ইত্তেফাকের জন্মদিনে আমাদের প্রত্যাশা, পত্রিকাটি যেভাবে যাত্রা শুরু করেছিল, তাই থাক আজীবন। একটি পত্রিকা, অন্তত আমাদের দেশে বাস্তবতার কারণে সীমিত আয়ু পায়। তবে ইত্তেফাক তো বলা চলে, এযাবত্ দীর্ঘজীবী হয়েছে। সেই ১৯৫৩-তে দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরু; আজও তো পত্রিকাটি টিকে আছে, আশা থাকছে, পত্রিকাটির আয়ুতে আরো সংযোজন হবে। ১৯৫১-তে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া পত্রিকাটির প্রথম সম্পাদক মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কাছ থেকে সম্পাদকের দায়িত্ব বুঝে নেন। ভাসানীর সম্পাদনায় পত্রিকাটি ছিল সাপ্তাহিক; কিন্তু মানিক মিয়া ১৯৫৩-তে পত্রিকাটি দৈনিকে রূপান্তরিত করেন, এবং সেভাবে পত্রিকাটির অস্তিত্ব আজও চলমান। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গায় অনেক জল গড়িয়েছে, যে পাকিস্তানে মানিক মিয়ার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু ও শেষ, সেই পাকিস্তান আর নেই, ১৯৭১-এ পূর্ব পাকিস্তান মুছে গিয়ে হয়েছে বাংলাদেশ। পাকিস্তান আমলে মানিক মিয়ার নেতৃত্বে ইত্তেফাক ছিল প্রগতিশীল রাজনীতি ও গণমানুষের মুখপত্র; বাংলাদেশ আমলেও পত্রিকাটির কাছে আমাদের প্রত্যাশা অভিন্ন।
সম্পাদক একটি পত্রিকার চরিত্র ও প্রকৃতি নির্ধারণ করেন। মানিক মিয়ার আমলে ইত্তেফাক যা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ মানিক মিয়ার কারণে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে :তিনি কেমন সাংবাদিক বা সম্পাদক ছিলেন? মানুষটির মনের ভেতর একটু অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দেওয়া যাক। কথা তো অনেক, তবে দুটো উদ্ধৃতিই যথেষ্ট।
‘ইতিহাসের নিয়ন্তা...সাধারণ মানুষ। তাই সাধারণ মানুষকে পাশ কাটিয়ে যে রাজনীতি, তাকে আমি রাজনীতি বলে গণ্য করি না।.... রাজনীতি দূষণীয় নয়, বরং একটি পবিত্র ব্রত।...রাজনীতিকে যারা আত্মোন্নতি বা ভাগ্যোন্নয়নের অবলম্বন বলে ভাবেন, তাদের উচিত ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়া; কন্ট্রাকটরী করা, লাইসেন্স-পারমিটের জন্য উমেদারি করা; রাজনীতি করা নয়।
অথবা ‘জনকল্যাণের রাজনীতি আর ক্ষমতার রাজনীতি এক নয়। রাজনীতি সুনিশ্চিতভাবেই ক্ষমতা লাভের উপায়, কিন্তু উদ্দেশ্য নয়, যারা রাজনীতিকে উদ্দেশ্য করে তোলে তারা ক্ষমতার রাজনীতি করে, গণকল্যাণের রাজনীতি করে না।’ (দ্রষ্টব্য :সংবাদপত্রের স্বাধীনতা (১৯৮৮), পৃ. ৪১-৪২)। মানিক মিয়া নিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন। তার একটি প্রবন্ধসংকলনেরও শিরোনাম ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা’। তার বক্তব্য ছিল, ‘শৃঙ্খলিত সংবাদপত্র শৃঙ্খলিত জনসমাজেরই প্রতীক। শৃঙ্খলিত জনসমাজের আত্মবিকাশ যেমন অসম্ভব, তেমনিভাবে স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি-মানসেরও স্ফূরণও অকল্পনীয়। এক কথায়, স্বাধীন সংবাদপত্রের অস্তিত্ব ছাড়া একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতির অস্তিত্ব কল্পনা করা কষ্টকর।’ (দ্রষ্টব্য পৃ. ১১)
তবে মানিক মিয়া একটি সংবাদপত্রের ত্রুটি সম্পর্কেও অবহিত ছিলেন। যেমন তার বক্তব্য, ‘...সমাজের অন্যান্য অংশের ন্যায় সংবাদপত্রও নির্দোষ কিংবা ত্রুটিমুক্ত নয়। ত্রুটি একেবারেই থাকবে না, এটা কোনকালেই সম্ভব হতে পারে না। একথা অবশ্যই স্বীকার্য যে, সংবাদপত্রের মহান ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদপত্রের পক্ষে আত্মসংযম একান্ত বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সেই আত্মসংযম থাকতে হবে স্বতঃপ্রবৃত্ততার উপর।’
মানিক মিয়া প্রচুর পঠন ও অনুধ্যান উত্সারিত মেধা ও মননের অধিকারী একজন প্রজ্ঞা-সজ্ঞার মানুষ ছিলেন। সুতরাং তিনি তার পত্রিকা ইত্তেফাককে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করেছিলেন। ইত্তেফাক তার সৃষ্টি। আজকের ইত্তেফাক তাই এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। মানিক মিয়া কোনো দল বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংকীর্ণ পত্রিকায় পরিণত করেননি তার ইত্তেফাক কে; ইত্তেফাক ছিল আমজনতার পত্রিকা। আর বাঙালির শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে পত্রিকাটি ছিল যেন সাপের উদ্যত ফণার মতো।
বাংলাদেশ হওয়াতে পাকিস্তানি অপশানের অবসান হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের ওপর মানুষের শোষণ-নির্যাতন তো কমেনি। এদেশের শাসন নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন ওঠে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন :বাংলাদেশ কি মুক্তিযুদ্ধের পথে হাঁটছে? উত্তর তো মিশ্র হতে বাধ্য; তবে মোদ্দা কথাটি হলো, হতাশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশ এগিয়েছে অনেক, তা যেন অনেকটা বিপরীত স্রোতে সাঁতার দেওয়ার মতো। বাংলাদেশকে এখনো যেতে হবে বহুদূর।
ইত্তেফাকের জন্মদিনে প্রত্যাশা থাকছে, বহুদূর সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে আমরা যেন পত্রিকাটিকে সারথি হিসেবে পাই। জয়তু ইত্তেফাক।
লেখক: চেয়ার অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চেয়ারবাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)

