শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

গাজা বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলো কেন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে

আপডেট : ১১ জুন ২০২৪, ০৪:৩০

দক্ষিণ আফ্রিকায় জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতে গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা নিয়ে যে বিচার কার্যক্রম চলছে, তাতে গত সপ্তাহে যোগদান করেছে স্পেন। ইউরোপের তিনটি দেশ স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরই এ ঘটনা ঘটল। এতে বোঝা যাচ্ছে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা নীতির দীর্ঘসূত্রতা থেকে সরে আসছে এই দেশগুলো।

আমেরিকার চিন্তাধারা হলো, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠার জন্য ওয়াশিংটনের পৃষ্ঠপোষকতায় ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে একটি আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হওয়া উচিত। তবে বছরের পর বছর ধরে এ ধরনের কোনো ফলপ্রসূ আলোচনা হয়নি। ইতিমধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে তার নীতির পরিবর্তন সাধন করেছে। বিশেষত পূর্ব জেরুজালেমের ওপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্ব রয়েছে বলে এক রকমের ছাড় দিয়েছে। ইসরাইলকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ করা ছাড়াও তেল আবিবকে জবাবদিহি করার চেষ্টা করছে এমন আন্তর্জাতিক আইনি ও রাজনৈতিক সংস্থাগুলোকে প্রচ্ছন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এদিকে ইসরাইল শান্তি ও আলোচনার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক দাবি বা প্রত্যাশা মেনে নিতে অস্বীকার করে চলেছে।

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে এখন চলছে তার নিজস্ব অভ্যুত্থান। সাম্প্রতিক দশকের তুলনায় সেখানে সহিংসতা নজিরবিহীন। পশ্চিম তীর জুড়ে হাজার হাজার অবৈধ বসতি স্থাপনকারী বাড়িঘর ও গাড়িতে আগুন দিচ্ছে। দায়মুক্তিসহ ফিলিস্তিনিদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। মাঝেমধ্যে মৃদু তিরস্কার এবং কিছু বসতি স্থাপনকারীর ওপর অকার্যকর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে বটে। তা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন টু স্টেট নীতি ও অন্যান্য বিষয়ে তার ঘোষিত নীতিতে দৃঢ়ভাবে অটল রয়েছে। এই বাস্তবতা ইউরোপের জন্য একটি রাজনৈতিক দ্বিধা তৈরি করেছে।

ঐতিহাসিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শাসনামলে কিছু ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক ২০০৩ সালের যুদ্ধের নেতৃত্বে ইরাকে ওয়াশিংটনের নীতিকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করার সময় মার্কিন আরোপিত ঐকমত্যকে অস্বীকার করেন। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন মতপার্থক্যকে পর্যন্ত মিটমাট করা হয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে আবার তার ভূমিকায় ফিরে আসে। কিন্তু গাজা একটি প্রধান ব্রেকিং পয়েন্ট হয়ে উঠছে। ৭ অক্টোবরের ঘটনার পরপরই ইসরাইলের সমর্থনে পশ্চিমা ঐক্য ভেঙে গেছে। ইসরাইলি যুদ্ধে জার্মানি কিছুটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।

ইসরাইলকে গণহত্যার জন্য অভিযুক্ত করে পশ্চিম ইউরোপীয় বেশ কয়েকটি দেশের সাম্প্রতিক দৃঢ় অবস্থান, ইসরাইলকে জবাবদিহি করার লক্ষ্যে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সঙ্গে যোগদান নিঃসন্দেহে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিতবহ। যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যে, গাজায় ইসরাইলি অপরাধের মাত্রা নৈতিক সীমা অতিক্রম করেছে, যা কিছু ইউরোপীয় দেশের কাছে অসহনীয়। সাবেক আইরিশ রাষ্ট্রপতি মেরি রবিনসন সাম্প্রতিক একটি নিবন্ধে ‘আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পতনের’ ব্যাপারে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। ইউএস হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস গত সপ্তাহে রেজল্যুশন পাশ করেছে এইচআর-৮২৮২, যার লক্ষ্য আইসিসি কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ অনেকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বৈধতার পতনের কথা উল্লেখ করেছেন। তাই সমস্যা শুধু গাজা গণহত্যার বিষয় নয়, এটি পশ্চিমের ভবিষ্যত্ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

দীর্ঘকাল ধরে ওয়াশিংটন সফল হয়েছে পশ্চিমাদের সম্মিলিত স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে। এখন এটা স্পষ্ট যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সেই ভারসাম্যমূলক আইন বজায় রাখতে সক্ষম নয়। কিছু পশ্চিমা দেশকে স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণে বাধ্য করছে, যার ভবিষ্যত্ ফলাফল কতটা শুভ হবে, তা বলা যাচ্ছে না।

গতকালের আরব নিউজ থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ

লেখক :দ্য প্যালেস্টাইন ক্রনিকলের সম্পাদক এবং সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন