সখি ভাবনা কাহারে বলে, সখি যাতনা কাহারে বলে
তোমরা যে বলো দিবস রজনী ভালোবাসা ভালোবাসা কারে কয়
সে কি কেবলি যাতনাময়
সুখ ও যাতনার সংমিশ্রণে একাকার ভালোবাসা বলতে মানুষের মনের আবেগ ও অনুভূতিকে বোঝায়। যা দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না তবে অনুভব করা যায়। আর মানুষ সেই ভালোবাসাকে তার কথা, চাহনি কিংবা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রকাশ করে।
আসলে ভালোবাসা হচ্ছে একে অন্যের প্রতি অতিরিক্ত স্নেহের প্রকাশ। সাধারণত একতরফা ভালোবাসাকে পূর্ণাঙ্গ ভালবাসা বলা হয় না, ভালোবাসা হচ্ছে দুটি হৃদয়ের মিলন যেখানে একজন অন্যজনের প্রতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি হতে পারে শারীরিক বা মানবীয়। তবে যে সম্পর্ক শুধু শরীর নির্ভর সেটাকে ভালোবাসা না বলে জৈবিক চাহিদা বলাই ভালো।
সত্যিকার অর্থে ভালোবাসা বলতে আমরা নিঃস্বার্থতাকেই বুঝি, যেখানে নিঃস্বার্থভাবে একজন অন্যজনকে ভালোবেসে যাবে। প্রত্যেক মানুষই চান তার ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে সুখে থাকতে। কিন্তু সে স্বপ্ন কখনো সত্যি হয়, আবার কখনো হয় ভেঙে চুরমার।
এইভাবেই ভাঙা গড়ার মধ্যে দিয়ে চলতে থাকে ভালোবাসার খেলা। আর ভালোবাসার এ ভাঙাগড়ার খেলায় দিনদিন অমরাও অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি।
১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইনস ডে। যুগ যুগ ধরে এ দিবসটিকে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। একজন ভালোবাসা প্রেমী ও সচেতন মানুষ হিসাবে ভ্যালেন্টাইনস ডে এর লুকানো ইতিহাস।
ভ্যালেন্টাইন সপ্তাহের প্রথম দিন ৭ ফেব্রুয়ারি হল রোজ ডে এবং এই বিশেষ উপলক্ষে দম্পতিরা একে অপরকে ফুল দিয়ে তাদের ভালবাসা প্রকাশ করে। ইতিহাস বলে, মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর এর বেগম নুরজাহান লাল গোলাপ এতটাই পছন্দ করতেন যে তার স্বামী তাকে খুশি করার জন্য প্রতিদিন টন পরিমানে ফুল উপহার হিসেবে পাঠাতেন।
এছাড়া রাণী ভিক্টোরিয়ার সময়ে মানুষ একে অপরকে মুগ্ধ করতে বা অনুভূতি শেয়ার করতে ফুল দিতে শুরু করেছিল। ধীরে ধীরে এই প্রথা দম্পতিদের মধ্যে জনপ্রিয় হয় ওঠে এবং তারপর থেকে প্রেমিক প্রেমিকাদের একে অপরকে ফুল দিতে দেখা যায়।
ভ্যালেন্টাইনস ডে-এর আগে বিশেষ দিনগুলির মধ্যে দ্বিতীয় দিনটি হল প্রোপোজ ডে। রোজ ডে-এর পরের দিন ৮ ফেব্রুয়ারি এই বিশেষ দিন। ভালোবাসার মানুষকে এই দিন প্রেমের প্রস্তাব জানানোর দিন। তবে দিনটি পালনের পিছনে রয়েছে একটি সুন্দর ইতিহাস।
সে ইতিহাসের গল্প শুনতে হলে পিছিয়ে যেতে হয় ১৫ শতকের ইউরোপে। ১৪৭৭ সালের ঘটনা। মনে করা হয়, এই দিনেই অস্ট্রিয়ান আর্চডিউক ম্যাক্সিমিলান মেরি অফ বার্গান্ডিকে হীরের আংটি দিয়ে প্রেমের প্রস্তাব জানান। এর অনেক পরে ১৮১৬ সালের আরেকটি ঘটনাও এই দিনটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। রাজকন্যা শার্লটের সঙ্গে তার হবু স্বামীর বাগদানের অনুষ্ঠান এই দিনেই হয়। তারপর থেকে ভ্যালেন্টাইন সপ্তাহের দ্বিতীয় দিন পালিত হয় প্রোপোজ ডে হিসেবে।
রোজ এবং প্রোপোজ ডে এর পরের দিনটি আসে চকোলেট ডে। ভিক্টোরিয়ান যুগে রিচার্ড ক্যাডবেরি নামে এক চকোলেট-বিক্রেতা হার্ট-শেপড বাক্সে চকোলেট ভরে বিক্রি করতেন ভ্যালেন্টাইন উইকে। সেখান থেকে মনের মানুষকে চকোলেট উপহার দেওয়ার রীতি দেখতে দেখতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৫০ সাল থেকে জাপানেও ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে চকোলেট উপহার দেওয়ার প্রথা শুরু হয় মোরোজফ নামের এক চকোলেট প্রস্তুতকারী সংস্থার হাত ধরে। তবে ওই দেশে কেবল প্রেমিকারাই চকোলেট উপহার দেন পুরুষদের। এভাবেই শুরু হল চকোলেট ডে-র পথচলা। যা উনিশ শতক পার করে একুশ শতকেও সমান জনপ্রিয়।
ভ্যালেন্টাইন সপ্তাহের চতুর্থ দিনে পালিত হয় টেডি ডে। ১৯০২ সালের নভেম্বর মাসে মিসিসিপিতে শিকারে বেরিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডর রুজভেল্ট। মিসিসিপি ও লুসিয়ানিয়ার সীমান্ত সমস্যা নিয়ে তখন জর্জরিত তিনি। অনেকক্ষণ খুঁজেও সে দিন ভাল শিকার পাননি রুজভেল্ট। এ দিকে নিশপিশ করছে রাইফেলেন ডগা। প্রেসিডেন্টকে খুশি করতে তার সঙ্গীরা ধরে আনেন এক লুসিয়ানিয়া কালো ভাল্লুক ছানা। কিন্তু গাছের গুঁড়িতে বেঁধে রাখা ভল্লুক ছানার উপর গুলি চালাতে মন চায়নি রুজভেল্টের। ছোট্ট ছানাটিকে ছেড়ে দেন তিনি। ‘ড্রইং দ্য লাইন ইন মিসিসিপি’ কার্টুনে এই গল্প তুলে ধরেন ওয়াশিংটন স্টার কার্টুনিস্ট ক্লিফর্ড বেরিম্যান। ছবিতে তিনি আঁকেন টেডি রুজভেল্ট রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তার পিছনে ছোট্ট এক ভাল্লুক ছানা।
এই কার্টুন দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ব্রুকলিনের খেলনার দোকানের মালিক মরিস মিচম। তিনি বানিয়ে ফেলেন মিষ্টি এক টেডি বেয়ার। তবে তা বিক্রি করার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না তার। দোকানের জানলার পাশে সাজিয়ে রাখেন টেডি। পাশে বেরিম্যানের আঁকা কার্টুনের কপি। তাকে অবাক করে খদ্দেররা দোকানে ঢুকেই কিনতে চান টেডি। মিচম ছুটে যান রুজভেল্টের কাছে। তার ও তার স্ত্রীর বানানো বেয়ার বিক্রির অনুমতি চান। জন্ম হয় টেডি বেয়ারের। আর সেই থেকেই শুরু হয় ভালোবাসার মানুষকে টেডি উপহার দিয়ে টেডি ডে পালন ।
যুগ যুগ ধরে ভালোবাসার গভীরতা বোঝাতে চুম্বন এক অনবদ্য ভাষা। বিশ্বের প্রথম চুম্বনটি ছিল ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বে। ভন ব্রায়ান্ট, টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নৃতত্ত্ব অধ্যাপক ড এর গবেষণা অনুযায়ী বৈদিক সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থে চুম্বনের উল্লেখ রয়েছে। বেদ হিসাবে পরিচিত এই ধর্মগ্রন্থগুলো ছিল হিন্দু ধর্মের ভিত্তি।
এরপরে, প্রাচীন ভারতীয় এবং হিন্দু সাহিত্যে চুম্বন অব্যাহত ছিল। মহাভারতে একটি সংস্কৃত মহাকাব্য একটি লাইনের লাইনের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াও প্রাচীন এসব সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থে কামসূত্র ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের চুম্বন পদ্ধতির উপর একটি অধ্যায় রয়েছে।
চুম্বন কেবল রোমান্টিকতাই নয়। এটি বন্ধুত্ব বা বিশ্বাসঘাতকতার লক্ষণও হতে পারে। ইন ম্যাথু এবং মার্ক এর প্রথম শতাব্দীর লেখায় পাওয়া গেছে, জুডাসের বিশ্বাসঘাতকতার ব্যাপারে। জুডাস যীশুকে হত্যার আগে চুম্বন করেছিল। এরপর থেকেই চুম্বন হয়ে ওঠে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিক। মাফিয়া সাহিত্যে এবং চলচ্চিত্রে এর নামকরণ করা হয় "মৃত্যুর চুম্বন"। এর সবচেয়ে উপযুক্ত উদাহরণ হলো দ্য গডফাদার দ্বিতীয় খণ্ড। যেখানে দেখানো হয়েছিল আল পাকিনোর চরিত্রটি তার ভাই ফ্রেডোকে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য হত্যার আগে মৃত্যুর চুম্বন দেয়।
জানা যায়, ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেইটাইন’স নামে একজন খৃষ্টান যাজক ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচার-অভিযোগে তৎকালীন রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাকে বন্দি করেন। কেননা তখন রোমান সাম্রাজ্যে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দি অবস্থায় তিনি এক কারারক্ষীর অন্ধ মেয়েকে চিকিৎসা করে সারিয়ে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ওই যাজকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো আজকের এই দিনে অর্থাৎ ১৪ই ফেব্রুয়ারি।
