আজ ১৭ অক্টোবর বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। বিশ্বে দারিদ্র্য এক মহামারি সমস্যা, এক নির্মম অভিশাপ, মানবতার পরম শত্রু। দারিদ্র্য মানুষে মানুষে বিভেদ-বিদ্বেষ ও বৈষম্য সৃষ্টি করে। দারিদ্র্য সত্ চরিত্র গঠনে বাধার সৃষ্টি করে। দারিদ্র্য একসময় বাংলাদেশের অভিশপ্ত বিষয় ছিল। সেই বাংলাদেশ এখন দারিদ্র্য দূরীকরণে বিশ্বে রোল মডেল। দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, কৌশল বিশ্বের কাছে এক নতুন সম্পদ। ১৯৮৭ সালের ১৭ অক্টোবর থেকে জাতীসংঘ দারিদ্র্য বিমোচন দিবস পালন করছে। দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্যের কারণে আজ বাংলাদেশ পেতে পারে নতুন কোনো সুসংবাদ।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের ২০০ বছর পর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। এরপর বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত (১৯৪৭-৭১) সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ চরম অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষমতা ছিল পশ্চিমাদের হাতে। ১৯৫৫-৬৫ সময়ে পাকিস্তান সরকার দুটি পঞ্চমবার্ষিকী পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নে বরাদ্দ দেয়, ১ হাজার ২৫০ কোটি ২০ লাখ রুপি। পশ্চিম পাকিস্তানে এ সময় বরাদ্দ ছিল, ১ হাজার ৮৫০ কোটি রুপি। ব্যক্তিমালিকানা খাতে বিনিয়োগ ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের ৩৭৩ কোটি রুপি। পশ্চিম পাকিস্তানের ছিল ১ হাজার ৩৬৩ কোটি রুপি। প্রথম বরাদ্দের মাত্র ১১৩ কোটি ৩ লাখ ৮০ হাজার রুপি ব্যয় করা হয় পূর্ব পাকিস্তানে। দ্বিতীয় বরাদ্দে সিন্ধু নদে বিদ্যুত্ উত্পাদনে অতিরিক্ত ২১১ কোটি রুপি ব্যয় করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। ১৯৬৯ সালে জাতীয় পরিষদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বলা হয়, তিন বছরে পূর্ব পাকিস্তানে মোট রাজস্ব আয় হয়েছিল ৩ হাজার ৩৪৪ মিলিয়ন টাকা। ব্যয় করা হয়েছিল ৯ হাজার ১৫৭ কোটি মিলিয়ন টাকা। পশ্চিম পাকিস্তানে রাজস্ব আয় ছিল, ৯ হাজার ১৫৭ মিলিয়ন টাকা। ব্যয় করা হয়েছিল ২২ হাজার ২৩০ মিলিয়ন টাকা। ১৯৬৫ সালে চীনের ৬ কোটি ডলার সহায়তার মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার পূর্ব পাকিস্তানে বরাদ্দ দিয়ে বাকি সব খরচ করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। অথচ সমস্ত ঋণ পরিশোধ করা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও পাটজাত দ্রব্য বিক্রি থেকে।
১৯৬৪ সালে জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থার দেওয়া ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার ঋণের ৪৫ লাখ ডলার পূর্ব পাকিস্তানে ও ৮৫ লাখ ডলার ব্যয় করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। ১৯৬৫ সালে ব্রিটেন ৬ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ড সহায়তা দিলে সব ব্যয় হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। এ সময় মার্কিন সাহায্যের ৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার পশ্চিম পাকিস্তানের বাঁধ নির্মাণে ও মাত্র ৯০ লাখ ডলার খরচ করা হয় পূর্ব পাকিস্তানে বন্যা নিয়ন্ত্রণে।
১৯৬০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের রেলপথ ছিল ৫৩৪৩.৮৯ মাইল, পূর্ব পাকিস্তানের ছিল ১৭১২.৫৫ মাইল। পাকা রাস্তা সেখানে ছিল ১০ হাজার ৬০৯ মাইল এবং পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ২ হাজার ৩৮৮ মাইল। বিমানবন্দর ২৩টির মধ্যে ১৮টি পশ্চিম পাকিস্তানে এবং পাঁচটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে ১৫টি রেজিস্ট্রেশন করা হলে ১০টির মালিক ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিরা, তাদের ব্যাংকের মূলধন ছিল ৭৫ শতাংশ। ১১টি ব্যাংকের সদর দপ্তর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। বাঙালি মালিকানাধীন দুটি ব্যাংকের মূলধন ছিল ১৬.৬ শতাংশ। পাকিস্তানিরা ব্যাংকে ১০ শতাংশ মূলধন দেখালে ঋণ পেত ৯০ শতাংশ। এ সুবিধা বন্ধ ছিল বাঙালির জন্য।
