‘উত্থানপতনের মধ্যেই শেয়ার বাজারের সৌন্দর্য’

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:৩০

অনেকেই বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের শেয়ার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। আসলে শেয়ার বাজার দেশের মূল অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। দেশের পুরো অর্থনীতিই এখন একধরনের সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। শেয়ার বাজারের বর্তমানে যে অবস্থা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে, তা এক দিনে বা হঠাত্ করেই সৃষ্টি হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ার বাজারের অবস্থা ভালো যাচ্ছিল না। আমি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে শেয়ার বাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছি। ইতিপূর্বে আর কোনো রেগুলেটর এত দীর্ঘ সময়ের জন্য ফ্লোর প্রাইস নামক অবাস্তব সিদ্ধান্ত শেয়ার বাজারের ওপর চাপিয়ে দেয়নি। কোনো কোনো সময় ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা যেতে পারে বা ফ্লোর প্রাইস আরোপের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু তা কখনোই এত দীর্ঘ সময়ের জন্য আরোপ করা ঠিক নয়।

ফ্লোর প্রাইসের অর্থ হচ্ছে, একটি নির্দিষ্ট লেভেলের নিচে কোনো শেয়ারের মূল্য নামতে পারবে না। কোনো কোম্পানি যদি ব্যাবসায়িক ক্ষেত্রে খারাপ করতে থাকে, তাহলে সেই কোম্পানির শেয়ারের দাম তো নিচের দিকে নামবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে শেয়ারের দরের নিম্নগতি কৃত্রিমভাবে ঠেকিয়ে রাখা হচ্ছে। কৃত্রিমভাবে সেই কোম্পানির শেয়ার দরকে বেশি করে রাখার কোনো মানে হতে পারে না।

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে যে কোনো পণ্যের মূল্য চাহিদা ও জোগানের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। চাহিদা বৃদ্ধি পেলে একটি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। আবার চাহিদা হ্রাস পেলে বা কোনো কারণে জোগান বৃদ্ধি পেলে পণ্যটির মূল্য হ্রাস পেতে পারে। কিন্তু বাজার অর্থনীতির এই স্বতঃসিদ্ধ সূত্র ফ্লোর প্রাইস আরোপের কারণে এখানে কার্যকর হচ্ছে না। কৃত্রিমভাবে শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি করে রাখা হয়েছে। কোনো কোম্পানি যদি ব্যাবসায়িক ক্ষেত্রে ভালো করতে না পারে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা সেই কোম্পানির শেয়ার কেন ক্রয় করবেন? একজন বিনিয়োগকারী তো নানা দিক বিবেচনা করেই বাজারে কোন কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করবেন আর কোন কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করবেন না, তার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। কিন্তু ফ্লোর প্রাইস আরোপের মাধ্যমে ক্রেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ বা সীমিত করা হচ্ছে। এটা স্বাভাবিক মার্কেট হতে পারে না।  মুক্তবাজার অর্থনীতির মূল সূত্র হচ্ছে বাজার তার নিজস্ব গতিতে চলবে। সরকার বা কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেখানে অযাচিত হস্তক্ষেপ করবে না। শুধু অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি হলে সরকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাজারে হস্তক্ষেপ করবে। কিন্তু আমাদের এখানে মুক্তবাজার অর্থনীতিকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে বাজার সঠিকভাবে কাজ করছে না।