এ ঘটনার প্রায় দু’শ বছর পর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেইটাইনস স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন দিবস ঘোষণা করেন।
তবে খৃস্টীয় এই ভ্যালেন্টাইন দিবসের চেতনা বিনষ্ট হওয়ায় ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার কর্তৃক ভ্যালেন্টাইন উৎসব নিষিদ্ধ করা হয়। ইংল্যান্ডে ক্ষমতাসীন পিউরিটানরাও একসময় প্রশাসনিকভাবে এ দিবস উদযাপন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এছাড়া অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানিতে বিভিন্ন সময়ে এ দিবস প্রত্যাখ্যাত হয়। পাকিস্তানে ২০১৭ সালে ইসলামবিরোধী হওয়ায় ভ্যালেন্টাইন উৎসব নিষিদ্ধ করে সেদেশের আদালত।
বর্তমানকালে, পাশ্চাত্যে এ উৎসব মহাসমারোহে উদযাপন করা হয়। যুক্তরাজ্যে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক প্রায় ১০০ কোটি পাউন্ড ব্যয় করে এই ভালোবাসা দিবসের জন্য কার্ড, ফুল, চকোলেট, অন্যান্য উপহার ক্রয় করতে এবং আনুমানিক প্রায় ২.৫ কোটি শুভেচ্ছা কার্ড আদান-প্রদান করা হয়।
আরেকটি খ্রিস্টীয় ইতিহাস মতে, গোটা ইউরোপে যখন খ্রিস্টান ধর্মের জয়জয়কার, তখনও ঘটা করে পালিত হতো রোমীয় একটি রীতি। গ্রামের সকল যুবকরা সমস্ত মেয়েদের নাম চিরকুটে লিখে একটি পাত্রে বা বাক্সে জমা করত। অতঃপর ওই বাক্স হতে প্রত্যেক যুবক একটি করে চিরকুট তুলত, যার হাতে যে মেয়ের নাম উঠত, সে ওই মেয়ের প্রেমে মগ্ন থাকত। আর তাকে চিঠিতে লিখত, ‘প্রতিমা মাতার নামে তোমার প্রতি এ পত্র প্রেরণ করছি’। এ রীতিটি কয়েকজন পাদ্রীদের খেয়ালে এলে তারা একে সমূলে উৎপাটন করা অসম্ভব ভেবে শুধু নাম পাল্টে দিয়ে একে খ্রিস্টান ধর্মায়ণ করে দেয় এবং ঘোষণা করেন এখন থেকে এ পত্রগুলো সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামে প্রেরণ করতে হবে। কারণ এটা খ্রিস্টান নিদর্শন, যাতে এটা কালক্রমে খ্রিস্টান ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়।
অন্য আরেকটি মতে, প্রাচীন রোমে দেবতাদের রানি জুনোর সম্মানে ১৪ ফেব্রুয়ারি ছুটি পালন করা হত। রোমানরা বিশ্বাস করত যে, জুনোর ইশারা-ইঙ্গিত ছাড়া কোনো বিয়ে সফল হয় না। ছুটির পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি লুপারকালিয়া ভোজ উত্সবে হাজারও তরুণের মেলায় র্যাফেল ড্রর মাধ্যমে সঙ্গী বাছাই প্রক্রিয়া চলত।
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে ভালোবাসা দিবসের আবির্ভাব ঘটে বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমানের হাত ধরে। লন্ডনে পড়াশোনার সুবাদে পাশ্চাত্যের রীতিনীতিতে তিনি ছিলেন অভ্যস্ত। দেশে ফিরে তিনিই ভালোবাসা দিবসের শুরুটি করেন। তার চিন্তাটি নতুন প্রজন্মকে বেশি আকর্ষণ করে। সে থেকেই আমাদের দেশে দিনটির শুরু।
এমন অনেক প্রচলিত ঘটনা, তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস নিয়ে। একেকজন একেকভাবে এর যুক্তি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন। তবে এ কথা ঠিক মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা চিরন্তন। আর এ ভালোবাসা থেকেই ভালোবাসা দিবসের উৎপত্তি।
প্রেমিক-প্রেমিকারা এই দিনটিকে ঘিরে বছর জুড়েই কল্পনার জগৎ সাজাতে থাকেন। এ দিনে নীল খামে হালকা লিপস্টিকের দাগ, একটা গোলাপ ফুল, চকলেট, ক্যান্ডি, ছোট্ট চিরকুট আর তাতে দু'ছত্র গদ্য অথবা পদ্য হয়ে উঠে উপহারের অনুষঙ্গ। যদিও সময়ের পরির্বতনে পাল্টিয়েছে ভ্যালেন্টাইন ডে’র উপহারের ধরন। ফুলের পরিবর্তে ভালোবাসার প্রকাশ নেমে এসেছে দামি কোনও দ্রব্যে।
ভালোবাসা চিরন্তন ও সার্বজনীন। বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মধ্যে অম্ল-মধুর ভালোবাসার বন্ধন অটুট থাকুক।
