নির্বাচনি ইশতেহারে দ্রব্যমূল্য

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৪:২০

বিশ্বের প্রতিটি দেশের গণতান্ত্রিক দলগুলো জাতীয় নির্বাচনের আগে নিজ নিজ দলের ইশতেহার ঘোষণা করে। নির্বাচনি ইশতেহার হলো জনগণের কাছে রাজনৈতিক দলের ওয়াদা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের ২০১৪ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে বাজারে দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি স্থান পায়নি। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৩ নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নের কাজ চলছে। সেই ইশতেহারে বাজারদর নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে থাকা দরকার। এটা সাধারণ মানুষের চাওয়া। দুনিয়ার সব দেশের ক্ষমতাসীন সরকারই চেষ্টা করে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে। কারণ, দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলে সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যায়। যদিও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি নির্বাচনি ইশতেহারে অঙ্গীকারের প্রয়োজন হয় না। বাজার মনিটরিং একটি সরকারের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ, রুটিন কাজ। অথচ বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি নির্বাচনি অঙ্গীকারে অগ্রধিকার ভিত্তিতে থাকার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য একটি কার্যপ্রণালি ঠিক করে। সরকার গঠন করলে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে। সাধারণভাবে বলা যায়, দ্রব্যমূল্য ইস্যুটি ইশতেহারে উল্লেখ থাকলে দলটি তা বাস্তবায়নের তাগিদ অনুভব করবে।

কয়েক দিন আগে জার্মান গণমাধ্যম ডয়েচেভেলে তাদের দর্শকদের কাছে মধ্যে অনলাইন জরিপ পরিচালনা করেছে। জরিপের প্রশ্ন ছিল, তাদের দর্শক দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট বলে মনে করছেন কি না? উত্তরে ৯৬ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট বলে মনে করছেন না। জরিপে ভোট দিয়েছেন ৬৫ হাজার ২৪০ জন। বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশার শেষ নেই। এই হতাশা এক দিনে তৈরি হয়নি। শেখ হাসিনার সরকারের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাফল্যের পরও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বিশেষত, বিগত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের বাজার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালের বাইরে চলে গেছে। সরকার নানান কায়দা-কৌশল করেও বাজারের পাগলা ঘোড়ার লাগাম টানতে পারছে না।

সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে সরকার নানান সময়ে নানান পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর শক্তিশালীকরণ ও জাতীয় প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন করেছে। যেমন—টিসিবির মাধ্যমে সরকার দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই বাজারে সরকারনির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রি হয় না। এর মধ্যে বাজার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কিছুদিন পরপর কোনো কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের মূল্য কারসাজি করে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। কখনো মুরগি, কখনো পেঁয়াজ, আবার কখনো কাঁচা মরিচ—হুট করেই কোনো একটি পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে এ দেশের পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। ফলে পেঁয়াজের বাজারদর আকাশচুম্বী হয়ে যায়। একই অবস্থা চাল, ডাল, তেল, মুরগি, কাঁচা মরিচসহ অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও দেখা যায়।

সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্তমান সময়ের মুদ্রাস্ফীতি। মুদ্রাস্ফীতির কারণে টাকার মান গেছে কমে। করোনা মহামারির পর ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ, তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, ডলারের সংকট, সরবরাহসংকটের মতো নানান নজির মানুষের সামনে আছে। মানুষ এসব বিষয়ে সচেতন। তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো একটি পণ্যমূল্যে অস্থিরতা দেখা দিলে দেশের বাজারে তার অভিঘাত লাগে।

অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার জন্য দেশের সাধারণ মানুষ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করছেন। সরকার স্বীকার করুক আর নাই করুক, অভ্যন্তরীণ বাজারব্যবস্থায় শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। মজুতদারি, আড়তদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে যেসব ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার ধান্দায় থাকেন, সাধারণ মানুষ চায় সরকার সেই সব ব্যবসায়ীকে কঠোর হাতে দমন করুক।

মানুষের মনে প্রশ্ন আছে, দেশের বাজারব্যবস্থায় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ে। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে সরকার কি কিছু করছে? অনেকেই মনে করেন, সরকার সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে আছে। বাজার সিন্ডিকেট নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করে সবচেয়ে বেশি তোপের মুখে পড়েছিলেন শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার। ২০২৩ সালের ১১ জুন এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘অর্থনীতি ও বাজার দুই জায়গাতেই সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, যার কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঝরে পড়ছেন এবং পণ্যের দাম বেড়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।’ তিনি সঠিক কথাই বলেছেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইইডিএস)-এর সাবেক পরিচালক ড. এম আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘বাজার ব্যবস্থাপনায় যারা নীতিনির্ধারক, তাদের সঙ্গে সিন্ডিকেটের কোথাও না কোথাও সম্পর্ক আছে। সেটা লেনদেনের সম্পর্ক। তা না হলে এটা হতে পারে না। কেউ তো নির্মোহভাবে তাদের (বাজার সিন্ডিকেট) কন্ট্রোল করছে না। আপনি যদি তার কাছ থেকে সুবিধা পান, তাহলে কীভাবে নির্মোহভাবে কাজ করবেন?’ তিনি আরো বলেন, ‘শুধু এই সরকার নয়, আগের সরকারের আমলেও এটা (বাজার সিন্ডিকেট) হয়েছে।’

বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতা বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালে প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন করে। টেলিভিশনের খবরে দেখছিলাম, ছয়টি বড় প্রতিষ্ঠান আগের রাতে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে বাজারের দরদাম ঠিক করে। পরদিন তাদের ঠিক করা দামে বাজারে বিক্রি হয় ডিম ও মুরগি। এতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে ডিম ও মুরগির দাম এক দিনে এক লাফে দ্বিগুণ করে দিয়েছে। এভাবে নিজেরা সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে ১৫ দিনের কারসাজিতে বাজার থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ ঘটনা উদ্ঘাটন করে প্রতিষ্ঠান ছয়টিকে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা জরিমানা করেছে প্রতিযোগিতা কমিশন। কমিশনের চেয়ারম্যান গণমাধ্যমে বলেছেন, ব্যবসায়ীদের একটি গ্রুপের মধ্যে অধিক মুনাফা করার প্রবণতা আছে। এই প্রতিযোগিতা কমিশন ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬০টির অধিক ঘটনায় মামলা করেছে। দুঃখের বিষয়, এখন পর্যন্ত একটি মামলাও নিষ্পত্তি হয়নি। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিংয়ের কাজে সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। জনবল কম থাকায় তারা তাদের কার্যক্রম দেশের সব জেলায় পরিচালনা করতে পারছে না। ব্যবসায়ীদের মধ্যে চাপ ও দায়বদ্ধতা তৈরির জন্য এ দুটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশ সরকারের বোধ হয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে, করপোরেট বা বড় বড় গ্রুপ অব কোম্পানির হাতে কৃষিপণ্যের ব্যবসা থাকবে, নাকি সরকার নিজেই এগুলো উত্পাদকের কাছ থেকে কিনে বিতরণের ব্যবস্থা করবে। ৪০ টাকায় কৃষকের কাছ থেকে চাল কিনে সুন্দর একটি মোড়ক বা প্যাকেটজাত করে দেশের বাজারে তা ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এগুলো করছে বড় বড় গ্রুপ অব কোম্পানিজ, যারা একসময় হয়তো চালের ব্যবসা করত না, কিন্তু অধিক মুনাফার লোভে এখন চাল, ডাল, সবজি, মাছ—সবকিছুরই ব্যবসা করছে। মসলার ব্যবসা, পোলট্রি ফার্মের ব্যবসাও করছে। তারাই আবার এমপি মনোনয়ন পেয়ে রাজনৈতিক নেতা বনে যাচ্ছেন!

বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার আরেকটি বড় কারণ হলো মান্ধাতা আমলের বাজারকাঠামো। এই কাঠামোর পরিবর্তন দরকার। সিন্ডিকেটের প্রভাব চিহ্নিত করে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারে না, তার কারণ ইনফরমাল বাজারব্যবস্থা। একটি বাজারে কারা ব্যবসা করছে, তার কোনো সঠিক তালিকা সরকারের কোনো সংস্থার কাছে নেই। যেমন—ফরমাল মার্কেট ব্যবস্থায় পণ্য উত্পাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত যত এজেন্ট কাজ করে, তাদের সবারই বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর থাকে। অনিবন্ধিত কেউ এই বাজারে লেনদেন করতে পারে না। ফলে, কেনাবেচার একটা হিসাব থাকে। বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা এখনো চালু হয়নি। বিষয়টি ডিজিটাল বাংলাদেশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বাজারের প্রত্যেক ব্যবসায়ী বিজনেস কার্ডে নিবন্ধিত থাকবেন। সরকারের নজরদারি সংস্থা বাজারের প্রতিটি পর্যায়ে লেনদেনের তথ্য যাতে খতিয়ে দেখতে পারে, তেমন ব্যবস্থা থাকতে হবে। কে কী পরিমাণ পণ্য মজুত করছেন, কে কী পরিমাণ পণ্য আমদানি বা বিক্রি করছেন এবং কী দামে বিক্রি করছেন—সব তথ্য সরকারের হাতে থাকা দরকার। এছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। সেই টাস্কফোর্সের সুপারিশমালা তৈরি করে সে অনুযায়ী বাজারে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালের ৭ জুন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আজ মুনাফাখোর, আড়তদার, চোরাকারবারিরা সাবধান হয়ে যাও। ভবিষ্যতে যদি জিনিসের দাম বাড়ে, আমি তোমাদের শেষ করে দেব কারফিউ করে করে। আর যদি দরকার হয়, আইন পাশ করব। যদি চোরাকারবারি বা আড়তদারেরা আমার কথা না শোনে, তাদের ছাড়ব না।’  

লেখক: সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড লিবার্টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন