মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বিশ্বের প্রথম নিরামিষ সাবান, যার বিজ্ঞাপনে ছিলেন কবিগুরু 

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৪, ০১:৫৮

পরিচ্ছন্নতা অথবা সৌন্দর্য; সবেতেই সাবানের ব্যবহার অপরিহার্য। রসায়নের ভাষায় সাবানকে বলা হয় ‘সল্ট অব ফ্যাটি অ্যাসিড’ অর্থাৎ চর্বি থেকে প্রাপ্ত লবণের মতো পদার্থ। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ২৮০০ সালের দিকে ব্যাবিলনীয় সভ্যতার বাসিন্দারা প্রথম সাবান উৎপাদন করেন। ১৮০০ শতকে ইউরোপিয়ানরা পরিচ্ছন্নতা ও সুস্বাস্থ্যের সমন্বয়কারী হিসেবে সাবানকে চিহ্নিত করে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে। 

কিন্তু আমাদের ভারত উপমহাদেশে সাবান কী করে এলো, তার পেছনে রয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস। ২০ শতকের শুরুতে ভারতবর্ষে স্বাধীনতার আন্দোলন জোরদার হতে শুরু করে। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব গড়ে উঠতে থাকে সবার মাঝেই। তখন ইউরোপ থেকে আনা শূকর ও দেশীয় মহিষের চর্বিযুক্ত সাবানের চালান আসতে থাকে। কিন্তু পশুর চর্বি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের জন্যেই অশুচি হওয়ায় কেউ ওই পণ্য কিনতে রাজি হচ্ছিল না।

এরপরের গল্পটা ভারতের প্রয়াত উকিল আরদেশির গোদরেজে একজন দূরদর্শী ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার। ১৮৯৫ সালে তিনি ওকালতিতে খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতির ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু পণ্যের গায়ে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ সিলের জন্য এক বড় ক্রেতা হাতছাড়া হয়ে যায় তার। এই ব্যবসা ছেড়ে তাই তালা বানানোর ফ্যাক্টরি খোলেন, যেখানে প্রথম সাফল্য আসে। অবশ্য দেশমাতাকে ছোট করে দেখার ব্যাপারটা ভুলে যাননি তিনি। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আন্দোলন শুরু করার মনোভাব গড়ে উঠতে থাকে সবার মাঝেই। গোদরেজও যুক্ত হন স্বাধীনতা আন্দোলনে। ওই সময় তালা ব্যবসায়ের পাশাপাশি তার আগ্রহ তৈরি হয় সাবানের প্রতি, যা তখনো ইউরোপ থেকে আসা নতুন পণ্য মাত্র। স্বদেশি ভাবনায় নিমজ্জিত গোদরেজ দেখলেন, এসব সাবান তৈরি হয় পশুর চর্বি (লার্ড ও ট্যালো) থেকে, যার মাঝে গরু, মহিষ আর শূকরের চর্বি আছে। 

উল্লেখ্য, বন্দুকের কার্টিলেজে পশুর চর্বি আছে; এরকম ধারণা থেকেই ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব ঘটে। 

এই সুযোগ হাতছাড়া করেননি গোদরেজ, ১৯১৯ সালে বাজারে আনেন বিশ্বের প্রথম শতভাগ বিশুদ্ধ ভেজিটারিয়ান (নিরামিষ) সাবান ‘চাবি’। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতে ‘স্বদেশী আন্দোলন’ তখন তুঙ্গে। একদিকে ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের স্পৃহা, অন্যদিকে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের জন্যই অশুচি (গরু ও শূকরের চর্বি) উপাদান; দুইয়ে মিলে এই সাবান ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়। এই সাবানের দীর্ঘস্থায়িত্বের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল এর মান। ‘স্বদেশী আন্দোলন’-এর কল্যাণে তখন ভারতীয়রা অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের দেশি পণ্যও সাগ্রহে গ্রহণ করছিল। কিন্তু গোদরেজ জানতেন এই আবেগ টেকসই হবে না। ভারতীয় পণ্য উৎপাদকদের অবশ্যই মানসম্পন্ন পণ্য দিয়েই বিদেশি পণ্য প্রতিস্থাপন করতে হবে। 

স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন এই সাবানের মডেল! বিশ্বকবির ছবি সংবলিত বিজ্ঞাপনটির পর গোদরেজ সাবান ভারতীয়দের নিত্যদিনের ব্যবহার্য হয়ে পড়ে। বিজ্ঞাপণের পাতায় তিনি লেখেন, ‘I know of no foreing soaps better than Godrej's and I well make a point of using Godrej's Soap’

গোদরেজের এই ভাবনার প্রশংসা করেছিলেন স্বয়ং গান্ধীও। স্বদেশী আন্দোলনের সমর্থন দিতে তৎকালীন প্রখ্যাত ভারতীয় রাজনীতিবিদ সি রাজাগোপালচারি এবং ব্রিটিশ সমাজ সংস্কারক ডক্টর এনি বেসান্ত গোদরেজ সাবানের বিজ্ঞাপনে অংশ নেন।

আরদেশির গোদরেজের দূরদৃষ্টি ব্যর্থ হয়নি। স্বদেশী আন্দোলনের প্রভাব মিটে যেতে কয়েক বছর সময় নিলেও গোদরেজ ভারতবর্ষে চিরস্থায়ী হয়েছে। শতবর্ষী গোদরেজ সাবান আজও ভারতীয়দের প্রথম পছন্দ, যা বছরে বিক্রি হয় ৩৮ কোটির বেশি।

ইত্তেফাক/এআই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন