শফিকের বড় ইচ্ছে যুদ্ধে যাওয়ার। যুদ্ধ কী তা সে জানে না। তবে দেখেছে, গ্রামের অনেকেই যুদ্ধে গেছে। তারা নাকি খানসেনা মারবে। দেশটা স্বাধীন করবে। মনসুর চাচাকে জিজ্ঞেস করে, স্বাধীন হলে কী হয়? চাচা জ্ঞানী মানুষ। সবাই তাকে মান্য করে।
চাচা বলেন,
—স্বাধীন হলে নতুন দেশ, পতাকা, মানচিত্র পাবি।
—যে মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছি এটাই তো দেশ, আছেই তো। পতাকা আছে, স্কুলে ওড়ে। মানচিত্র আছে ভূগোল বইয়ে।
—আরে ওটা পাকিস্তানের মানচিত্র, পাকিস্তানের পতাকা।
—আমরা তো এদেশের নাগরিক। এটা আমাদের দেশ।
—এ দেশ আমাদের, কিন্তু পাকিস্তানিরা মানে না। তাই আমরা আলাদা দেশ চাই। নিজের দেশ হলে আরো ভালো খাবি, আরো ভালো পরবি, অভাব থাকবে না। সবকিছু পাকিস্তানিরা নিয়ে নেবে না। তাই তো মহান নেতার ডাকে এ লড়াই।
নেতার কথা জানে শফিক, নামও জানে। ছবি দেখেছে। খুব লম্বা, দারুণ একখানা মুখ! জীবনের বেশিরভাগ সময় জেলে কাটিয়েছেন। এখন পাকিস্তানের জেলখানায় বন্দি।
শফিক বাড়ি ফিরে মাকে বলল,
—আমি যুদ্ধে যাবো মা।
মা কেঁপে উঠলেন! অনেক সাধনার এ সন্তান। পাঁচটা মারা যাবার পর এটাই একমাত্র অবলম্বন।
—বলিস কী বাপ! যুদ্ধে যায় বড়রা।
—আমি বেশ বড়, আমার এখন বারো।
—বারো কি যুদ্ধে যাওয়ার বয়স? এ বয়সে কেউ যুদ্ধে যায় না। তাছাড়া তুই গেলে আমার কী হবে!
—তোমার আবার কী হবে। যাদের ছেলেরা যুদ্ধে গেছে তাদের মায়ের যা হয় তোমারও তাই হবে।
ছেলে ভাত খায় না, ঘুমায় না। দিনরাত মনসুর চাচার কাছে পড়ে থাকে। শফিকের বাড়িতে রেডিও নেই। অনেক লোক আসে চাচার বাড়িতে ‘চরমপত্র’ শুনতে। মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ের খবর শুনলে শফিক হাততালি দিয়ে ওঠে। চাচা বলেন, আস্তে বাবা, আস্তে। মনসুর চাচাও বলেছেন, ‘তোর যুদ্ধে যাবার বয়স হয়নি। যুদ্ধের তুই কী জানিস?’
—যারা গেছে তারাও কিছু জানে না। যুদ্ধ শিখে কেউ যায়নি। বড়রা যা পারে ছোটরাও তাই পারে।
শফিক বাড়ি এসে মাকে মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প বলে। মা কান পেতে শোনেন। একসময় কেমন যেন তারও যুদ্ধে যেতে ইচ্ছে করে!
শফিকের বাড়ি থেকে সীমান্ত বেশি দূরে না। কিন্তু পথঘাট চেনে না। একজন সাথী পেলেই যেতে পারত। কাউকে পায় না। সারাদিন রাস্তার পাশে বসে থাকে।
একদিন দুপুর। মাথার উপর তপ্ত রোদ। শফিক ঘামছে। ক্ষুধাও পেয়েছে প্রচণ্ড। ও সবে বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছে। চার-পাঁচজন লোককে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসতে দেখে। ওদের দেখে শফিকের গা শিরশির করে ওঠে। রোমকূপে শিহরণ জাগে! ওর কেন জানি মনে হয় এরা মুক্তিযোদ্ধা!
ও সামনে এগোয়। ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বড় বড় চোখ মেলে বলে,
—আপনারা মুক্তিযোদ্ধা, তাই না? যুদ্ধ করছেন দেশ স্বাধীন করার জন্য। আপনাদের সালাম জানাই।
ওরা পরস্পরের দিকে তাকায়। চোখে মুখে বিস্ময়!
দলের সামনের লোকটি বলেন,
—তুমি কী করে জানলে আমরা মুক্তিযোদ্ধা?
—আমার মন বলছে।
ওরা হাসল।
—মুক্তিযুদ্ধ কী, জানো তুমি?
—জানি। যুদ্ধ করে দেশ স্বধীন করলে আমাদের ভালো হবে।
—ঠিক বলেছ খোকা। যাই, তাড়া আছে। ওরা হাঁটতে শুরু করে।
—আমাকে সাথে নিয়ে যান। দিনের পর দিন এখানে বসে থাকি কবে আপনাদের পাব, আপনাদের সাথে যাব তাই।
—তুমি ছোট, যুদ্ধে গিয়ে কী করবে?
—যুদ্ধ করব।
—না খোকা, যুদ্ধে অনেক বিপদ!
শফিকের মা কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, জানে না ওরা। আচমকা বলেন,
—আপনারা কেমন মানুষ? একজন যুদ্ধে যেতে চাচ্ছে, নিচ্ছেন না। নিয়ে যান আমার ছেলেটাকে।
চারজোড়া পা থমকে দাঁড়ায়। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে ওই মায়ের দিকে। বলে,
—ক্ষমা করবেন মা। এত ছোট ছেলে নিতে পারব না।
ওরা হাঁটে, পেছনে হাঁটে শফিক। একসময় ওরা একটা নদীতীরে আসে। নৌকা প্রস্তুতই ছিল। শফিক নৌকায় উঠতে যায়। ওরা বাধা দিয়ে নৌকা ছেড়ে দেয়। নৌকা এগিয়ে চলে, শফিক সাঁতরে চলে। মাঝ নদী বরাবর এসে দলনেতা বলেন,
—মাঝি ভাই, ধীরে চালাও। ওকে তুলে নাও। ওকে আমাদের দরকার। ওর দেশপ্রেম আমার চেয়ে বেশি।
শফিক এখন নৌকায়। মুখে হাসি। গলা ফাটিয়ে বলে, জয় বাংলা।
‘এই আস্তে আস্তে’ বলতে বলতে সবাই সমস্বরে বলে, ‘জয় বাংলা’।

