালাতেও জ্বালানির দরকার হয়। খাদ্যের মধ্যে গম এবং চাল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চাল উত্পাদনে দেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও তুলনামূলক সস্তা দামে গরিব মানুষের কাছে চাল পৌঁছে দেওয়া একটি কঠিন কাজ। সাধারণ বাজারব্যবস্থার মাধ্যমে চাল গরিব মানুষের কাছে পৌঁছানো হলে তার মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি পড়বে। তাই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম দরিদ্র ২ কোটি লোকের কাছে চাল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে, সমাজে যারা ভঙ্গুর অবস্থায় আছে, তাদের কাছে নিয়মিত তুলনামূলক কম মূল্যে চাল সরবরাহ করতে হবে। সেই চাল অভ্যন্তরীণভাবে ক্রয় করে মজুত রাখতে হয়। কিছু চাল বিদেশ থেকে আমদানিও করতে হয়। গমও ঠিক একই পন্থায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির জন্য যে চাল বা গম দেওয়া হয়, সেখানেও ভর্তুকি দিতে হবে। জ্বালানির ক্ষেত্রেও ভর্তুকি দিতে হবে। জ্বালানিতে ভর্তুকি না দিলে সারের দাম বেড়ে যাবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিজেদের গ্রামের মানুষের দল বলে দাবি করে। কাজেই খাদ্যসহ নিত্যপণ্য ভর্তুকির মাধ্যমে গ্রামে সরবরাহ করতে হবে।
কিন্তু সরকার যদি এসব ক্ষেত্রে ভর্তুকি প্রদান করে, তাহলে ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ)-এর সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি হবে। কারণ আইএমএফ বাংলাদেশকে যে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ প্রদানের জন্য অনুমোদন দিয়েছে, সেখানে ভর্তুকি ব্যাপকভাবে প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। যদিও কোন কোন ক্ষেত্রে ভর্তুকি কমাতে হবে, তা সংস্থাটি বলে দেয়নি। যেহেতু বর্তমান বছর জাতীয় নির্বাচনের বছর। তাই এখানে জনতুষ্টির ব্যাপার রয়েছে। ফলে সরকার গ্রামীণ কর্মসূচিতে দেওয়া ভর্তুকি চাইলেই কমাতে পারবে না। এখানেও সরকারকে সমস্যায় পড়তে হবে। কারণ সরকার চাইলেই আইএমএফের শর্ত পরিপূর্ণভাবে পালন করতে পারছে না। আবার সম্পূর্ণরূপে শর্তাবলি উপেক্ষাও করতে পারছে না। সরকার ভোট পাওয়ার প্রত্যাশায় যদি গ্রামীণ বিভিন্ন কর্মসূচিতে ভর্তুকি না কমায়, তাহলে আইএমএফ বলতে পারে আমাদের টাকায় এখানে ভর্তুকি দেওয়া চলবে না। আগামী আগস্ট মাসে তারা একটি মূল্যায়ন করবে। তারা দেখতে চাইবে বাংলাদেশ সরকার আইএমএফের দেওয়া শর্ত কতটা পালন করছে বা পালনের ক্ষেত্রে কতটা আন্তরিক। গত ফেব্রুয়ারি মাসে আইএমএফ তাদের অনুমোদিত ঋণের প্রথম কিস্তি বাংলাদেশের অনুকূলে ছাড়করণ করেছে। ঋণের প্রথম কিস্তি ছাড় পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কোনো শর্ত পালন করতে হয়নি। কিন্তু দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়করণের আগে সংস্থাটি বাংলাদেশের শর্ত পরিপালনের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনায় বসবে।
সরকারের জন্য আরো একটি জটিল চাপ হচ্ছে স্থানীয় মুদ্রা টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া। স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে একদিকে লাভ হবে। রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উত্পাদন ব্যয় যদি স্থানীয় মুদ্রায় একই রকম থাকে, তাহলে আগের পরিমাণ টাকা ব্যয় করে উত্পাদিত পণ্য রপ্তানি করে যে মার্কিন ডলার আয় হবে, তা দিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় বেশি পরিমাণ অর্থ পাওয়া যাবে। এতে রপ্তানিকারকরা উত্সাহিত হবেন। এই অবস্থায় রপ্তানি পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হতে পারে। কিন্তু আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী রপ্তানি পণ্যের বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। কাজেই সেখানে শুধু সস্তা পণ্য দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। আমাদের রপ্তানি পণ্যের ভিন্নমুখিতা ও বৈচিত্র্য আনতে হবে। স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানি বাড়াতে হবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে অধিক পরিমাণ মূল্য সংযোজন করতে পারে।