১৯৫০-৭০ বিশ বছর সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নের মোট বরাদ্দ ছিল ২৯ হাজার ৯৬০ মিলিয়ন টাকা। তখন পশ্চিম পাকিস্তানের বরাদ্দ ছিল ৬১ হাজার ৯৮০ মিলিয়ন টাকা। ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মোট রপ্তানি বাণিজ্যের আয় ছিল ৫ হাজার ৩৭০ মিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক সম্পদপ্রবাহ ছিল ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ডলার। পূর্ব পাকিস্তানের আমদানি ব্যয় ছিল ৪ হাজার ২১৬ মিলিয়ন ডলার এবং উদ্বৃত্ত ছিল ২ হাজার ৭৫৪ মিলিয়ন ডলার। একই সময় পশ্চিমাদের আয় ছিল ৪ হাজার ৪৪০ মিলিয়ন ডলার, আমদানি ব্যয় ছিল ৯ হাজার ৩১২ মিলিয়ন ডলার। বাণিজ্যঘাটতি ছিল ৪ হাজার ৮৭২ মিলিয়ন ডলার। এই ঘাটতি পূরণ করা হয়েছিল বাঙালিকে চুষে নেওয়া অর্থ দিয়ে।
১৯৭২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংক প্রথম বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে বলা হয়েছিল, ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের উন্নয়নের সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল। এখানকার মানুষ চরম দরিদ্র, মাথাপিছু আয় ৫০-৭০ ডলার। গত বিশ বছরে (৫২-৭২) আয় বাড়েনি, জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করেন ১ হাজার ৪০০ জন। বেকারত্ব ২৫-৩০ শতাংশ, লোকসংখ্যার বড় অংশ অশিক্ষিত-অকর্ম, গড় আয়ু ছিল ৫০ বছরের নিচে। আখ্যা দেওয়া হয়েছিল দেশকে বোটমলেস বাসকেট—Bottomless Basket, বোঝানো হয়েছিল দেশটিতে যা সাহায্য দেওয়া হয়, ঝুড়ির নিচ বা তল দিয়ে সব চলে (পড়ে) যায়। কারো মন সদয় ছিল না, দেশটিকে নিয়ে শুধু নেতিবাচক গবেষণা হয়েছে। সেই বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বাংলাদেশকে এশিয়ার ইমাজিং টাইগার ঘোষণা করে বলেছে, মুক্তিযুদ্ধের ৪ দশক (৪০ বছর) পর সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন, ‘বাংলাদেশ পারে’। পাকিস্তান আমলে সামরিক বাহিনীতে লোকসংখ্যা ছিল ১০ ভাগেরও কম। কিন্তু বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ জাতিসংঘের ভরসাস্থলের খ্যাতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে জাহাজ রপ্তানি হচ্ছে। পদ্মা, যমুনা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র, মেট্রোরেল, কক্সবাজারে বঙ্গবন্ধু ট্রানেল এবং সারা দেশে শত শত সড়ক নির্মাণ করে সক্ষমতার বিশাল প্রমাণ ও শক্তি প্রদর্শন করছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পূর্বে কাগজের কল ছিল দুটি, এখন ৯০টি, সিমেন্ট কারখানা ছিল ১টি, এখন আছে ৫০টি। পোশাক উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয়। আমেরিকা ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় বড় বাজার স্থান দখল করেছে পোশাকশিল্প। ৫০ হাজারের বেশি নারী পোশাক শিল্পে কাজ করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। প্রবাসী রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশকে স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ওষুধ, চামড়া, আইটি শিল্প রপ্তানিতে সেরা অবস্থানে বাংলাদেশ। ১৭২টি দেশে ৯৮ ভাগ ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। ই-কমার্স সুবিধায় প্রতিদিন শহর থেকে গ্রামে কোটি টাকার ওপর লেনদেন হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিজমিতে তিন বারের অধিক ফসল উত্পাদন হওয়ায় সবজি উত্পাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ৮ম, ধান উত্পাদনে ৭ম, পেয়ারা উত্পাদনে ৮ম, ছাগল উত্পাদনে ৪র্থ অবস্থানে রয়েছে।