একই অবস্থা প্রত্যক্ষ করা যায় মুদ্রাবাজারে। মুদ্রাবাজারে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে নির্ধারণ করে দিচ্ছে তা বাজার অর্থনীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। মুদ্রাবাজারকে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বাজারে একাধিক এক্সচেঞ্জ রেট চালু রয়েছে। মুদ্রাবাজার বাস্তবতার আলোকে সঠিকভাবে চলছে না। ব্যাংকিং চ্যানেলে মার্কিন ডলার যে মূল্যে বিক্রি হচ্ছে কার্ব মার্কেটে তার চেয়ে অন্তত ১০ থেকে ১২ টাকা বেশি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। আগে ব্যাংকিং চ্যানেলের সঙ্গে কার্ব মার্কেটের বিনিময়হারের মধ্যে পার্থক্য ছিল এক টাকা বা দুই টাকা। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করছেন, ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় কার্ব মার্কেটে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার অনেক বেশি হওয়ার কারণে অনেকেই স্থানীয় মুদ্রায় বেশি অর্থ পাওয়ার প্রত্যাশায়  হুন্ডির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রেরণ করছেন। এতে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসা কমে গেছে। অনেকেই বলছেন, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রেরণ আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে। আসলে এই কথাটি মোটেও সত্যি নয়। রেমিট্যান্স আগের তুলনায় কমেনি বরং বেশি আসছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই স্থানীয় মুদ্রায় বেশি টাকা পাওয়ার প্রত্যাশায় ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রেরণ করছেন। ভবিষ্যতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার আরো বৃদ্ধি পাবে এই প্রত্যাশায় রপ্তানিকারকদের অনেকেই তাদের পণ্য রপ্তানির আয় নির্ধারিত সময়ে দেশে আনছেন না। একটি সূত্র মতে, অন্তত ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ রপ্তানি আয় দেশে আসা বিলম্বিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি দেশের শিডিউল ব্যাংকগুলোকে বিদেশি জমে থাকা রপ্তানি আয় দ্রুত দেশে আনার জন্য তাগিদ দিয়েছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংক মার্কিন ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করলেও সেখানে মাঝেমধ্যে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়। বাজারে মার্কিন ডলারের একাধিক বিনিময় হার কার্যকর রয়েছে। কিন্তু শেয়ার বাজারে ফ্লোর প্রাইসের ক্ষেত্রে তাও নেই। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের জন্য কার্ব মার্কেট আছে। মানুষ চাইলে সেখানেও ডলার বিক্রি করতে পারে। কিন্তু শেয়ার মার্কেটে সেটা সম্ভব নয়। শেয়ার মার্কেটে ফ্লোর প্রাইসের নিচে অর্থাত্ ১০ শতাংশের নিচেও ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে যদি কেউ একসঙ্গে ৫ লাখ টাকার বেশি ক্রয়-বিক্রয় করে। আমি শুরু থেকেই ফ্লোর প্রাইসের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। কিন্তু কেউ কর্ণপাত করেনি। বিষয়টি অনেকে অনুধাবন করতে পারেনি। বর্তমানে শেয়ার মার্কেটের যে অবস্থা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে তার পেছনে ফ্লোর প্রাইসের ভূমিকা রয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শেয়ার মার্কেট অন্য দশটি সাধারণ পণ্যের বাজারের মতো নয়। এখানে ঝুঁকি থাকবে। যে কোনো দেশের শেয়ার বাজারেই ঝুঁকি থাকে। আর ঝুঁকি আছে বলেই শেয়ার মার্কেট এতটা আকর্ষণীয়। বিশ্বব্যাপীই শেয়ার মার্কেট হচ্ছে মোস্ট লিকুইড মার্কেট। কিন্তু আমরা শেয়ার বাজারকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শেয়ার মার্কেটকে ইললিকুইড বানিয়ে ফেলেছি। অর্থনীতির সূত্র হচ্ছে, ব্যাংকে আমানতের সুদের হার বৃদ্ধি পেলে শেয়ার মার্কেট থেকে ক্যাপিটাল আউট ফ্লো হবে। কিছু দিন আগেও যেখানে ব্যাংক আমানতের ওপর সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদ দেওয়া হতো, এখন সেখানে সুদ দেওয়া হচ্ছে ৮/৯ শতাংশ। ফলে অনেকেই শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ না করে ব্যাংকে আমানত সংরক্ষণ করছেন। কারণ সেখানে ঝুঁকি কম। গত এক বছরে দেশের অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কোম্পানি তাদের ব্যবসা খারাপ দেখিয়েছে। তারা ডিভিডেন্ড প্রদান করেনি অথবা দিলেও কম দিয়েছে। কোম্পানিগুলো বলছে, তারা  মুনাফা করতে পারেনি। বিনিয়োগকারীদের অনেকেই তাদের কাছে থাকা শেয়ার কম মূল্যে বিক্রি করতে ইচ্ছুক কিন্তু ফ্লোর প্রাইসের কারণে তারা শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা মনে করছে, ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়া হলে বাজার পড়ে যেতে পারে। শেয়ার মার্কেটের চরিত্রই তো এমন। সময়ের ব্যবধানে বাজারে উত্থানপতন ঘটতে পারে। যে শেয়ার বাজারে উত্থান ঘটে না, সে বাজারে বিনিয়োগকারীরা আসে না। আবার যে বাজারে পতন ঘটে না সে বাজারেও কেউ আসে না।

এখন বাজারে ১৪ লাখ বিও অ্যাকাউন্টধারী আছেন। তবে অ্যাকটিভ বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা খুবই কম। অ্যাকটিভ বিও অ্যাকাউন্টধারীদের অনেকেই ‘ডে ট্রেডার’। বিদেশি বিনিয়োগকারী চাইলেও ফ্লোর প্রাইসের কারণে তাদের শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনেকেই আশপাশের দেশের শেয়ার মার্কেটি বিনিয়োগ করছেন। ফ্লোর প্রাইসের ব্যাপারে ইতিবাচক এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না হলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে বলে মনে হয় না। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোও ফ্লোর প্রাইসের ব্যাপারে কিছু বলছে না। ব্যাংক, বিমা কোম্পানির যেসব ব্রোকারেজ হাউজ আছে, তারা কোনোভাবে টিকে আছে। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্রোকারেজ হাউজগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ।

শেয়ার বাজারে কীভাবে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা ট্রেডিং করতে হয়, এসব ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বেশ কিছু সংস্থা আছে। সেখানে একজন বিনিয়োগকারী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ এখানে বড় সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে বিদ্যমান অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা স্বাধীনভাবে বিনিয়োগ করতে পারছেন না। বাজার তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারছে না। কোম্পানিগুলো যদি ডিভিডেন্ড প্রদান না করে, তাহলে সেই কোম্পানির শেয়ার বিনিয়োগকারীরা কেন ক্রয় করবেন? একটি কোম্পানি বছরান্তে কী পরিমাণ ডিভিডেন্ড দিচ্ছে সেটা দেখেই মূলত বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ক্রয় করে থাকে। কাজেই কোনো কোম্পানি যদি বছর শেষে ডিভিডেন্ড প্রদান না করে, তাহলে সেই কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ের ব্যাপারে বিনিয়োগকারীগণ আগ্রহী হবেন না, এটাই স্বাভাবিক। আগামী দিনে শেয়ার বাজারে কীভাবে আরো গতিশীল এবং চাঙ্গা করা যায়, সে ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় শেয়ার বাজার অর্থনীতিতে তার প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারবে না।

লেখক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও শেয়ার বাজার বিশ্লেষক

অনুলিখন: এম এ খালেক

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন