গাজা এখনো অশান্ত, সন্ত্রস্ত। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গেরিলা কায়দায় হামাসের প্রতিরোধ চলছে। ইসরাইল দাবি করেছে, আল হামাস ভূমধ্যসাগরের সংলগ্ন ভূখণ্ডে ক্ষমতাচ্যুত, তারা পালাচ্ছে। ইসরাইলের এরকম দাবির ভিত্তি কী? হামাস পালটা কোনো বয়ান পেশ করেনি।
এক মাস পাঁচ দিনের সংঘর্ষে প্রথমে হতভম্ব হয়ে পড়ে তেল আবিব। সঙ্গে সঙ্গে তার পাশে দাঁড়ায় আমেরিকা ও পূর্ব-পশ্চিম ইউরোপের বহু দেশ। ওয়াশিংটন অস্ত্র ও যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে তটস্থ করে তোলে উপসাগরীয় ভূখণ্ডকে। ইরান ও প্রতিবেশী দেশগুলিতে অবস্থানরত হিজবুল্লাহ সরাসরি পালটা আক্রমণের হুমকি দেয়, কার্যত তাদের হম্বিতম্বি কতটা বাস্তবায়িত, তা অপ্রমাণিত।
আমরা দেখতে পেলাম, সিরিয়ায় ইরানি যুদ্ধবিমান পুড়ছে, সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র তীব্র আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। ইসরাইলের বিমান হামলায় গাজা অনেকটাই কবরস্থানের আকার নেয়; অন্তত ১২ হাজার ফিলিস্তিনি-শিশু-নারীনির্বিশেষে গণহত্যায়, হাসপাতালে, গৃহালয়ে প্রাণ হারালেন, পালাবার সুযোগ পেলেন না বহুসংখ্যক নিরীহ ফিলিস্তিনি। ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের রক্তাক্ত স্রোত বইল জল-স্থলে, রাতারাতি গৃহহীনদের নতুন তাঁবু তৈরি হলো জর্ডন, লেবানন ও সিরিয়া সীমান্তে। গোড়ার দিকে আরবরা গর্জন করল। ঐক্যের আওয়াজ বেজে উঠল কণ্ঠে, কিন্তু সে আওয়াজ বুকে বাজল না, হয় তারা ভয়ে পিছিয়ে গেল, নয়তো শিয়া ইরানের আধিপত্য বেড়ে উঠবে—এই আশঙ্কায় সুন্নি আরব মুখে কুলুপ আঁটল। রাষ্ট্রসংঘ গণহত্যা বন্ধের প্রস্তাব পেশ করে। সদস্য দেশগুলির বড়ো অংশ পক্ষে ভোট দিল, কোনো কোনো রাষ্ট্রের সংশয় ছিল, পরে তারা ভোট দিয়ে মতামত ব্যক্ত করল—ফিলিস্তিনি গণহত্যা চলতে দেওয়া যায় না, ইসরাইলের সংযত হওয়া দরকার।
এসব ঘটনা, প্রতিঘটনা নিছক নাটক ছাড়া আর কী! ১৯৪৮ সাল থেকে ফিলিস্তিনিরা নাটকের মর্মান্তিকতার অসহায় সাক্ষী। নেহরু-ইন্দিরার ভারতবর্ষ, অখণ্ড রাশিয়া ছাড়া আর কোন বড় শক্তি ট্র্যাজিক নাটকের অবসান চেয়েছে? ৭৫ বছর জুড়ে বিদ্বেষ ও হিংসার বলি ফিলিস্তিনিরা। ইয়াসির আরাফাত জমানা পর্যন্ত একটি জোরালো, গ্রহণযোগ্য কণ্ঠ ছিল। আল ফাতাহ তখন সবার যৌথ মঞ্চ। ইসরাইল ছাড়া প্রায় সব দেশে স্বীকৃত। ১৯৭৩ সালের পর আরাফাতও তার পুরোনো জেদ ও সংকল্প থেকে বহিঃ চ্যুত, শেষ জীবনে অনেকটাই তাকে গ্রাস করল ক্ষমতাপ্রীতি। তার মৃত্যুর পর ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসলেন মাহমুদ আব্বাস। আত্মকেন্দ্রিক ঠুঁটো জগন্নাথ। দেড় দশক ধরে ক্ষমতাসীন। তার নেতৃত্বে ফিলিস্তিন ভোটহীন, গণতন্ত্রহীন, দিশাহীন। দেশে দেশে বেহাল তার দূতাবাস। দূতাবাসের কর্মীদের কাজ কী? আয়েশ। সরগরম আনন্দ। আর ভুল স্বপ্ন যাপনের পটভূমি নির্মাণ।
এই যে, গত কয়েক মাস আগে, একে একে কিছুসংখ্যক আরব রাষ্ট্র ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলল, কোনো এক পরাশক্তির মধ্যস্থতায়, তখন বিত্তশালী সৌদি আরব ও অস্ত্রাবলি ইরান ছাড়া ব্যতিক্রমী প্রতিক্রিয়া জানাল কোন কোন দেশ? ফিলিস্তিনি দূতাবাসের তথাকথিত কূটনীতিক ও দানের অর্থে ফেঁপে ওঠা অভিজাত, উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের কণ্ঠের স্বরধ্বনি শোনা যায়নি, কেন? এরকম আরোপিত শূন্যতার সুযোগ নিল আল হামাস। আমাদের ধারণা, নির্দেশিত সন্ত্রাসের ছক সাজিয়ে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের খতম অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ল পার্শ্ববর্তী শক্তিধর। ইসরাইলের এরকম মানবিক কাণ্ড নতুন নয়। যে হামাসকে তারা সংগঠিত করল, মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সহযোগী বানিয়েছিল, আজ তাদের নির্মূল করতে তাদের ওপর গা-জোয়ারি কৌশল চাপিয়ে দিচ্ছে।
