সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

তাওরেম সানানুর স্বপ্ন

বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে পড়াশোনা করেছেন মণিপুরি তরুণী তাওরেম সানানু। পরিবারের অস্বচ্ছলতা কোনোভাবেই তাঁকে দমাতে পারেনি। স্থাপত্যের পঞ্চম বর্ষে এসে এমন এক প্রকল্পের ধারণা নিয়ে থিসিস করেছেন তিনি, যেখানে মুছে ফেলতে চেয়েছেন সমাজের শ্রেণিবিভেদের সীমানা। বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নয়নের ধারণায় 'Blurring the Line' শীর্ষক থিসিসটি জিতে নিয়েছে আর্কএশিয়ার সেরা পুরস্কার। নানা বাঁধা অতিক্রম করে নিজেকে মেলে ধরা তাওরেমের সাফল্যের গল্প জানাচ্ছেন তামিম হাসান

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৩, ০০:৪৬

মৌলভীবাজারের হোমেরজান গ্রামের মণিপুরি সম্প্রদায়ের মেয়ে তাওরেম। ছোটবেলায় ঢাকার বটমলী হোম গার্লস হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছেন। তবে চাকরি থেকে বাসা অবসর নেওয়ার পর আর্থিক টানাপোড়েনে গ্রামেই ফিরে যেতে হয়। সেখানে কমলগঞ্জ গণমহাবিদ্যালয়ে পড়েন তাওরেম। বাকিদের ফলাফল খুব একটা ভালো না হলেও তাওরেম নিজে থেকেই লেগে ছিলেন। ফলে উচ্চমাধ্যমিকের ফলটাও ভালো হয়। বুয়েটে ভর্তিপরীক্ষা দিয়েও টিকে যান, ভর্তি হন স্থাপত্য বিভাগে। কিন্তু পরিবার বা আত্মীয়স্বজন কারোরই ধারণা ছিল না স্থাপত্যের ব্যাপারে। তারা বরং চেয়েছিলেন মেয়ে ডাক্তার হোক। কিন্তু তাওরেম আসলে স্থাপত্য বেছে নিয়ে ভুল করেননি। এর কারণ, শিক্ষাসমাপণী বর্ষে স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্পের ধারণা নিয়ে থিসিস করতে হয়; আর তাওরেমের থিসিসটিই জিতে নিয়েছিল আর্কএশিয়ার মর্যাদাসম্পন্ন 'থিসিস অব দ্য ইয়ার ২০২২' পুরস্কার।

আর্কিটেক্টস রিজিওনাল কাউন্সিল অব এশিয়া বা আর্কএশিয়া এই মহাদেশের ২২টি দেশের স্থপতিদের নিয়ে গঠিত। স্থাপত্যবিষয়ক বিভিন্ন সম্মেলন বা সেমিনার আয়োজন করে থাকে সংগঠনটি। স্থাপত্য পেশাজীবীদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন। গেলবছর আর্কএশিয়ার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় মঙ্গোলিয়ায়, যেখানে বাংলাদেশ থেকে স্বর্ণপদকজয়ী হিসেবে তাওরেম সানানুও অংশ নেন। তিনিই ছিলেন বাংলাদেশ দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য।

পুরস্কারপ্রাপ্ত থিসিস সম্পর্কে তাওরেম বলেন, ‘শহরের বস্তিগুলোয় দিন দিন মানুষ বাড়ছে। সে তুলনায় বস্তির আর্থসামাজিক পরিবর্তন তেমন দেখা যায় না। ফলে শহরের জন্য বস্তিগুলো একসময় বোঝা হয়ে ওঠে। সেই জায়গা থেকেই আমার এ প্রকল্পের কথা ভেবেছি।’ 'ব্লারিং দ্য লাইন' সম্পর্কে তাওরেম বলেন, 'আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রতিবছরই উন্নত জীবনের আশায় হাজারো নিম্নআয়ের মানুষ বড় শহরে পাড়ি জমায়। পরে তারা বস্তিতে বসবাস করে। বস্তির আশপাশের এলাকাগুলোতেই থাকে তাদের কর্মসংস্থান, যেখানে উচ্চ আয়ের মানুষের বসবাস। এতে একধরনের সামাজিক বৈষম্যের দেয়াল প্রকটভাবে দেখা দেয়। তাদের মধ্যে কোনো 'intermediate layer' না থাকায় বস্তিগুলো আসলে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে ওঠে। আমি এই বিচ্ছিন্নতা ভাঙতে চাই।'

তাওরেম বলেন, নাগরিক জীবনের কোনো সুবিধাই বস্তির মানুষ সরাসরি পায় না। এটি তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অন্তরায়। আমি এই দুষ্টচক্র ভাঙার কথা ভেবেছি, যেখানে বস্তির বাইরের অংশে একধরনের উদ্যোক্তাবান্ধব বাজার থাকবে, যেখানে সব শ্রেণিপেশার মানুষেরই আনাগোনা ঘটবে। এতে প্রতিবেশের সঙ্গে তাদের একধরনের মিথস্ক্রিয়াও তৈরি হবে, অপরাধ কমে আসবে, অনেকের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাবে। আসলে যারা বস্তিতে বসবাস করেন, তারা দেশের বিভিন্ন এলাকা আসেন এবং তাদের মধ্যে অনেকধরনের কাজের দক্ষতা থাকে। অথচ স্বল্প পারিশ্রমিকেই তারা চাকরি করে সন্তুষ্ট থাকেন। এই মানুষগুলোর দক্ষতা সমাজের উন্নয়নে কাজে লাগানো উচিত।

সাততলা বস্তিকে 'সাইট' হিসেবে নির্বাচিত করে তিনধরনের মডিউলের ধারণা করেছেন তাওরেম। ডিজাইন সলিউশন হিসেবে ফেলনা জিনিসকে (নির্মাণসামগ্রী, বাঁশ, কাঠ, প্লাস্টিক)  পুনর্ব্যবহার করে স্থাপনা তৈরির কথা ভেবেছেন। একটি মডিউল হলো উদ্যোক্তাবান্ধব বাজার, অন্যটি জলাশয়ের পাশে সবজি চাষাবাদের জায়গা, এবং আরবান কমিউনিটি স্পেস। প্রতিটির ক্ষেত্রেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক বিষয়ে গভীরভাবে ভেবেছেন তিনি।

আপাতত ঢাকাই মসলিন নিয়ে কাজ করছেন তাওরেম সানানু। ভবিষ্যতে নিজ সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে উপজীব্য করেই স্থাপত্যচর্চার মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চান তিনি।

ইত্তেফাক/এসটিএম