কে রক্ষা করিবে গাজার নিষ্পাপ শিশুদের?

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:২৩

শিশুদের তুলনা করা হয় ফুল এবং প্রজাপতির সহিত। ফুলের মতো নিষ্কলুষ মন এবং প্রজাপতি-মতো সৌন্দর্য দিয়া তাহারা সমগ্র জগৎকে আলোকিত করিয়া রাখে। এই জন্য শিশুদে ‘মহামূল্যবান’, ‘আগামীর পথপ্রদর্শক’, ‘স্বর্গের দূত’ প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয় মার্কিন সমাজকর্মী হেনরি ওয়ার্ড বিচারের ন্যায় জগদ্বিখ্যাত পণ্ডিতেরা শিশুদের মর্যাদা বুঝাইয়াছেন এই বলিয়া যে, ‘শিশুরা হইল এমন কিছু হাত, যাহার দ্বারা আমরা স্বর্গ স্পর্শ করিতে পারি।’ তলে শিশুদের সম্পর্কে সবচাইতে তাৎপর্যপূর্ণ কথাটি বলিয়াছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; তাহা-একটি বিখ্যাত উক্তি হইল, ‘প্রতিটি শিশু এই বার্তা লইয়া পৃথিবীতে আসে যে, ঈশ্বর এখনে মানুষের উপর হইতে নিরাশ হন নাই।’ অর্থাৎ, সৃষ্টিকর্তা মানুষের উপর কতটা অনুরক্ত বা বিরক্ত তাহার মাপকাঠি হইল-শিশুদের প্রতি আমরা ঠিক কী ধরনের আচরণ করিতেছি; কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা কী বলে? পৃথিবী এই স্বর্গের ফুলকে প্রস্ফুটিত হইবার সুযোগ দিতেছে, নাকি তাহাদে অঙ্কুরেই বিনাশ করা হইতেছে?

গতকাল জাতিসংঘ তাহাদের এক রিপোর্টে জানাইয়াছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় প্রায় ১ লক্ষ শিশু চরম অপুষ্টির শিকার। অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডের শিশুদের পুষ্টিহীনতা ‘আশঙ্কাজনক’ পর্যালে পৌঁছাইয়াছে বলিয়া সতর্ক করিয়াছে সংস্থাটি। শুধু তাহাই নহে, এইরূপ অবস্থার মধ্যেই মড়া-উপর খাঁড়ার ঘা হইয়া প্রতিঘাত করিতেছে প্রচণ্ড শীত ও প্রতিকূল আবহাওয়া। অবস্থা যদি এইখানে থামিয়া থাকিত, তাহা হইলে কথা ছিল না: কিন্তু গাজার শিশুদের উপর হামলা যে বন্ধ হইয়াছে সেই দাবি করিবার সুযোগ নাই। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে উঠিয়া আসিয়াছে, তিন মাস পূর্বে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির পর হইতে গাজায় বিমান হামলা ও সহিংসতায় অন্তত ১০০ শিশুর প্রাণ ঝরিয়াছে। হাতহতের সংখ্যা সন্দেহাতীতভাবে অধিক হইবে। অধিকন্তু, হামলা-শিকার গাজার অগণিত শিশু কাঠের পায়ের উপর ভর করিয়া পরিবার-পরিজনহীন জীবন যাপন করিতেছে। তাদের এই করুণ অবস্থা দেখিয়া মানবজাতির উপর ঈশ্বর কতটা অনুরক্ত বা বিরক্ত তাহা সহজে অনুমানযোগ্য।

সাম্প্রতিক আরেকটি রিপোর্টে জানা গিয়াছে, চিকিৎসার অভাবে করুণ মৃত্যুর প্রহর গুনিতেছে গাজার শিশু-কিশোররা। ইসরাইলি অবরোধ ও আগ্রাসনের মুখে এইখানকার চিকিৎসাসেবা সম্পূর্ণরূপে ভাঙিয়া পড়িয়াছে, আর সেই সুযোগে ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়াছে রোগব্যাধির। সাংঘাতিক বিষয় হইল, মরণব্যাধি ক্যানসার প্রকোপ ছড়াইতেছে ভূখণ্ডটিতে। ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুহার যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় তিন গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে বলিয়া আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলির খবরে বলা হইয়াছে। অথচ এই ধরনের পরিস্থিতিতেও দখলদার ইসরাইল গাজা হইতে রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বাহিরে যাইতে দিতেছে না; উপরন্তু, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির ন্যায় জরুরি জীবনরক্ষাকারী ঔষধের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করিতেছে। ইহার ফলে গাজায় এখন ক্যানসার শনাক্ত হওয়া মানেই অবধারিত মৃত্যু। ক্যানসার সারা শরীরে দাবানলের ন্যায় ছড়াইয়া পড়িলেও তাহা প্রতিরোধের কোনো উপায় নাই-ইহা কেমন কথা! এই নিঃশব্দ ঘাতক ব্যাধি এবং চিকিৎসার ‘কৃত্রিম সংকট’ গাজার হাজার হাজার শিশুর জীবনকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলিয়া দিয়াছে। ইহা যেন শিশুর প্রতি অমানবিকতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত।

এমন একটি প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠতে পারে, কে রক্ষা করিবে গাজার নিষ্পাপ শিশুদের-যাহারা ‘যুদ্ধ’ নামক শব্দটির কিছু না বুঝিয়াও ইহার নির্মমতার শিকার? শুধু গাজা বা ফিলিস্তিন নহে, বিশ্বের আরো বিভিন্ন প্রান্তে যেই সকল যুদ্ধ এবং যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করিতেছে এবং সেই সকল সংঘাতে প্রতিদিন যেই বিপুলসংখ্যক শিশু হতাহতের শিকার হইতেছে, তাহাদের বাঁচাইবে কে? অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান, বিশ্বে যুদ্ধ-সংঘর্ষ বাড়িবে বই কমিবে না। সুতরাং, এই ফুল এবং প্রজাপতিরা কীভাবে নিষ্কৃতি পাইবে? বিশ্ব মানবতাকে সময় থাকিতে ভাবিয়া দেখিতে হইবে, শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে আমরা মহান সৃষ্টিকর্তাকে আরো নিরাশ করিব কি না?

ইত্তেফাক/এমএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন