রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

'স্তনকর' এর বিরুদ্ধে এক সাহসী নারীর গল্প  

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৪, ০১:১৫

নারী। এই শব্দটায় আছে মাতৃত্বের ধ্বনি, দেবীত্বের ধ্বনি। নারী কখনো মা রূপে, কখনো স্ত্রী রূপে কিংবা সকল অন্যায়ের বিনাশ করতে কখনো দেবীরূপে প্রকাশ করে নিজেকে। সকল অন্যায়, নির্যাতন এর শেষ করতে নিজেকে বিসর্জন দিতে পিছপা হন না এই কোমল, দুর্বল নামধারী নারীরা।

দক্ষিণ ভারতের কেরালা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আবহাওয়া আর স্থানীয় মানুষদের আন্তরিকতা , এই জায়গার বৈশিষ্ট্য। তবে আজ ফিরে যাবো ১০০ বছর আগের সময়ে। 

চেরথালা, কেরালার ছোট্ট একটি শহর। সেই শহরে থাকতেন নাঙ্গেলি নামের এজহাভা গোত্রের নিম্নহিন্দু বর্ণের একজন মহিলা। তার স্বামীর নাম ছিল চিরুকান্দান। এই দম্পতি ছিল নিঃসন্তান। তাঁরা ছিল অতি সাধারণ মানুষ। চাষাবাদ করে জীবন নির্বাহ করতো।

ওই রাজ্যের শাসক, কিছু অদ্ভুত নিয়ম প্রচলন করেছিলেন এজহাভা, থিলা এরকম নিম্নবর্ণের হিন্দুদের জন্যে। অলংকার পরলে কর দিতে হবে, নিম্নবর্ণ হিন্দুরা পূজা প্রার্থনা করতে মন্দিরে যেতে পারবে না, আর সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল আরেক ধরনের কর। স্তন কর। নিম্নবর্ণের হিন্দু নারীরা নিজের বুকের ঊর্ধ্বাংশে কোনো কাপড় রাখতে পারবে না, অর্থাৎ নিজেদের স্তন ঢেকে রাখার জন্য তাদের কর প্রদান করতে হবে! নাঙ্গেলি, এই করপ্রথার বিরুদ্ধে এক সাহসিক প্রতিবাদ করলেন। পেয়াদারা যখন তাঁর শরীর ঢেকে রাখার জন্য কর চাইতে আসলো, তখন তিনি তার স্তন কেটে কলাপাতায় মুড়িয়ে ওই পেয়াদাদের কর শুল্ক হিসেবে দিয়ে দিলেন! অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নাঙ্গেলির মৃত্যু হলো, এবং স্ত্রীবিয়োগের ব্যথা সহ্য করতে না পেরে স্বামী চিরুকান্দান জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপ দিলেন। ভারতের ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম পুরুষ সতীদাহ!

নিজের নারীত্ব অভিশাপ হয়ে বেঁচে থাকুক নাঙ্গেলি সেটা চাননি। তিনি বর্ণপ্রথা মানতে চাননি। তিনি চাননি, ভোগ্যপণ্যের মতো তার শরীরের উপর কর আরোপিত হোক। এর প্রতিবাদস্বরূপ সে তাঁর স্তন কেটে ফেলে। তার মৃত্যুবরণের ঘটনায় সবাই ফুসে উঠে। মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। অবশেষে রাজা রহিত করতে বাধ্য হয় বর্বর সেই স্তনকর প্রথা। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়টি হচ্ছে খোদ হিন্দু পুরোহিতরাই তখন বলেছিল যে, নিচু বর্ণের নারীদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করা ধর্ম বিরোধী।

নাঙ্গেলির মৃত্যুতে স্তনকর রহিত হলেও শরীর আবৃত অনাবৃত রাখা না রাখা নিয়ে অনেক ঘটনার জন্ম হয় ভারতবর্ষে। এমনকি ১৮৫৯ সালে এই বিষয়টি নিয়ে দক্ষিণ ভারতে একটি দাঙ্গাও সংগঠিত হয়। এই দাঙ্গাটি ‘কাপড়ের দাঙ্গা’ হিসেবে পরিচিত। দাঙ্গার বিষয় ছিল, নারীদের শরীর আবৃত রাখার অধিকার। যে অধিকারের জন্যে ১৮৫৯ সালের দাঙ্গার অনেক বছর আগেই প্রাণ দিয়েছিলেন এক হতভাগ্য নারী নাঙ্গেলি। 

আজ ২০২৩ সালে, কেরালার চেরথালার ওই গ্রামের নাম হয়েছে 'মুলাচ্চিপুরাম" যার মানে দাঁড়ায় " দ্য ল্যান্ড অফ দ্য উইমেন হু হ্যাভ ব্রেস্টস" কতো ইতিহাস লেখা আছে বইয়ের পাতায়, অথচ শরীর আবৃত রাখার অধিকার নিয়ে লড়াই করা নাঙ্গেলি, এই নামটি জানেন আর কতোজন?

ইত্তেফাক/এআই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন