মার্টিনেজের বিশ্বকাপ স্মৃতিচারণ

‘সৌদির বিপক্ষে হেরে আমি অনেক বার মনোবিদের সঙ্গে কথা বলেছি’

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৫:২০

২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর ডিফেন্ডিং বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছিল লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনা। আর আর্জেন্টিনাকে এই বিশ্বকাপ জেতানোর অন্যতম কারিগর আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে পালন করেছেন গুরুদায়িত্ব। কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে আটকে দেওয়ার পর ফাইনালেও টাইব্রেকারে দুটি শট রুখে দিয়ে জেতান তিনি। এরপরে যা হয়েছে তা তো সবারই জানা। হয়েছিলেন আসরের সেরা গোলরক্ষক। তবে তার আসরের শুরুটা এত সহজ ছিল না। প্রথম ম্যাচে সৌদির বিপক্ষে হারের পর যেমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছেন তাই সম্প্রতি ইএসপিএনে একটি সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন মার্টিনেজ।

বিশ্বকাপের আগে ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থেকে কাতারে খেলতে যায় আর্জেন্টিনা। আত্মবিশ্বাস ভরপুর ছিল তাদের মধ্যে। এর ওপর প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের মতো একটি কম শক্তিশালী দলের বিপক্ষে মাঠে নামা। সব কিছু মিলিয়ে নিশ্চিত জয়ের ম্যাচ ছিল মেসিদের জন্য। সেই ধারাবাহিকতায় ম্যাচের ১০ মিনিটেই স্পটকিক থেকে এক গোল দিয়ে এগিয়ে যায় তারা। তবে ম্যাচে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আলবিসেলেস্তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ম্যাচটি হেরে যায় ২-১ গোলের ব্যবধানে। সেই ম্যাচের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মার্টিনেজ। এমনটি জানিয়ে সেই স্মৃতি মনে করে বিশ্বকাপ জয়ী এই গোলরক্ষক বলেন, ‘সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচের পরের ঐ তিন দিনে আমি অনেক বার মনোবিদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি তাকে বলেছি, দেখো, আমার কেবল মনে হচ্ছে মেক্সিকোর সঙ্গে হেরে গেলে বাড়ি ফিরে যেতে হবে, এটা আমাকে ভেতরে ভেতরে মেরে ফেলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাতে আমি ঘুমাতে গেছি, তারপর হঠাৎ উঠেই বলছিলাম, যদি মেক্সিকোর সঙ্গে হেরে যাই তাহলে বাড়ি চলে যেতে হবে। আমি রুমে একা ছিলাম...এক মাস ধরে ঐ রুমটা ঠিক করেছি। আমার বাচ্চাদের, তাদের প্রিয় পুতুল, সবকিছুর ছবি টানিয়ে রেখেছিলাম। প্লে স্টেশন বসিয়েছি, একদম সব কিছু বাড়ির মতো করে করেছি। আমি তখন বারবার নিজেকে বলেছি, ১০ দিনের ভেতর কোনোভাবেই আর্জেন্টিনায় যাওয়া যাবে না। এটা নিশ্চিতভাবেই ধ্বংসাত্মক হবে। আমি যেখানে খেলতাম, সেই স্টুডিওতেও একটি ডামি বিশ্বকাপ ছিল। ট্রফিটা ছিল একটু ওপরে, আমি ওখানেও বাতি লাগিয়েছি। মাঝে মধ্যে রাতে গিয়ে আলো জ্বালতাম, নীল আলো; তারপর ট্রফির দিকে তাকিয়ে হাসতাম।’

তবে সৌদির বিপক্ষে ঐ ম্যাচের পর বদলে যায় গোটা আর্জেন্টিনার রূপ। খেলায় আনে পরিবর্তন। প্রতিটি ম্যাচই নিজেদের শেষ ম্যাচ ভেবে মাঠে নামতেন তারা। আর ফলাফল তো সকলেরই জানা। মেসিদের বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরার আগ পর্যন্ত যা করা দরকার তা সবই করেছেন এই আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক। কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে ডাচদের হারানোর পর ফাইনালেও দারুণ একটি ম্যাচ উপহার দেয় আর্জেন্টিনা। ফাইনালে ২০১৮ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে ৩৬ বছরের বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের খরা কাটায় আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ নিয়ে এই আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক বলেন, ‘ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচটি আমরা ভালোভাবে শুরু করেছিলাম। তবে প্রতিপক্ষ গোটা সময় আক্রমণ না করলেও শেষ দিকে তারা আমাদের বিপক্ষে তিনটি আক্রমণ করেছে এবং তিনটি গোল হজম করেছি। প্রথম গোলের পর এমবাপ্পের বিপক্ষে আমি সত্যিই খারাপ অবস্থানে ছিলাম, এক মুহূর্তে আমি অনুভব করেছিলাম যে, হয়তো ফাইনাল আমরা হারতে চলেছি। তবে আমি মনে করি যে, আমি বিশ্বকাপ ফাইনালে বেশ ভালো খেলেছিলাম। ’

বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনা দলের তার সতীর্থদের মন্তব্য কি ছিল এমন প্রশ্নের উত্তরে মার্টিনেজ বলেন, ‘আমি কুটি (ক্রিস্টিয়ান রোমেরো) এবং ওটা (নিকোলাস ওটামেন্ডি)-এর সম্পর্কে জানি। বল পাস বা খেলোয়াড় পাস নয়, বরং ওরা আমাকে জীবন দেয়। ফাইনালে কুটির এমবাপ্পেকে আটকাতে ডিফেন্সলাইন ছেড়ে ওপরে উঠে গিয়েছিল, পরে আমি হাফটাইমে তাকে শার্ট দিয়ে ধরে বলেছিলাম, আবার তুমি এই রকম করলে আমি তোমাকে খেলা শেষ হলে মারবো।’

২০২১ সালে ব্রাজিলকে কোপা আমেরিকার ফাইনালে ১-০ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় শুরু হয়। সেই আসরেও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে ছিলেন মার্টিনেজ। হয়েছিলেন আসর সেরা গোলরক্ষকও। তবে তার ইচ্ছা আরেকটি কোপা আমেরিকা জয়ের স্বাদ নেওয়া। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি আরেকটি কোপা আমেরিকা জিততে চাই। এরপর বলব, এই দলটা ইতিহাসের সেরা। যেটা আমি সবচেয়ে বেশি, এই মুহূর্তে, প্রতিদিন, এমনকি মৃত্যুর সময়ও উপভোগ করবো—আমাদের জার্সিতে এখন একটা বাড়তি তারকা আছে। ব্যাপারটা এমন না যে, শুধু আমিই বিশ্বকাপ জিতেছি, একই সঙ্গে এই বিশ্বকাপটা আমাদের পরের প্রজন্মের জন্যও। তারা বলবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তিনটা তারকা আছে। আমরা পরের প্রজন্মের জন্য একটা নতুন স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দিয়েছি—তাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ জিততে হবে। দিনশেষে আর্জেন্টিনায় ফুটবল একটা আবেগের ব্যাপার।’ যদিও আর্জেন্টিনা এখন যেই ছন্দে রয়েছে আগামী বছর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কোপাতেও তারা ফেভারিট হিসেবেই আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখবে।

ইত্তেফাক/জেডএইচ