যদি শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড হয় তবে, সেই শিক্ষার যে নিয়মকানুন বা শিক্ষাব্যবস্থা সেই মেরুদণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যদি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারে, তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় যে সে দেশের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মানের কলেজগুলোতে 'স্নাতক' (অনার্স) পর্যায়ে প্রত্যেক বিভাগের বিভাগীয় বিষয়াবলীর পাশাপাশি, সিলেবাসে যুক্ত করে দেওয়া আছে, 'ইংরেজি ব্যাকরণ'।
একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, এই 'ব্যাকরণ' প্রত্যেকে প্রাথমিক শিক্ষার শুরু থেকেই পড়ে আসে। প্রায় বারো বছরব্যাপী একটি বিষয় শেখানোর পরও 'একাডেমিক' শিক্ষাব্যবস্থার ত্রয়োদশ, চতুর্দশ বর্ষে এসেও যদি একই ধরণের পড়া পড়তে হয়, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। একটি ধারাবাহিক পরাজয় এর ঘটনা মাত্র। কেননা, এক যুগ ধরে একটি বিষয় ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছর পড়া ও পরীক্ষা দেওয়ার পরও যদি শিখতে না পারে, এর মতো ব্যর্থতা আর কী হতে পারে?
'ব্যাকরণ' নিজে একটি বিষয় হতে পারে কি না, সে বিষয়ে বিতর্ক আছে। তবে, শিক্ষাব্যবস্থায় এটি যুক্ত করার কারণ হল, শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা শেখানো। সেই উদ্দেশ্য কি সফল হয়েছে? তাছাড়াও ইংরেজি শিক্ষার সুবিধাগুলো যে কৃত্রিমভাবে অতিরঞ্জিতকরণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এমনিতেই দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এর মাত্র ২.১ শতাংশ ব্যয় করা হয়। এই বছরের তথ্য অনুযায়ী যা বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে ১৮৪তম। সেই স্বল্প খরচের মধ্যেও দেখা যায়, ইংরেজি শিক্ষায় অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়, অথচ বাংলা বিষয়ে কম ব্যয় করা হয়। কিন্তু ফলাফল কী? এক যুগ ধরে বাংলা মাধ্যমে 'ইংরেজি' বিষয়ে দু'টি পত্র পড়ে আসার পরও কেন শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে পুরোদস্তুরভাবে লিখতে ও বলতে পারছে না?
'ইংরেজি ব্যাকরণ' কি আসলেই কোন বিষয় হতে পারে? সে নিয়ে বরাবর-ই প্রশ্ন থেকে যায়। প্রাথমিকভাবে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার জন্য হয়তো এটি একটি মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ এক যুগ ধরে যে বিষয়ে পাঠদান করা হয়, তৎপরবর্তী স্নাতক পর্যায়েও কেন এই বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হবে, তা নিশ্চয়ই ভাবনার বিষয়। 'অনেক বছর যাবত চলে আসছে' শুধু একারণেই কি বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে? 'ব্যাকরণ' সর্বোচ্চ কোন বিষয়ের 'পূর্ব বিষয়' হতে পারে। এই 'ইংরেজি ব্যাকরণ' বলে যে 'বিষয়'টির ধারণা আমাদের রয়েছে, তাকে একটি 'প্রি সাব্জেক্ট' বলা যায়। কোন বিষয় বুঝতে হলে যেমন এর কিছু নিয়মকানুন বুঝতে হয়, 'ব্যাকরণ'ও ভাষা শিক্ষার জন্য সেরকম একটি বিষয়। বিশ্বের আর কোন দেশে উচ্চশিক্ষায় এই বিষয়টিকে যুক্ত করা হয়, তা নিয়ে সত্যিই গবেষণা করা প্রয়োজন।
এবার ভাবা যাক, এর উদ্দেশ্যগত দিকটি নিয়ে। বর্তমানের 'গ্লোবাল ভিলেজ' এর প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু, এই বিষয়টি লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন যে, দীর্ঘ বারো বছর যে কোন বিষয় বিন্দু বিন্দু করে শিখলেও সেই বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করা সম্ভব। সিলেবাস নির্মাতা এবং শিক্ষাবিদগণের উচিত এ বিষয়টি গভীরভাবে অনুসন্ধান করা। অনুসন্ধান করে এর প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে, এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করা। সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করা। তবে, একটি প্রশ্ন যে থেকেই যাচ্ছে। স্নাতক পর্যায়ে কি এই বিষয় যুক্ত করার কোন স্বার্থকতা আছে? তাও, ছোটবেলার মতোই, একই সূত্র ও নিয়ম ইত্যাদি। "টেন্স কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী? ভার্ব কী? পার্টস অব স্পিচ, সাবজেক্ট ভার্ব এগ্রিমেন্ট, স্লোগান, ইমেইল, প্যারাগ্রাফ ইত্যাদি। হাতে লেখা ইমেইল লিখে কি, 'ডিজিটালাইজেশন', 'বিশ্বায়ন' এবং 'চতুর্থ শিল্প বিপ্লব' সম্ভব? যেখানে 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সি' বা 'এআই' ও 'চ্যাটজিপিটি' ইমেইল লিখে দিচ্ছে, সেখানে এখনো কি হাতে ইমেইল লেখার ন্যূনতম প্রয়োজন আছে? এরচেয়ে বরং ব্যাবহারিক ভাবে যদি করা যেত, নিশ্চয়ই আরো ভালো ফল পাওয়া যেত।
স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি শিক্ষার জন্য একটি সম্ভাব্য সমাধান হল, সাহিত্য পড়ানো। একটি ভাষার প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জন এবং এর উন্মেষ ঘটানোর জন্য, সেই ভাষার সাহিত্যপাঠ একটি ফলপ্রসূ সমাধান। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ, বিশ্ববিদ্যালয় মানের সাত কলেজ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস থেকে এমন 'বিষয়' এর পরিবর্তে 'সাহিত্য' বা অন্য কোন ফলদায়ক পদ্ধতিগত বিষয় যুক্ত করলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে বলে আশা করা যায়।
লেখক: শেখ ফাহিম ফয়সাল, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ইতিহাস বিভাগ, দ্বিতীয় বর্ষ, ফেলো গবেষক, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।

অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের হাতের লেখার প্রতিযোগিতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে গাঁজার গাছ উদ্ধার, ছাত্রলীগ নেতা বহিষ্কার