বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মুক্তিযুদ্ধের অজানা তথ্য জানাবে ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৯:০০

প্রতিটি মানুষের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানা উচিত। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা সমূহ জানা উচিত। পৃথিবীতে স্বাধীন অনেক জাতির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আছে, তার মধ্যে বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অন্যতম গৌরবমণ্ডিত। দেশের সকল শ্রেণির নাগরিকের দেশের মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাস সম্পর্কে জানার জন্য মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর গুলো দেখা উচিত: 

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর (Liberation War Museum) ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বস্তুর এক দুর্লভ সংগ্রহশালা। ১৯৯৬ সালের ২২ শে মার্চ বেসরকারি উদ্যোগে ঢাকার সেগুনবাগিচার একটি ভাড়া বাসায় প্রথম মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর উদ্বোধন করা হয়।  ২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আগারগাঁওয়ে নির্মিত নতুন ভবনে স্থানান্তর করা হয়।

প্রায় আড়াই বিঘা জমির উপর আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবনের গ্যালারিগুলো মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও ইতিহাসে রূপে সাজানো হয়েছে। প্রায় ২১ হাজার বর্গফুট আয়তনের চারটি গ্যালারীতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী নানা স্মারকের মধ্যে রয়েছে  মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী, আলোকচিত্র, অস্ত্র, দলিল, চিঠিপত্র। 

‘আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম’ নামের গ্যালারিতে সংগৃহীত আছে প্রাচীন বঙ্গের মানচিত্র, পোড়ামাটির শিল্প, টেরাকোটা, নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন, ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপট এবং সত্তরের সাধারণ নির্বাচনের নানা স্মারক। গ্যালারীতে আছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের বিশাল আলোকচিত্র, ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার নানা নিদর্শন।

‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’ নামের গ্যালারীতে যুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের জীবনযাত্রা, বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরের প্রিন্ট, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, রাজাকারদের তৎপরতা, মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলাযুদ্ধের আশ্রয়স্থল এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সহায়তাকারী দেশে–বিদেশের বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে।  মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নয় তলা ভবনে আরো আছে কার পার্কিং, আর্কাইভ, ল্যাবরেটরি, প্রদর্শন কক্ষ, অফিস এবং মিলনায়তন।

সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান স্বাধীনতা জাদুঘর
স্বাধীনতা জাদুঘর বাংলাদেশের ঢাকায় অবস্থিত একটি জাদুঘর যা দেশটির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস চিত্রিত করে। জাদুঘরটি ঢাকার ঐতিহাসিক সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত। মুঘল শাসনামল থেকে শুরু করে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বিজয় দিবস পর্যন্ত দীর্ঘ সংগ্রাম-ইতিহাসের সচিত্র বর্ণনা প্রদর্শন করছে জাদুঘরটি। সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ৭ মার্চ তার ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন এবং এখানেই একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীনতা জাদুঘর বাংলাদেশের ৪৫তম স্বাধীনতা দিবস, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মার্চে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। স্বাধীনতা জাদুঘর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এর এখতিয়ারে একটি শাখা জাদুঘর হিসাবে পরিচালিত।

স্বাধীনতা জাদুঘরটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিত একটি বৃহৎ পরিকল্পিত নকশার অংশ। এই নকশায় রয়েছে একটি অ্যাম্ফিথিয়েটার, তিনটি জলাধার, শিখা চিরন্তন, স্বাধীনতা সংগ্রামের চিত্রবিশিষ্ট একটি ম্যুরাল এবং ১৫৫ আসন বিশিষ্ট একটি অডিটোরিয়াম।
জাদুঘরটিতে ১৪৪টি কাচের প্যানেলে ৩০০-এরও বেশি ঐতিহাসিক আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়। টেরাকোটা, ঐতিহাসিক আলোকচিত্র, যুদ্ধের ঘটনা সংবলিত সংবাদপত্রের প্রতিবেদনও প্রদর্শিত হয়। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন বিদেশী পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতিলিপি এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিদেশে প্রচারণা সৃষ্টিতে তৈরিকৃত বিভিন্ন পোস্টারও জাদুঘরটিতে প্রদর্শনীতে রয়েছে। বাংলাদেশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান এবং স্থাপনার চিত্রও রয়েছে এখানে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে যে টেবিলে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্ব জোনের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি আত্মসমর্পণ করে স্বাক্ষর করেন, তার একটি অনুলিপি রয়েছে জাদুঘরটিতে। তবে মূল টেবিলটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রয়েছে। 

শীতকালীন সময়সূচী প্রতি শনিবার থেকে বুধবার সকাল ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা এবং গ্রীষ্মকালীন সময়সূচী প্রতি শনিবার থেকে বুধবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা। শুক্রবার বিকেল আড়াইটা থেকে স্বাধীনতা জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। প্রবেশ মূল্য ২০টাকা।

বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘর
বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের বিজয় সরণিতে অবস্থিত একটি জাদুঘর। জাদুঘরটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়। ১৯৮৭ সালে প্রথম সামরিক জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯৯ সালে জাদুঘরটি স্থায়ীভাবে বিজয় সরণিতে স্থানান্তর করা হয়। ২০০৯ সালে জাদুঘরটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন সেনা প্রধানের নেতৃত্বে সব সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধির সমন্বয়ে ২০১০ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি জাদুঘরটিকে বিশ্বমানে উন্নীতকরণ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের নামে করার সুপারিশ করে। এই লক্ষ্যে ২০১৬ সালে ২৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্পও প্রস্তুত করা হয়। ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘরের উদ্বোধন করেন।

বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘরটি বঙ্গবন্ধু নভো থিয়েটারের পশ্চিম পাশে ১০ একর জমি উপর নির্মিত। জাদুঘরটিতে তিন বাহিনীর জন্য নির্ধারিত গ্যালারিসহ ছয়টি পৃথক অংশ রয়েছে ও প্রতিটি বাহিনীর গ্যালারিতে একটি বঙ্গবন্ধু কর্নার রয়েছে। জাদুঘরের নিচতলায় বাংলাদেশ ইতিহাস গ্যালারি, ২য় তলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গ্যালারি, ৩য় তলায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গ্যালারি, ৪র্থ তলায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা গ্যালারি এবং বেসমেন্টে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গ্যালারি রয়েছে।

ইত্তেফাক/এআই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন