প্রাণময় এই পৃথিবী—যা মহাজগত্ স্রষ্টার অমোঘ সৃষ্টি, যা মহাকালের বিস্ময়। যার কালস্রোতের হাজার কোটি বছরের অন্তহীন প্রবহমানতা। তার এই চলমানতার শেষ কোথায়—কেউ জানে না। এই কালস্রোতেই আসা-যাওয়া চলছে সব প্রাণিকুলের জীবনের নিরন্তর প্রবাহবলয়। এই প্রাণিকুলের অস্তিত্ব দুটি নিয়মের মধ্যে বাঁধা পড়ে আছে; যেমন—(জন্ম-মৃত্যু)—তার আসা-যাওয়া। পৃথিবীতে আগমন ও অবস্থানকাল; অতঃপর জীবনের শেষ প্রয়াণ।
সুন্দর জগত্স্রষ্টার সুন্দর পৃথিবী। কল্যাণময় এই সুন্দর পৃথিবীটা প্রাণিকুল পেয়েছিল। কিন্তু কিছু অপরিণামদর্শী মনুষ্য নামের প্রাণী নানা অপকর্মে তাকে শেষ করে দিল। এ কারণেই দৃষ্টিনন্দন অনাবিল সুন্দর শোভাময় পৃথিবীটা কদর্যরূপের নানা আবহের অন্তরালে পড়ে আছে আজ। হায়, কী বিপদই না প্রাণিকুলের জীবনের সঙ্গী হয়ে গেল!
প্রাণীদের মধ্যে যৌবনকালীন অবস্থানের মনুষ্য নামের এই প্রাণীটির অনেক অনাসৃষ্টি কাণ্ড সতত ঘটমান, যা পৃথিবীর জন্য মহাবিপদ বয়ে আনে। এরা যেখানে, যে-অবস্থানে থাকে, সেখানেই ওদের বড়ত্বের অহংকার গোচরীভূত হয়। এই প্রাণীটির মধ্যে সহানুভূতি ও সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত বড়-একটা দেখা যায় না বললেই চলে। প্রাণীটি যেন নিজেকে ছাড়া কিছুই বুঝতে চায় না। সর্বদা একটা আত্ম-অহংবোধ তাকে আবিষ্ট রাখে। এই বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পৃথিবীতে তার কালের অবস্থানে সে তার শক্তিমত্তায় সবকিছু নিজের কব্জার মধ্যে আনতে চায়। পারিবারিক বা সামাজিক জীবনেও তার স্বার্থচিন্তার কদর্য রূপ সর্বত্র পরিদৃশ্যমান। সে হয়তো কোনো বড় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক, সে তখন অন্য দেশের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়াবে। চলবে তার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। আধিপত্যের দ্বন্দ্ব। হত্যাযজ্ঞ চালাতে সে একটুও কসুর করবে না। তার অস্ত্রভান্ডার বিশাল। তার পারমাণবিক মারণাস্ত্রের ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষমতার দম্ভ আকাশছোঁয়া। সে ধরাকে সরা জ্ঞান করে। তার আত্ম-অহংকার পৃথিবীর জন্য কষ্টের ধূম্রজাল সৃষ্টি করে। তার এই বিপজ্জনক কর্মে সাধারণ্যে সৃষ্টি হয় আতঙ্ক ও অস্বস্তি। তার আধিপত্যের শক্তিপ্রদর্শনের উল্লম্ফন ও যুদ্ধবিগ্রহে পৃথিবীর কত সাধারণ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়। মূল্যহীন জীবনের উলুখাগড়ার মতো নিঃস্ব হয়ে পড়ে। নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশের শরণার্থী হয়। দুঃসহ মানবেতর জীবন হওয়া যেন ওদের কপালের লিখন হয়ে যায়। পৃথিবী নিপতিত হয় বেহাল দশায়।
পৃথিবীর কোনো দেশেরই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী স্বস্তিতে নেই। শোষণ-বঞ্চনার শিকারে পরিণত। অমানবিক বৈষম্যে নিষ্পেষিত। সুযোগবঞ্চিত নিপীড়িত মানুষ ওরা পৃথিবীর। বস্তুবাদের ভোগবাদী রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনরা কখনো জনগণের বন্ধু হয় না, হয় ধনীদের। এজন্যই জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলোতে জনস্বার্থ ও জনকল্যাণের কিছুই থাকে না। থাকে অকল্যাণকর অনেক কিছু। থাকে নিপীড়ন আর অস্বস্তিদায়ক ভোগান্তি। একশ্রেণি আরেক শ্রেণিকে শোষণ করে অবলীলায়। শোষণ-বঞ্চনার ক্ষেত্র তৈরি হয়। নিষ্পেষণে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে অগণিত মানুষ। একজন মর্যাদাহীন একজন মর্যাদাবান—এরকম সমতাহীন উন্নয়ন সমাজজীবনের কাঠামোরূপে গড়ে ওঠে, যা সভ্যতাকে ধারণ করে না। নিঃস্ব-হাতপাতা মানুষের অসহায়ত্ব কি সভ্যতাকে ধারণ করে? কখনোই না, যা মনুষ্যত্বহীন।
পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া সব প্রাণীর তো সর্বজনীন অধিকার থাকবার কথা স্বস্তিদায়ক জীবনযাপনের এবং মৌলিক অধিকার-সংবলিত জীবনকাল অতিবাহিত করার। কিন্তু তা কি আছে? অধিকারবঞ্চিত হয়ে কারো বেঁচে থাকা তো সভ্য সমাজের নিয়ম হতে পারে না। প্রাচুর্যে ভরা এই পৃথিবীতে ক্ষুধা নিবারণই তো তাদের জন্য দারুণ কষ্টকর হয়ে পড়ে। এটা কি সভ্যতাকে ধারণ করে? দেশে দেশে কত-না বিপদ-আপদে মানুষ নিঃস্ব হয়ে যায়। হাতপাতা অবহেলিত অবস্থায় তারা রাস্তায় পড়ে থাকে, অধিকারবঞ্চিত হয়ে পড়ে। আত্মম্ভরি-পাপাচারী-অন্যায়কারী অপকর্মের মনুষ্যত্বহীন মানুষরাই এজন্য দায়ী। তাদের অমানবিক এই অত্যাচার তো শুধু সমগোত্রীয়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাদের অত্যাচার ও অপকর্মেই তো গোটা পৃথিবীটা নষ্ট হয়ে যায়। এরকম পৃথিবী তো দুঃখময় ও অসভ্যতার পাপে জর্জরিত। এতে প্রকৃতি তার স্বাভাবিকতা হারায়। কিন্তু এখানে অনিবার্য সত্যটা হলো, তিল পরিমাণ অন্যায়ও প্রকৃতি সহ্য করে না। এর প্রতিদানে সব মানুষই একদিন একইরকম দুঃখ ভোগের শিকার হয়। এর ব্যত্যয় হয় না। আবহাওয়া উষ্ণপ্রবণ হয় এবং সেই সঙ্গে তার পরিবর্তন ঘটে। এ পরিবর্তন পৃথিবীবাসীর জন্য মহাসংকট হয়ে দেখা দেয়। অসুন্দর মনই সবকিছু অসুন্দর করে দেয়। পৃথিবীর অস্থায়ী বাসিন্দা আমরা—পৃথিবী ছেড়ে তো একদিন যেতেই হয়। এটাই চিরন্তন নিয়ম। তাই আমাদের বলা উচিত—‘আমরা এখন থেকে মানবিক হব। মনুষ্যত্ববোধের অধিকারী হব। সুন্দর মনের মানুষ হব। সুন্দর স্বাভাবিকতায় ভরিয়ে তুলব পৃথিবী।’ এজন্য সত্ অভিভাবকরূপে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে। এ দায় তো রাষ্ট্রেরই। এ দায় রাষ্ট্র কখনো অস্বীকার করতে পারে না।
আকাশছোঁয়া উন্নয়ন হোক, উন্নয়নের জোয়ার বয়ে চলুক। কিন্তু রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষের কী হবে! তাদেরও তো ন্যূনতম সুযোগ করে দিতে হবে স্বাবলম্বী হওয়ার। এটা করলেই তো মানবিক সমাজ তৈরি হয়, যা হওয়া জরুরি। ধর্মের নির্দেশ—‘সুখ-দুঃখ সমভাগ করে চলাই ধর্ম—যা মনুষ্যত্ব’। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘দুজনার হবে বুলন্দ নসিব,/ লাখে লাখে হবে বদনসিব,/ এ নহে বিধান ইসলামের।’
অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে মানবিক উন্নয়নের কথাটাও মনে রাখা জরুরি। তাহলেই আমরা সুন্দর সুসভ্য দেশ পাব, পৃথিবী পাব। দৃষ্টিনন্দন সুন্দর শোভাময় পৃথিবী আর কখনো নষ্ট হবে না। সুন্দর মনের মানুষই মানবিক উন্নয়নের রাষ্ট্র গড়তে পারে। সদিচ্ছা থাকলে কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন হতে পারে। উদাসীনতা এখানে বড় বাধা। রাষ্ট্রের সামর্থ্য আছে। তার এত এত উন্নয়ন। তার উপচে পড়া প্রাচুর্য। তার আভিজাত্যের পাহাড় দৃশ্যমান। এই প্রাচুর্য ও আভিজাত্যকে অর্থবহ করতে নিঃস্বদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগটা করে দেওয়া একটি বড় কাজ। রাষ্ট্রের সহায়তার কল্যাণের শুভ ছাতাটি যেন সব সময় ছায়াদানে এই নিঃস্বদের মাথার ওপর থাকে। তাহলেই মানবিক মর্যাদার দেশ পাব আমরা। কল্যাণকর এই কাজে রাষ্ট্রও দায়িত্ববান হিসেবে মর্যাদা পাবে।
