কুয়াশা লেপ্টে আছে ঝিরিঝিরি নারকেলের পাতায়। বুলবুলি পাখির ঝুঁটি দেখে মনু। জানালার ওপারে নিম গাছের ডালে।
আজ কিসের এত আনন্দ। তেরো বছরের মনু মিয়া ভেবে কুল পায় না। পরীবাগ কলোনির গোল চত্বরে গান বাজে—‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে... আমরা তোমাদের ভুলব না।’ প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে। সারি সারি সবুজ রঙের চেয়ার পাতা।
ছুটির দিন। তানজিমের মা বদরুন নাহার পাকের ঘরের খবরদারি করছেন। ভালোমন্দ রান্নাবান্না হবে। মুরগির কোরমা-পোলাও হবে। বিকেলে লুচি, নিরামিষ, সুজির মোহনভোগ। হালুয়ায় আজ বাঘাবাড়ির গাওয়া ঘি পড়বে একটু বেশি।
সাজেদ খান ব্যস্ত। ধবধবে পাঞ্জাবিতে সাহেবকে অন্যরকম সুন্দর লাগছে। তানজিম, রুসামা সবুজ লালে সেজেছে।
বিকেলের নাস্তার দায় কিছুটা মনু মিয়ার ওপর। ও ভালো খাস্তা পরোটা, লুচি বানাতে পারে। ছোটকু কারিগর ওর ওস্তাদ। একরত্তি ছোকরার এই এক কেরামতি। আজ রাতে আবার সাহেবের বন্ধুরা আসবেন। কানাডা, আমেরিকার বন্ধুরা।
রান্নাঘরে কাটাকুটিতে মহাব্যস্ত শুকতারা খালা। মনু খালার কোল ঘেঁষে বসে, ‘খালা গো, কিয়ের এমুন বাদ্য বাজনা? কী এমুন আমোদ গো?’ খালা তার মুখভর্তি পানের দলা সামলে মনুর দিকে খানিক চোখ রাখে। ‘আইজকা বিজয়ের দিনডা মনু মিয়া।’ ভ্যাদা মাছের মতো তাকিয়ে থাকে মনু। ‘কী কইলা, বিজয়ের দিন? হেইডা কেমুন কী বিষয় গো তারা খালা?’
‘তুই তো বলদা একখান। আমগো এ মাটির মালিকানার তরে নয় মাস যুদ্ধ লাগছিল। হয়তান মিলিটারিরা আমগো ভিটামাটি কাইড়া নিতো চাইছিল। আহারে পক্ষীর মতো বাঙ্গালি মারছে। আগুনে বস্তি, হাসপাতাল জ্বালাইয়া দিছে। গুলি ছুটছে। ঠাস ঠাস বোমা ফাটছে।
জ্বালাইছে ঘরবাড়ি। ৩০ লাখ মুক্তি, শহিদের তাজা রক্ত রে!
আমগো মা-বোনগো বহুতই কষ্ট দিছে হেরা। সব শ্যাষে নয়ডা মাসের যুদ্ধের দিন ফুরাইছে। আমগো দেশের মাটি আমগো হইছে। আমারে রিনি আপা কইছেন। মুক্তিযোদ্ধার সোন্তান হেতে।’
মনু হা করে শোনে। বুকের মধ্যে বাজনা বাজে। বেদম বাদ্য।
সাহেব, বেগম সাহেব, তানজিম ভাইয়া, রুসামা আপু সেজেগুজে বেরিয়ে পড়েছেন প্রায়। আচমকা তানজিম ভাই বলে উঠলেন, ‘মা, মনু, তারা খালা যাবে না?’ চোখের কোনা সরু করে তাকালেন মা। সবুজ শাড়ির লাল টকটকে পাড় ঠিক করতে করতে বললেন, ‘কী বলছ তানজিম? বোকা বোকা কথা। তোমার বাবা সভার চিফ গেস্ট। সময় নষ্ট করছ।’ মা আরো বললেন, ‘বিকেলে লুচি নিরামিষ করবে ওরা। কত কাজ। ঘরদোর গোছগাছ করতে হবে না। সব তো এলোমেলো করে রেখেছ। ওরা কিইবা বুঝবে এই দিবসের ব্যাপারে।’ রুসামা সবুজ লালে সেজেছে। ‘না মা, তা হবে না। ওরাও যাবে। আজ বিজয়ের আনন্দ।’ মায়ের খবরদারি, যুক্তি ধোপে টিকল না। রণে ভঙ্গ দিলেন বদরুন নাহার। সাজেদ খানও খানিকটা উদাসীন হয়ে উঠলেন, ‘চল চল চল সবাই, আমরা সবাই আজ আনন্দ করব। বছরের সেরা দিন। বিখ্যাত কবি লিখে গেছেন, “স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়”! কবে তাঁর জন্ম জানিস! ১৮২৭ সালে হুগলিতে। বড় হয়ে আরো অনেক জানবি বৈকি। আমরা পরাধীন ছিলাম। সে লম্বা ইতিহাস। ২০০ বছর ইংরেজরা গোটা ভারতে জাঁকিয়ে বসেছিল। দেশ দুই ভাগ হলো। বাংলার মাটিতে বজ্জাত পাকিস্তানিরা হাত-পা ছড়িয়ে বসার পাঁয়তারা করে চলল। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আমরা মায়ের ভূমিতে সিনা টান টান করে চলার অধিকার আদায় করতে পেরেছি।’ আজ সাহেবরে খুব দয়ালু মনে হয় মনু মিয়ার। কী আনন্দ! কী সুন্দর দিন। হালকা শীতের রোদ। এমন মজা। বায়োস্কোপ! মনুর চোখ খুশিতে চিকচিক করে। গানের পর গান। কত মানুষজন। শুকতারা খালা তাজ্জব। হাজার পাওয়ারের বাতি জ্বলছে। মঞ্চে সিরাজউদ্দৌলা নাটক হবে। ‘তানজিম ভাইয়া কেমুন রাজার ব্যাশ পরছে।’ ফিসফিস করে বলে মনু। মাইকে বেজে ওঠে, ‘বাংলা বিহার উড়িষ্যার হে মহান অধিপতি’।... ‘ভাইয়ার গলা। বাগের বাইচ্চা।’ চোখে ধাঁধা লাগে। ছোট্ট বুকটা ধুকধুক করে আনন্দে।
‘আল্লারে ভাইয়া আমগো’! মনুর ঘোর কাটে না। চারদিকে হাজার জোনাক জ্বলে। তারা খালার খসখসে হাতটি চেপে ধরে মনু, ‘খালা গো, আইজ আমগো ঈদের খুশি।’
সন্ধ্যা নেমেছে। চারপাশে তখন হাজার জোনাকের আলো।

