বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস আজ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারেননি তামান্না

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:০০

তামান্না নূরার কথা মনে আছে? ২০২১ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় পা দিয়ে লিখে গোল্ডেন জিপিএ-ফাইভ পান তিনি। প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী নূরার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। নূরা এখন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও তিনি পড়তে পারেননি। কারণ এক জন গুরুতর প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে তার পক্ষে একা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। তাছাড়া তার পুরো পরিবারের পক্ষে ঢাকায় থেকে তাকে পড়ানোর মতো সামর্থ্য নেই।

প্রায় দুই যুগ আগে একই অবস্থার শিকার হন বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে পড়তে পারেননি। কারণ তার ক্লাসগুলো সব তৃতীয় কিংবা চতুর্থ তলায়, হুইলচেয়ার নিয়ে প্রতিদিন সেখানে গিয়ে পড়ার মতো অবকাঠামো তখনো তৈরি হয়নি। এজন্য তার এমফিলও বাতিল হয়।

আজ লিফ্ট হলেও একজন গুরুতর প্রতিবন্ধীর জন্য পরিস্থিতি অনেকটা একই রকম। এমন বাস্তবতার মধ্যে ‘ইউনাইটেড ইন অ্যাকশন টু রেসকিউ অ্যান্ড অ্যাচিভ দি এসডিজি ফর, উইথ অ্যান্ড বাই পারসন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস’ বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে এসডিজি অর্জন—এ বিষয়টিকে প্রতিপাদ্য করে পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অবশ্য প্রতিপাদ্য করেছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য তাদের নিয়ে, তাদের দ্বারা সম্মিলিত পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে এসডিজি অর্জন।

কেন পড়তে পারেননি নূরা

নূরার বাবা একজন নন-এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক। প্রকৃতির অমোঘ এক কারণে নূরার জন্ম হয় একটি মাত্র পা নিয়ে। এজন্য তার মাকে অনেক বঞ্চনার শিকার হতে হয়। মা খাদিজা পারভিন শিল্পী মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন এই মেয়েকেই তিনি সমাজে প্রতিষ্ঠিত করবেন। পড়াশোনায় আগ্রহী নূরা প্রতিটি ক্লাসে ভালো ফল করেন। কিন্তু পা দিয়ে লিখে পরীক্ষায় পাশ করতে পারলেও বাবা-মা ছাড়া তিনি চলতে পারেন না। মা-ই তার সব কাজ করে দেন। তাই তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, যশোরেই ভর্তি হতে হয়। নূরা বলেন, তাকে যশোরে পড়াতেও তার পরিবারের অনেক কষ্ট হচ্ছে। গ্রাম ছেড়ে তাদের শহরে বাড়িভাড়া করতে হয়েছে। ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনার খরচও রয়েছে। নূরা মাসে ৮৫০ টাকা শিক্ষা উপবৃত্তি এবং ২ হাজার টাকা বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে সহযোগিতা পান।

এসডিজি অর্জনে সংশয়

আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, নূরা বিজ্ঞানে পড়ে শেষ পর্যন্ত মানবিকে ভর্তি হন। কারণ তার বিজ্ঞানে পড়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, ২০১৩ সালে প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন হয়, বিধিও হয়, কিন্তু আইনের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি নেই। দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সরকারের উদ্যোগগুলো গতানুগতিক। তিনি বলেন, শিক্ষিত প্রতিবন্ধীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আলাদা প্রকল্প ও বাজেট নেই, বাজেট থাকলেও তা সামান্যই। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে তাদের জন্য কোনো কোটা নেই। নতুন করে কোটা প্রদানের বিষয়টিও ঝুলে আছে। বিসিএসে প্রতিবন্ধীদের সুযোগদানের জন্য আন্দোলন চলছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়ন এখনো ভাতাকেন্দ্রিক। ভাতা কিংবা কল্যাণমূলক কর্মপরিকল্পনা দিয়ে এসডিজি অর্জন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আলবার্ট মোল্লা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়নের অনেকগুলো সেক্টরে রোল মডেল হলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়নে অগ্রগতি হচ্ছে না। আলবার্ট মোল্লা বলেন, ডাব্লিউএইচওর হিসাব মতে, দেশে ১৫ শতাংশ প্রতিবন্ধী আছে। আর আমরা যারা কাজ করি, আমাদের হিসাব মতে, ১০ শতাংশ করে হলেও ১৭ লাখ প্রতিবন্ধীর জন্য সরকারের প্রতিবন্ধী সাহায্য সেবাকেন্দ্র আছে ১০৩টি। ৬৪ জেলায় সমন্বিত স্কুল আছে, কিন্তু এগুলোর মান ও দক্ষ জনবলের বিষয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হলে এসডিজি অর্জন সম্ভব না।

সংশ্লিষ্টরা যা বলেন
তবে ২৯ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষকে রাতারাতি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ দেওয়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. রুহুল আমিন খান। তিনি বলেন, যেসব অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, সেগুলো ভেঙে আবার করা সম্ভব নয়, তবে নতুন ভবনগুলো প্রতিবন্ধীবান্ধব করা হচ্ছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেলও করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, নূরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে তার বাবা-মাসহ হোস্টেলে রেখে পড়ার ব্যবস্থা করা হতো। তবে বিষয়টি নূরাকে জানানো হলে তিনি বলেন, তাহলে তার ছোট ভাইবোনরা কোথায় থাকতো!

ইত্তেফাক/এমএএম