সুস্থ ও শান্তির স্বাভাবিক পৃথিবীর জন্য যুগে যুগে মহামনীষীদের প্রত্যাদিষ্ট কল্যাণকর বাণী আমরা পেয়ে থাকি। কিন্তু তা কি আমরা হূদয়ে ধারণ করি? পরিশুদ্ধ হই? যার জন্য প্রশ্ন থেকেই যায়—তাহলে কি পৃথিবী আজ স্বাভাবিক, সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ অবস্থায় আছে? একবাক্যে বলা যায়—নাই। পৃথিবী কি কোনোকালে শান্তির সুবাতাসে প্রশমিত ছিল? তা কি চিরকালীন হওয়ার স্বপ্ন হয়ে এসেছিল? মানুষের মন কি সেখানে আনন্দময় ছিল? এখানে বলা যায়—হ্যাঁ, খোলাফায়ে রাশেদিনের ৩৫ বছর মানবতার যুগ ছিল। সব মানুষ স্বাবলম্বী ছিল। হাতপাতা একটি মানুষও ছিল না। এরকম সমাজই তো মানুষের মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখে। আমরা সেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারি। তাছাড়া অজস্র দুঃখময় সময়ের সম্মুখীন হয় পৃথিবী। তার এই বিষাদময় দিনগুলোর ছায়া সাধারণ্যে দারুণ দুঃখবোধ সৃষ্টি করে।
আধিপত্যবাদ-আত্মঅহংকার অপসংস্কৃতি তৈরি করে। অবৈধ মুনাফাকারী-দুর্নীতিগ্রস্তরাই সম্পদশালী অপকৌশলী হয়ে থাকে। সুন্দর পৃথিবী ও তার প্রাণিকুল রক্ষার জন্য সুন্দর মন এবং সত্ অভিভাবকত্ব দরকার। অবৈধ ও বৈষম্যপূর্ণ মুনাফা, সঞ্চয় ও অর্জন সত্য-সুন্দর সমাজকে ধারণ করে না। এটা অধর্মের চূড়ান্ত রূপ। সহায়হীনদের কল্যাণের জন্য ধর্মের কঠোর নির্দেশ আমরা জানি। এজন্য জাকাত-ফেতরার বিধান করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক, এই অর্থ সহায়হীন মানুষের স্বাবলম্বী হওয়ার কাজে আসে না। এই অর্থ অন্যের পেটে যায়।
ভাবনার কথা, প্রাচুর্যময় জীবনের অধিকারী যারা, তাদের আত্মমর্যাদাবোধ প্রবল। তারা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ভালো হওয়া, এ বোধটাও তাদের থাকতে হবে। সামষ্টিক কল্যাণের উন্নয়নই বাঞ্ছনীয়, একক শ্রেণিস্বার্থের উন্নয়ন কখনো নয়। সমতাভিত্তিক উন্নয়নই মূল্যহীন সাধারণ মানুষকে উন্নয়নের সারিতে নিয়ে আসবে। সুস্থ ও সুন্দর জীবনের অধিকার তারা ফিরে পাবে। এ কাজটি খুব যত্নের সঙ্গে করতে হবে। তাহলেই যে-উন্নয়নের মহাসড়কের কথা বলা হয়, তা আর সমতাহীন থাকবে না।
গুরুত্বপূর্ণ যে-চিন্তাটি দরকার তা হলো, সহায়হীনদের চিরকালীন-সর্বজনীন কল্যাণের একটি নতুন দপ্তর খোলা, যা তাদের কল্যাণের জন্য পাকাপোক্ত নিয়ম হিসেবে চালু থাকবে। যেখানে তারা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবে। পর্যায়ক্রমে স্বাবলম্বী হতে পারবে। চলমান প্রক্রিয়াধীন নতুন এই দপ্তরটি কল্যাণের স্তম্ভরূপে প্রশংসিতও হবে। কল্যাণরাষ্ট্রের আলোকস্তম্ভরূপে তার প্রকাশমানতা হবে অনন্যোজ্জ্বলতায় দীপ্যমান। কীভাবে, কী করলে কল্যাণের এই স্তম্ভ নির্মিত হবে, এ প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই, এখানে দেশের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এজন্য দেশবাসীর উদ্দেশ্যে সরকার প্রধানের আহ্বান এখানে কাজ করবে, যা হবে জাদুর পরশ। কল্যাণকাজে সম্পৃক্ততার আহ্বান। দেশের মানুষ সাড়া দেবে। উদ্বুদ্ধ হবে তার আহ্বানলব্ধ কাজে। তখন একজন মানুষও অসহায় থাকবে না। ভিক্ষুকশূন্য দেশ হবে বাংলাদেশ। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সা—এই মৌলিক অধিকার থেকে কেউই বঞ্চিত থাকবে না। মানুষে মানুষে বিভেদও ঘুচে যাবে। সত্য-সুন্দরের সে যুগটা পেতেই তো আমার অবিচল আকাঙ্ক্ষার নদীটা বয়ে চলেছে নিরন্তর।
লেখক: সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক
