রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

রোবট অলিম্পিয়াডের বিশ্বমঞ্চে যাচ্ছে ছোট্ট শামিল

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৩, ০০:৫৫

চাকরিজীবী বাবা-মায়েরা সবসময়ই তাদের সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। বাবা-মাকে ঘরে না পেয়ে সন্তানেরও সময় কাটে একাকীত্বে। এক্ষেত্রে তাদের বন্ধু হয় টেলিভিশনের কার্টুন চ্যানেল, বা বড়জোর কম্পিউটার গেমস। অথচ উজ্জ্বল ব্যতিক্রম শামিল। ছোটবেলা থেকে বইয়ের জগতে ডুবে থাকা ছেলেটি ক্লাসের আরও আট-দশজনের তুলনায় এগিয়ে তো বটেই; প্রোগ্রামিং, গণিত, রোবটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সসহ নানান দক্ষতায় কিশোরবয়সেই নিজেকে মেলে ধরেছে অনন্য উচ্চতায়। ইংরেজি মিডিয়ামের ছাত্র হলেও বাংলা পড়া ও লেখায় দারুণ পারদর্শী সে।

শামিলের পুরো নাম খোন্দকার শামিল মাহাদী বিন খালিদ। একসময় ইলেক্ট্রনিক খেলনা ভেঙে সার্কিট নিয়ে কারিগরি করতে চেয়ে বাবা-মায়ের বকা শুনতো হতো, কিন্তু বাবা-মা জানতেন না তাদের ছেলেটি স্কুল পেরোতে না পেরোতেই রোবট অলিম্পিয়াডের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। ষষ্ঠ বাংলাদেশ রোবট অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে ক্রিয়েটিভ ক্যাটাগরিতে সিল্ভার মেডেল পেয়ে শামিল এবার যাচ্ছে গ্রিসে। সেখানে নিজের তৈরি করা রোবট প্রদর্শন করবে সে। ২০২৪ সালের ১৪-১৬ জানুয়ারি গ্রিসের এথেন্সে অনুষ্ঠিত হবে আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াড।

শামিলের মা শিরিন আক্তার জাহান পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি। বাবা খোন্দকার খালিদ হোসেন সরকারি কলেজের ইংরেজির সহযোগী অধ্যাপক। দু'জনকেই কর্মক্ষেত্রে ভীষণ ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে শামিল আর তার বোন শামাইলা শাবিবা নিজেরাই নিজেদের দেখভাল করেছে বলা চলে। আর অন্যসব বাচ্চাদের মতো কার্টুন বা কমিকে ব্যস্ত না থেকে শামিল নিজে থেকে কিছু তৈরির চেষ্টা করতো। এ কাজে বোনও তাকে সঙ্গ দিতো।

ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়া এবং বইপড়ার অভ্যাসের কারণে খুব অল্পবয়সে ইংরেজিতে দারুণ দক্ষ হয়ে ওঠে শামিল। তবে বাংলা আয়ত্ত্ব করায় পিছপা হয়নি সে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকতেই পড়ে ফেলেছে জীবনানন্দের কবিতা, বিষাদসিন্ধুসহ গল্প ও উপন্যাসের অনেক বই। আর ইংরেজি ও বাংলায় সমান দখল থাকায় অনেকের কাছেই সে হয়ে ওঠে 'ডিকশনারি'। এছাড়া বইপড়ার অভ্যাস তাকে সবসময় নতুন কিছু শেখার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছে। যার ফলে ৮ বছর বয়সেই শামিল প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করে। ৯ বছর বয়সে আর্ডুইনো ব্যবহার করে বানিয়ে ফেলে ছোটখাটো রোবট। মাত্র সপ্তম শ্রেণিতে থাকতেই ইউটিউবের বিভিন্ন ভিডিও ও টিউটোরিয়াল দেখে শিখে নেয় ক্যালকুলাস।

পুরস্কারের মেডেল গলায় শামিল

পঞ্চম শ্রেণিতে থাকাকালে স্কুলে আয়োজিত জিওউইক প্রতিযোগিতায় পরিবেশ দূষণ নিয়ে সে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করে অর্জন করে তৃতীয় স্থান। তখন থেকেই তার দূরদর্শী ও উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনার লক্ষণ বোঝা যাচ্ছিল। দশবছর বয়সে ইংরেজি অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়া ছিল শামিলের জীবনে প্রথম কোনো বড়পরিসরের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া। সেখানে জাতীয় পর্যায়ের জন্য নির্বাচিত হলেও পুরস্কার জেতা হয়নি। তবে এরপর থেকে প্রতিটি প্রতিযোগিতায় সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে সে। ফিজিক্স অলিম্পিয়াড ও গণিত অলিম্পিয়াডে একাধিকবার অংশ নিয়ে পুরস্কার পেয়েছে। চলতি বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ববিখ্যাত ওয়ার্ল্ড স্কলারস কাপের ঢাকা রাউন্ড। সেখানে টিম ডিবেট, স্কলারস চ্যালেঞ্জ ও কোলাবোরেটিভ রাইটিংয়ে অংশ নিয়ে সাতটি স্বর্ণপদক এবং তিনটি রৌপ্যপদক অর্জন করেছে শামিল। পরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল রাউন্ডেও তিনটি স্বর্ণপদক ও আটটি রৌপ্যপদক অর্জন করে। আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্ট অব চ্যাম্পিয়নস রাউন্ডের জন্যও ডাক পেয়েছিল সে, বাবা-মা'কে ছাড়া একাই সেখানে যেতে হয়। সেখানেও শামিল ছিনিয়ে এনেছে সিনিয়র ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশের একমাত্র ট্রফি।

মায়ের সঙ্গে শামিল

এমন বহুমাত্রিক মেধা যার তাকে সবাই 'অলরাউন্ডার' হিসেবে জানবে, এমনটাই স্বাভাবিক। তবে সবেমাত্র ও-লেভেলে পড়া এই শিক্ষার্থী এসব অর্জন ও মেডেলের নিয়ে থেমে থাকতে চায় না। বরং তার স্বপ্ন এমন কিছু করা, যার মাধ্যমে সরাসরি দেশের উন্নয়নে অবদান রাখা যাবে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) পড়ার কথা ভাবছে সে। শামিল তার লক্ষ্য ছোঁয়ার পথে কতোটা সফল হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে সে যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তা তার চোখেমুখের চাহনিতে স্পষ্ট।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন