কাশেম তার নাম, বাড়ি গাইবান্ধা। বয়স জানতে চাইলে, উল্টো প্রশ্ন করেন, কেন বয়স জানতে চান? আবার জানতে চাই থাকেন কোথায়? বলেন, হাইকোর্টের মাজারে। পরিবারের কেউ নেই জানতে চাইলে কিছু না বলে চলে যান। আশেপাশের মানুষ বলেন বয়স উনার ৭০-এর মতো। তিনি মাজারের আশেপাশে এখানেই ঘুরে ফিরে থাকেন। মাজারের তবারক খান।
কার্জন হলের কাছে বসা অবস্থায় আর বৃদ্ধ ব্যক্তির কাছে জানতে চাই কোথায় থাকেন- বলেন, যেখানে রাত হয় সেখানেই থাকেন। কোনো কাজ করেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, কাজ করতে পারি না। বয়স বেশি তো আরও কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই হাটতে শুরু করেন।
হাইকোর্ট ও তার আশেপাশে ঘুরে বেশ কয়েকজন প্রবীণ মানুষকে পাওয়া গেল যাদের বয়স ৬০-৭০ এর মতো। তারা এখানেই ঘুরেফিরে থাকেন। কেউ কেউ মাঝে মধ্যে কাজ করেন। কেউ আবার কোনো কিছুই করেন না।
পরিবারের কথা জানতে চাইলে কেউ ক্ষোভের সুরে তাদের প্রতি অবজ্ঞার কথা জানান। কেউ অভিমানে তাদের সম্পর্কে বলতে চান না। এমন পরিবারের অবজ্ঞার কথা মনে রেখে আজ ‘সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় প্রবীণদের জন্য প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রজন্মের ভূমিকা’ প্রতিপাদ্য করে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। প্রবীণ বয়সে এমন লোকদেরকে স্বাভাবিক ভাষায় ভবঘুরে বলা হলেও সমাজসেবা অধিদপ্তর বলছ, ইচ্ছে করলেই কাউকে ভবঘুরে বলা যাবে না, ভবঘুরের সংজ্ঞার কিছু শর্তপূরণ করেত হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রবীণদের জন্য গবেষণা সাপেক্ষ পরিকল্পনা করে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সম্মিলিত কার্যক্রম গ্রহণ জরুরি।
সমাজসেবা অধিদপ্তর যা বলে
সমাজ সেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) শহিদুল ইসলাম বলেন, ২০১১ সালে ভবঘুরে নীর আশ্রয় ব্যক্তি আইন হয়। এই আইনের আওতায় কেউ যদি নির্দিষ্ট কিছু সময় পর কোনো এলাকায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করে, পুলিশ তাকে আটক করে ভবঘুরে নির্দিষ্ট করে সরকারের আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠান।
সমাজসেবার তথ্য মতে, সরকারের আশ্রয়কেন্দ্রে ৯৯ জন প্রবীণ আছেন।
বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘের জার্নাল থেকে জানা যায়, ঢাকা শহরে বস্তিতে বসবাসরত প্রবীণদের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, পারিবারিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ প্রবীণের কোনো মতামত নেওয়া হয় না। ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ প্রবীণের কোনো আয় নেই। ৪১ দশমিক ৬৭ শতাংশ পরিবারে খুবই অবহেলিত।
অবহেলা না সইতে পেরে তারা অনেক সময় বাড়ি থেকে বের হয়ে যান বলে জানান গাজীপুরে দেশের প্রথম প্রবীণ নিবাসের প্রতিষ্ঠাতা খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল। তিনি বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানটি ৩৭ বছর আগে করা এখানে ২৫০ জনের মতো প্রবীণ আছে। ভবঘুরে প্রবীণদের আশ্রয় দেওয়ার মতো অবকাঠামো আমার নেই। কারণ তাদের জন্য আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আগে কয়েকবার কয়েকজন ভবঘুরে প্রবীণদের আশ্রয় দিয়ে দেখেছি, তারা মানসিকভাবে অসুস্থ হয় অন্যদের সঙ্গে অন্যদের সঙ্গে ঝগড়া করে। আবার কোনো কোনো সময় পালিয়ে চলে যান। তাই তাদের আশ্রয় দেওয়া যায় না। প্রবীণদের মধ্যে ভবঘুরের সংখ্যা ১০ শতাংশ।
বাংলাদেশের সর্বশেষ জনশুমারী অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১ কোটি ৪০ লাখ প্রবীণ আছে। যা ২০২৫ সালে হবে ২ কোটি। ২০৫০ সালে হবে সাড়ে ৪ কোটি। একটা বড় অংশ ভবঘুরে তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন।
তিনি বলেন, প্রবীণ যারা পরিবারের সঙ্গে থাকে এবং যারা পরিবারে থাকতে পারে না তাদের ওপর গবেষণা করে তথ্য দরকার। প্রবীণদের জন্য আইনও আছে, আইন করে অবস্থার পরিবর্তন সবসময় হয় না। অবস্থার পরিবর্তনে সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রবীণ নিবাসে থাকাকে সবসময় নেতিবাচকভাবে না দেখতে বলেন, কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। তিনি বলেন, এখন সময় অনেক বদলে গেছে। অনেক পরিবারের ছেলে-মেয়ে দেশের বাইরে থাকছে। বাবা-মা দেশের বাইরে যেতে চান না। তাই তাদের জন্য সরকারি বেসরকারি মানসম্পন্ন আশ্রয়কেন্দ্র প্রয়োজন। প্রবীণ বয়সে ভবঘুরে থাকা কারোরই কাম্য নয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) মো. সাব্বির ইমাম বলেন, আমাদের সমাজে এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণ বাবা-মাকে আশ্রয়কেন্দ্রে দেওয়ার মতো মানসিকতা বা পরিস্থিতি গড়ে উঠেনি। তবে অনেক পরিবার দারিদ্র্যতার জন্য বৃদ্ধ বাবা-মা আশ্রয়ও দিতে পারেন না। সরকার এমন প্রবীণদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রসহ নানারকম কার্যক্রম গ্রহণ করছে। অনেক সময় এসব তথ্য জানা থাকে না বলে তারা এই সেবা গ্রহণ করতে পারে না।