পরিত্রাণহীন সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে—কেবল গাজা নয়, কেবল বায়তুল মকাদ্দাস (জেরুজালেম) নয়, গোটা উপসাগরীয় পশ্চিম এশিয়া, সবাই রক্তঝড়ের ভয়ে কম্পমান।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন—গাজা স্ট্রিপে হামাস অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে, ফিলিস্তিনিরা আস্থা হারাচ্ছে। তার এই বিবৃতিতে সত্যের চিহ্ন কী, আমাদের জানা নেই। দূরের সরল, গা-বাঁচানো অবস্থান নিয়ে এইটুকু বলা সম্ভব, ইসরাইলের ‘বহির্দেশীয় বেরাদরের’ অভাব নেই। কণ্ঠ বাজিয়ে তেল আবিবকে তারা ক্রমাগত মদত দেবে। প্রতিদিন পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরীক্ষানিরীক্ষায় অভ্যস্ত ও সফল ওখানকার রাষ্ট্রশক্তি। উগ্র জাতীয়তাবাদীরা হামাসের হামলার প্রতিশোধের জন্য তাদের পণবন্দিদের মুক্ত করার ক্ষেত্রে যে কোনো ভয়ংকর ঝুঁকি নিতে পারে।
‘মুক্তধারা’র রচনাকাল থেকে ‘রক্তকরবী’ পর্যন্ত জাতীয়তার উগ্রতা নিয়ে বারবার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তার দৃষ্টিতে তখন ইউরোপের আগ্রাসি ছায়া, যে একই সঙ্গে বেদনাকাতর ও প্রতিশোধকামী। ইসরাইলের আগ্রাসন, হামাসের অস্ত্রাঘাত এবং পশ্চিম এশিয়ায় বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া, প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তী বিধ্বংসী পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির সংকেত ও সংকট ডেকে আনবে না, কে বলবে!
পাড়ায়-খেলার মাঠে, রাজনীতির ময়দানে জয়ী ও পরাজিত শক্তি যে দেহভঙ্গি ও কণ্ঠভঙ্গি প্রয়োগ করে, তা সভ্যভব্যের ভাষা নয়; গুহাবাসী-জঙ্গলবাসীর শব্দ ও বাক্য তাদের ধাওয়া করে। যুদ্ধরত রুশ-ইউক্রেন বা গাজা-ইসরাইলের যুযুধানদের একই ধরনের উগ্রতা থেকে দূরে থাকা কি সম্ভব? না। দ্বিতীয় মহাযুদ্বের পর যে কালো ঘোড়া দাপিয়ে দাপিয়ে বিজ্ঞানের মহত্ অবদানে আলকাতরা লেপটে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল, তাকেই প্রশ্রয় দিচ্ছে অস্ত্রবাজ ও অস্ত্রব্যবসায়ীদের মত্ত ও কৌশলরত উর্বর মস্তিষ্ক। এ কথা বলতে গিয়ে বড্ড অসহায় বোধ করছি। দৃষ্টিতে ভেসে উঠছে ইউক্রেন বা গাজা স্ট্রিপের শিশুদের ঝলসানো দেহ, ভস্ম-অর্ধভস্ম বাড়ি, নিষ্পত্র বৃক্ষ ও কঙ্কাল। তবু অস্ত্রাঘাতের বিরাম নেই, ধেয়ে আসছে অগ্নিযানের কবন্ধরা—এই বুঝি আমাদেরও উড়িয়ে দেবে, পুড়িয়ে খাবে সর্বাঙ্গ। প্রেমহীন-হূদয়হীন-নির্জলা পৃথিবীকে কতদিন বরদাস্ত করতে হবে আর। নেতিকে প্রশ্রয় দিতে নেই, কিন্তু নেতি যখন সর্বময় হয়ে ওঠে, তখন তাকে প্রত্যাঘাত করতেই হবে—নয়তো গিলতে হবে গোগ্রাসে নিজেকে, খেতে হবে নিজের রক্ত। আমরা কি আমাদের সন্তান ও ভবিষ্যতের লাশ নিয়ে তাণ্ডব দেখে যাব! এরকম ধ্বংসপ্রবণ পরিস্থিতি মানা যায় না। যুদ্ধকে ধিক্কার। ধিক সায়লেন্ট মেজরিটির বিভ্রান্ত-অবরুদ্ধ কণ্ঠ।
লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক, পশ্চিমবঙ্গের ‘আরম্ভ’ পত্রিকার সম্পাদক

