কলকাতা বিখ্যাত আন্তর্জাতিক বইমেলায় যাওয়ার জন্য কবি ও লেখক হিসেবে তাগাদা অনুভব করি। কিন্তু সময় ও সুযোগ সবসময় হয়ে উঠে না। এবার সেই সুযোগ এসে গেলো। সম্প্রতি ঘুরে এলাম কলকাতা বইমেলা। সেই অভিজ্ঞতাই শেয়ার করছি আপনাদের সঙ্গে।
এ বছর কলকাতা বইমেলায় ছোট, বড়, মাঝারি প্রকাশকসহ লিটল ম্যাগাজিন এবং টেবিল মিলিয়ে মোট এক হাজার স্টল ছিল। আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৪-এর ফোকাল থিম ছিল ব্রিটেন। গগণচুম্বী সংবিধান বানিয়ে বইমেলায় রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে তৃণমূলের মুখপত্র ‘জাগো বাংলা’।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনার রূপ দিয়েছেন সংসদ সদস্য দোলা সেন। সেখানে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মজয়ন্তীও পালন করা হয়েছে। এছাড়া আলাদা করে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়েছে সদ্য প্রয়াত সঙ্গীতশিল্পী ওস্তাদ রাশিদ খানকে। ১৮ জানুয়ারি শুরু হয়ে বইমেলা শেষ হয় ৩১ জানুয়ারি।
সেন্ট্রাল পার্ক, মেলা গ্রাউন্ড, করুণাময়ী, সল্টলেক-কে কেন্দ্র করে প্রায় ৯টি গেট দিয়ে বইমেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশের ব্যবস্থা ছিল। আমি লাখো মানুষের ঢেউ উতরে ৩ নম্বর গেট দিয়ে চেকিং শেষে মেলায় ঢুকতেই দেখা হলো বন্ধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক পিংকী শাহার সঙ্গে।
বহুদিন পর আমার আর পিংকীর দেখা তাও আবার দেশে নয়, একেবারে কলকাতা বইমেলায়। বিষয়টি সত্যি আমাদের জন্য খুব অবাক করার এবং ভালো লাগার। চমৎকার সে মুহূর্তকে আমরা মুঠোফোনে বন্দী করতে অবশ্যই ভুল করিনি।
আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় যাওয়ার অনেকদিন আগেই আমি আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম অভিযান পাব্লিশার্স-এর স্বত্ত্বাধিকারী মারুফ হোসেইন ও স্বাতি তালপত্রের কাছ থেকে। অভিযানের ২১৯ নম্বর স্টলে স্বাতিদি আমাকে বিন্নির লাড্ডু খাইয়ে স্টলের ভেতরে নিয়ে গেলেন।
এ বছরের কলকাতা বইমেলায় রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ির ছবির আদলে স্টল নির্মাণ করে অভিযান পাবলিশার্স। দেখা হলো কবি রুদ্র গোস্বামীর সঙ্গে। আড্ডা চলতে লাগলো। যোগ দিলেন পরিচালক সৃজিত মুখার্জীও।
বাংলাদেশ প্যাভিলিনয় এ গিয়ে বেশ শিহরিত হলাম। চমৎকারভাবে রিকশা পেইন্টিংয়ে সাজানো হয়েছে সেটি। লম্বা লাইন। এই শিহরণের কারণেই প্রতিজ্ঞা করলাম প্রতিবছর কলকাতা বইমেলায় আসবো। বাংলাদেশ প্যাভিলনের অনেকটা বড় অংশজুড়ে ছিল আমাদের সাদাত হোসাইনের বই কেনার হিড়িক।
একের পর এক অটোগ্রাফ দিচ্ছেন তিনি। কথা হলো আমাদের মাঝে। ছবি তুললাম। আবার ডুব দিলাম বইমেলায়। এর মাঝে অনেক পরিচিত, স্বল্প পরিচিত বা বাংলাদেশের অনেকের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় এসে লিটিল ম্যাগাজিনের মায়ের সঙ্গে পরিচিত হবো না তা কি করে হয়! কলকাতা ব্যারাকপুরের শঙ্করী দাস কাঁচা-পাকা চুলের এই নারীকে বইমেলায় সবাই চেনেন লিটিল ম্যাগাজিনের মা বলে। হাসিমুখে বইপ্রেমীদের হাতে বই তুলে দিতে পেরেই যেন শান্তি পাচ্ছেন তিনি। পরিচয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। বই নিলাম। গল্প করলাম।
১২ বছর আগে পুত্র সোমনাথ দাসের অকাল মৃত্যুর পর থেকেই শঙ্করী দেবী সোমনাথের সময় পত্রিকাটি নিজের ছেলের মতো করেই আগলে রেখে মানুষ করেছেন। তাই প্রতি বছর একটা করে সংখ্যা বের করেন ছেলের নামে।
পাশাপাশি অল্প পুঁজির অন্যান্য সাহিত্যিকদের বই নিয়ে লিটল ম্যাগাজিনে স্টলে দেখা মিলছে এই বৃদ্ধ সন্তান হারানো মায়ের। বাড়িতে রয়েছে ৮৪ বছরের অসুস্থ স্বামী, ছোট ছেলেও অসুস্থতার কারণে প্রায় শয্যাশায়ী। বিবাহিত মেয়ের কিছুটা সাহায্য আর শঙ্করী দেবীর অসম্ভব পরিশ্রমেই চলে টানাটানির সংসার।
পণ্যের স্টলে ঢুঁ মারলাম। পুঁতি ও মাটির চুড়ি, কানের দুল, মালা কিনে ফেললাম। সেখানে পরিচয় হলো পৌলমির সঙ্গে। শান্তি নিকেতনের মেয়ে। জানালেন বাংলাদেশে আসবেন।
কলকাতা বইমেলায় ধুলো নেই, ধাক্কা ধাক্কি নেই, হইচই নেই। চারপাশ বেশ উৎসবমুখর। কলকাতা বই মেলায় আমাদের জলের গানের গান শুনছিলাম মুগ্ধ হয়ে। রাত বাড়ছিলো কুয়াশাও বাড়ছিল। একটা সময় শুধু কুয়াশা আর জলের গান।
চমৎকার অনুভূতি নিয়ে আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ছেড়ে এলাম আর মনে হলো কলকাতা বইমেলার মুল বৈশিষ্ট্যই হলো সারা বিশ্বের বিখ্যাত লেখক, কবি ও বুদ্ধিজীবীদের আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখে।