ক্ষুদ্রশিল্প, বাঁশ-বেত, হস্তশিল্প, নকশিকাঁথা, ছোটদের কাপড়ের পুতুল রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। সিরামিক শিল্প-বাণিজ্য বাংলাদেশকে নন্দিত করেছে। শিক্ষিত নারী-পুরুষ নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মানসিকতা বেড়েছে। নারী-পুরুষ সমতার ১৪৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৪৭তম। ঘরে ঘরে এখন বিদ্যুত্। শতভাগ স্যানিটেশন ব্যবহার করছেন গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। মাধ্যমিক শিক্ষায় এগিয়ে বাংলাদেশ। ইউনেসকো বলেছে, ৯৬ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষায় সফলতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে সম্পদের তুলনায় জনসংখ্যা বেশি। কিন্তু নীরবে জন্মহার কমেছে। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন, পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা ও সে দেশের বুদ্ধিজীবীরা আমাদের জনসংখ্যা হ্রাসের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। জরিপমতে ১৯৭৫ সালে জন্মহার ছিল বাংলাদেশের ৬.৩ শতাংশ, বর্তমানে ২.৩ শতাংশ। চিরকাল দুর্ভিক্ষ-মঙ্গা-ক্ষুধার যন্ত্রণা ভুলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। খাদ্যাভ্যাসের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। এখন সবাই ফলমূল ও প্রচুর শাকসবজি ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ায় পুষ্টিহীনতা কমেছে। সরকার বাড়ি বাড়ি অত্যাধুনিক নলকূপ বরাদ্দ দিয়ে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করায় ডায়রিয়া, আমাশয়, বসন্ত রোগসহ পানিবাহিত রোগ অনেক কমে গেছে।
১৯৭৬ সালে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত করা হয়। স্বাধীনতার আগে ও পরে এ দেশে ৮৮ শতাংশ লোক ছিলেন দরিদ্র, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা ছিল। ১৯৭২ সালে ৭ কোটি লোকের মধ্যে ৫ কোটি ছিলেন দরিদ্র। ১৯৯১ সালে দরিদ্রের হার ছিল ৪৪.২ শতাংশ, ২০০৫ সালে ৪৩ শতাংশ, ২০১০ সালে ১৮.৫ শতাংশ, ২০১৬ সালে ১৪.৩ শতাংশ, ২০১৮ সালে ২০ শতাংশ, ২০২২ সালে ১৭.৭ শতাংশ এবং অতি-দরিদ্র ছিল ৫.৬ শতাংশ। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে বিসিএস জরিপে দরিদ্রের সংখ্যা ৫ কোটি ১৭ লাখ। বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিং দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশে সাফল্যের প্রশংসা করে বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য বিমোচনের সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। পশ্চিম পাকিস্তান আমাদের সম্পদ লুট করে সফল হতে পারেনি। পশ্চিম পাকিস্তানের দারিদ্র্য ২০২৩ সালে ৩৭.৯ শতাংশ, ২০২২ সালে ৩৯.২ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৩০ শতাংশ, গ্রামাঞ্চলে ৫৫ শতাংশ, পাঞ্জাবে ৩২ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক বলেছে, পাকিস্তানের দারিদ্র্য ৪.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫.৮ শতাংশ হয়েছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ দেশে ব্যাপক হারে, হাঁস-মুরগি, কোয়েল-কবুতর, টার্কি মোরগ, সাপ, কুমিরের ফার্ম গড়ে তোলা হচ্ছে। মাছ, শুঁটকি, চিংড়ি, কাঁকড়া, কুঁচিয়া, শামুক-ঝিনুক এমনকি কচুর লতিও বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে এ দেশে দারিদ্র্য যাবে জাদুঘরে। বাংলাদেশের নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এখানে ৫০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করে ১ কোটি ২৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে আয় বাড়বে ৪ হাজার কোটি ডলার। জিডিপি বাড়বে ২ শতাংশ। পিডব্লিউসি ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছে ২০৩০ সালে বাংলাদেশের হতদরিদ্র হ্রাস পাবে ৩ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবিরাম প্রচেষ্টা, অনিশ্চয়তা ও উত্কণ্ঠার মধ্যে থেকেও জাতিকে আলোর পথ দেখাচ্ছেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু দারিদ্র্য, সেই শত্রু এবার পরাজিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরেই দারিদ্র্য বিমোচনে পাওয়া যাবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য।
লেখক :কলামিস্ট ও সমাজবিশ্লেষক