বিশ্বব্যাপী আর্থিক খাতে এক ধরনের মন্দাবস্থা বিরাজ করছে। এই অবস্থায় প্রতিটি দেশেই ভোক্তাদের চাহিদা কমে গেছে। করোনা-উত্তর সময়ে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করেছে, কিন্তু তা ইপ্সিত মাত্রায় এখনো পৌঁছেনি। ভবিষ্যতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার যদি হ্রাস না পায়, তাহলে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। এটা সাধারণ মানুষের জন্য খুবই উদ্বেগজনক হবে। আমদানি পণ্যের মধ্যে জ্বালানি তেল, ভোজ্য তেল, চাল, গম ইত্যাদি প্রধান। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের মূল্য হ্রাস পেলেও স্থানীয় বাজারে সেই পণ্যের মূল্য কমে না অথবা কমলেও একই মাত্রায় কমে না। যেমন—আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু স্থানীয় বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য এখনো কমেনি। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য যেভাবে কমবে, আমাদের স্থানীয় বাজারে সেভাবে কমছে না। আর সরকার যদি এসব পণ্যের ওপর দেওয়া ভর্তুকি কমিয়ে দেয়, তাহলে আগামী দিনে অভ্যন্তরীণ বাজারে এসব দাম কোনোভাবেই কমবে না। মার্কিন ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পেলে আমাদের আমদানি ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু রপ্তানি আয় সে তুলনায় বৃদ্ধি পাবে না। ফলে আগামী দিনে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই ঘটতি আমরা পূরণ করতে পারব, যদি রেমিট্যান্স প্রত্যাশিত মাত্রায় আসে। রেমিট্যান্স আসা কমেনি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আহরিত রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে যুক্ত হচ্ছে না। অনেকেই হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছে। কারণ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠালে আড়াই শতাংশ আর্থিক প্রণোদনাসহ যে মূল্য পাওয়া যায়, হুন্ডির মাধ্যমে আসা রেমিটেন্স কার্ব মার্কেটে অনেক বেশি স্থানীয় মুদ্রা পাওয়া যায়। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে রেমিট্যান্স আসছে, তা প্রকৃতপক্ষে রেমিট্যান্স কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেকেই হয়তো তাদের বিদেশে জমানো/পাচারকৃত অর্থ রেমিট্যান্সের নামে দেশে পাঠাচ্ছে।
অর্থনীতির জন্য আরো একটি জটিল চাপ হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ক্রমাগত কমে যাওয়া। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। এর মধ্যে আবার সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলার এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে বিনিয়োগ করা আছে। কাজেই প্রকৃত রিজার্ভ ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো হবে। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ যদি স্ফীত না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পণ্য আমদানিতে ও বৈদেশিক ঋন পরিশোধে সমস্যা হতে পারে। আমদানিকারকরা যদি এলসি খুলতে না পারেন, তাহলে অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি মূলধনি যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল আমদানিও কমে যাবে। এতে শিল্পায়ন ব্যাহত হবে। শিল্পায়ন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে না। শেষ পর্যন্ত সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সার্বিকভাবে প্রবৃদ্ধি বিঘ্নিত হবে।
মূলত এগুলোই হচ্ছে অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি উপায় ছিল কতগুলো ক্ষেত্রে ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার শুরু করা। আর্থিক খাতে সংস্কার দরকার। আইএমএফ বলেছে, ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের হার কমাতে হবে। বড় বড় ঋণখেলাপিকে সুবিধা দিয়ে খেলাপি ঋণ কখনোই আদায় হবে না। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টর ধনিক ঋণখেলাপি বা ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের পরিতোষণ করছে। বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ৭ শতাংশ ট্যাক্স প্রদানের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কেউই সেই সুযোগ গ্রহণ করেননি। চলতি অর্থবছরের জন্য প্রণীত বাজেটে এই সুযোগ রহিত করা হয়েছে। কালোটাকা সাদা করার সুযোগদানের বিষয়টি কোনোভাবেই ঘোষণা করা উচিত হয়নি। কারণ এটা একটি অনৈতিক ও আগেও বহুবার নিষ্ফলা কাজ হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। অর্থনীতির বৃহত্তর অর্থপাচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন: এম এ খালেক

