জাতীয় কন্যাশিশু দিবস

যেমন আছে দেশের কন্যাশিশুরা

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৩, ১২:৪০

প্রতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে জাতীয় কন্যা-শিশু দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশের সমাজে যাতে নারীরা ভেদাভেদ বা বৈষম্যের শিকার না হন, সেদিকে লক্ষ্য রেখে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কন্যা-শিশু দিবস পালনের আদেশ জারি করে। 

আদেশে বলা হয়, শিশু অধিকার সপ্তাহ (২৯ সেপ্টেম্বর হতে ৫ অক্টোবর) মধ্যে একটি দিন অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বর কন্যা-শিশু দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘বিনিয়োগে অগ্রাধিকার কন্যা-শিশুর অধিকার।’

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র সমূহে ২০১২ সাল থেকে প্রতিবছরের ১১ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস। এদিকে প্রতিবছরের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক শিশু সপ্তাহ পালন করা হয়। এই শিশু সপ্তাহের দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বর পালন করা হয় জাতীয় কন্যা-শিশু দিবস হিসেবে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ শিশুর উন্নয়ন, সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে বর্তমান সরকার। এই শিশুদের অন্তত ১৫ শতাংশ কন্যা-শিশু। করোনাকালে কন্যা-শিশুর ওপর বঞ্চনা বেড়ে যাওয়ায় দিবসটি বিশেষ গুরুত্ব সহকারে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় কন্যা-শিশু দিবস–২০২৩ উপলক্ষে গতকাল এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশে সফল নেতৃত্বের বিকাশে কন্যা-শিশুদের অধিকার রক্ষায় আরও বেশি সচেষ্ট হওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। 

বাণীতে তিনি বলেন, এ দিবস উপলক্ষে দেশের সকল কন্যা-শিশুসহ সব শিশুর প্রতি রইল আমার আন্তরিক স্নেহ ও ভালোবাসা। আজকের কন্যা-শিশুর মধ্যেই সুপ্তভাবে বিরাজ করছে আগামী দিনের আদর্শ মা। কন্যা-শিশুদের জন্য বিনিয়োগ হবে যথার্থ বিনিয়োগ। কারণ আজকের কন্যা-শিশুই আগামী দিনে গড়ে তুলতে পারবে একটি শিক্ষিত পরিবার ও বিশ্ব-সভায় নেতৃত্ব দানে পারদর্শী সুযোগ্য সন্তান। তিনি জাতীয় কন্যা-শিশু দিবস–২০২৩ উপলক্ষে গৃহীত সকল কর্মসূচির সাফল্য কামনা করেন।

দিবসটি উপলক্ষে গতকাল দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কন্যা-শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ তথ্য–প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকার লক্ষ্যে উন্নত বিশ্বের সুদক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। জাতীয় কন্যা-শিশু দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের সকল কন্যা-শিশুকে প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক স্নেহ ও ভালোবাসা জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি মনে করি, কন্যা-শিশুদের বিকশিত হওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপে এবং তথ্য–প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তাহলে তারা যোগ্য ও দক্ষ নাগরিক হয়ে উঠবে এবং আগামীর উন্নত–সমৃদ্ধ ‘স্মার্ট’ বাংলাদেশ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি।

সারা বিশ্বেই নানা কারণে কন্যা-শিশুরা বেশ অবহেলিত। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মর্যাদা, ভালোবাসা—সব দিক থেকেই বলতে গেলে তারা বঞ্চিত। শুধু যে আমাদের দেশের চিত্র এমন তা কিন্তু নয়। সারা বিশ্বেই কোনো না কোনো জায়গায় প্রতি মুহূর্তে অবহেলার শিকার হচ্ছে কন্যা-শিশু। পরিবার ছাড়াও সামাজিকভাবেও তারা হচ্ছে বিভিন্নভাবে নির্যাতিত। সামাজিক, রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্রসহ সমস্ত স্থানে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ দূরীকরণ হলও কন্যা-শিশু দিবস অন্যতম উদ্দেশ্য। গৃহ-পরিবেশে একজন পুত্রসন্তানকে যেভাবে গুরুত্ব সহকারে আদর-যত্নে লালনপালন, শিক্ষার প্রতি যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেভাবেই একজন কন্যা-শিশুর মানসিক নিপীড়নের হাত থেকে মুক্ত করার কথাই উচ্চারিত হয়ে থাকে এ দিবসে।

বিশ্বজুড়ে নারী ও কন্যা-শিশুদের প্রতি সহিংসতা ও নৃশংসতার ঘটনা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ শতাংশ শিশু, যাদের বয়স আঠারো বছরের কম। আর শিশুদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ কন্যা-শিশু যাদের পিছনে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। কন্যা-জায়া-জননীর বাইরেও কন্যা-শিশুর বৃহৎ জগত রয়েছে। স্বাধীনভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করা ছাড়াও পরিবার, সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের প্রকৃত ক্ষমতায়ন করা সম্ভব। এজন্য কন্যা-শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তাসহ বেড়ে ওঠার সব অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

কন্যা-শিশু সুরক্ষা পেলে সব বৈষম্য দূর হবে। কন্যা-শিশুদের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাফল্য অর্জন করেছে। বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে নেওয়া হয়েছে কঠোর আইন। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার অনেক কমে গেছে। অভিভাবকদের সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হতে হবে কন্যা-শিশুদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কন্যা-শিশুর অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে পুরুষকে।

দিবটি নিয়ে কথা বলার সময় ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী দিশা রায় বলছেন, আমার মতে সব দিক থেকে আমাদের দেশের কন্যা-শিশুরা ভালো নেই। কিছু কিছু দিক থেকে তারা ভালো আছে। আর সবদিক থেকে ভালো থাকাটাও সম্ভব না। আমাদের দেশে আগে কোনো পরিবারে কন্যা সন্তান হলে খুশি না হওয়ার একটা ব্যাপার ছিল সেটা আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে। আগের মতো এখন আর সেই আক্রোশগুলো নেই যেটা আগে কন্যা সন্তান হলে দেখা যেতো। তবে এখন দেখা যাচ্ছে একটা কন্যা সন্তান হলে বাবা মা যতটা খুশি হয়, তো পরবর্তীতে তারা বড় হওয়ার সাথে সাথে সামাজিক প্রেক্ষাপটে তারা অনেক বেশি কোণঠাসা হয়। সামাজিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়, নির্যাতনের শিকার হয় ও অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তো সেইদিক থেকে এখনো কন্যা-শিশুরা পিছিয়ে আছে। আমাদের সমাজে এখনও কন্যা সন্তানকে বোঝা মনে করা হয়। তবে সেই দিক থেকে আমি অনেক ভাগ্যবতী আমার মা গত ১০ বছর আগে মারা গেছে। কিন্তু আমার বাবা আমাদের ভাই-বোনকে দেখে রেখেছে বিশেষ করে আমাকে অনেক ভালোবাসে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের শিশুকন্যা সন্তানরা একেবারেই নিরাপদে নেই। সরকার নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তারপরেও শিশুকন্যারা নিরাপদে নেই। কেন নেই সেটা যদি বলি তাহলে বলবো আমরা সমাজের মানুষরা সচেতন না। আমি আমার দিকটাই বলি আমার ভাই আমাকে যতটা শাসনে রাখে বাহিরে গিয়ে যদি সে অন্য কন্যা বা নারীদের একইভাবে দেখত তাহলে আমাদের সমাজের নারীরা, শিশুকন্যারা নিরাপদে থাকতো। এরকম অনেক পরিবার আছে যারা নিজের পরিবারের কন্যাদের আগলে রাখবে কিন্তু তারাই আবার অন্যের পরিবারের কন্যাদের উপর কুনজর দিবে। তাই আমার মতে আমাদের সমাজে শিশুকন্যারা নিরাপদ নেই।

আমাদের অভিভাবকদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শিশুকন্যার অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। আমরা জানি যে একটা কন্যা সন্তান আমাদের পরিবারের জন্য অনেক উপকারী, বাবা মায়ের জন্য ভালো চিন্তা করে। কিন্তু আসলে পরিবারের মানুষগুলো কন্যাসন্তানের মন-মানসিকতা, চিন্তাভাবনা বোঝার চেষ্টা করেনা তাদের কোথায়, কেন, কি সমস্যা হচ্ছে সেদিকে গুরুত্ব দেয়না। আমরা সবাই কিন্তু জানি কন্যারা তার পরিবারের অনেক উপকারে আসে, বিপদে পরিবারের পাশে থেকে সমস্যা সমাধান করার মতো যোগ্যতা আছে। তারপরেও আমাদের দেশের কন্যাদের সঠিক অধিকার ও সুরক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়না।  

কারওয়ান বাজারের বাসিন্দা রোজা বলছেন, আমাদের দেশের কন্যারা ভালো খারাপ সবটা মিলিয়ে আছে। অনেকে পরিবারে কন্যা সন্তান হলে সেটা ভালোভাবে নেয় না। অনেক পরিবার কন্যা সন্তানকে পরিবারের বোঝা মনে করে। তারা ভাবে কন্যা সন্তানের জন্য যা করবে তার পুরটাই অপচয়। কন্যা সন্তান হলে তাদের বিয়ে দিতে হলে অনেক টাকা খরচ হবে। কন্যা তো বিয়ে দিয়ে অন্যের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হবে সে আর কি উপকারে আসবে পরিবারের। আবার তারা মনে করে কন্যারা একা চলাফেরা করতে পারেনা, নিজের কাজ নিজে করতে পারেনা। এইসব চিন্তাভাবনা থেকেই অনেকে কন্যা সন্তানকে বোঝা মনে করে। আবার অনেক পরিবার আছে যেখানে কন্যা সন্তানকে পরিবারের লক্ষ্মী মনে করে। তারা মানে সেই কন্যা সন্তান তাদের পরিবারে এসেছে বলেই তাদের পরিবারে সুখ-শান্তি, আয়-উন্নতি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের কন্যারা বর্তমান সমাজে নিরাপদ নয়। রাস্তা ঘাতে চলতে গেলে নানা ধরনের বিপদে পড়ে হয়। এমনকী শিশুকন্যারা এখন নিজের কাছের মানুষদের কাছেও নিরাপদ নয়। তাই পরিবারের অভিভাবকদের উচিৎ শিশুকন্যাদের সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। আমাদের দেশে ছেলেদের থেকে কন্যাসন্তানরা সব কিছুতে অবহেলিত। কোনো কোনো পরিবের মানুষ মনে করে ছেলেরা আমাদের দেখবে মেয়েরা তো আর আমাদের দেখবেনা। তাকে বিয়ে দিয়ে অন্যের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে তাদের এতো পড়াশোনা করিয়ে কী হবে। আবার বাইরে গিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রেও বাধা দেওয়া হয়। তো সবদিক থেকেই দেখা যায় আমাদের দেশের কন্যা-শিশুরা অবহেলিত ও নির্যাতিত। 

ইত্তেফাক/এএএম