পাকিস্তানে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি আসন্ন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে প্রচারণা নিয়ে দৌড়ঝাপের মধ্যে রয়েছে দেশটির রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামরিক সংস্থা অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটের অনুমতি দেবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দেশটিতে গণতন্ত্রের মিশ্র ইতিহাস রয়েছে, যেখানে সামরিক বাহিনী বেশ কয়েকটি অভ্যুত্থান ঘটায়। রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ এবং নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
ভোটের আগে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কারাবন্দি। নির্বাচনে ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দিতে ব্যস্ত নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে দেশটির আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ স্বেচ্ছানির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন। তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো তুলে নেওয়া অনেকের মনে প্রশ তুলেছে।
২০১৮ সালে, সাবেক ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের নেতৃত্বে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সরকার গঠন করে।
ইমরান খানকে ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটের পরে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণ করা হয় এবং পরবর্তীতে দুর্নীতির জন্য তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। তার সরকার প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান মুসলিম লীগের (নওয়াজ) প্রধান শেহবাজ শরিফের নেতৃত্বে পিটিআই-এর প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটি জোট গঠন করে।
ইমরান খান, বর্তমানে আদিয়ালা কারাগারে সাজা ভোগ করছেন। মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, তিনি প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল কামার বাজওয়া তার সরকারের বিরুদ্ধে কথিত ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত করার পরে তাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।
ইমরান খান বলেন, তার দলকে সম্প্রতি তার নির্বাচনী প্রতীক হিসাবে ক্রিকেট ব্যাট ব্যবহার করতে বাধা দেওয়া হয়। এছাড়াও তার সদস্যদের প্রতিনিয়ত হয়রানি এবং গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় পিটিআই নেতা শওকত ইউসুফজাই দ্য ন্যাশনালকে বলেছেন, “পিটিআই কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের নির্বাচনী প্রতীক ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটি স্পষ্ট যে, পিটিআই পুরোপুরি ষড়যন্ত্রের শিকার।”
পিটিআইয়ের পাঞ্জাব রাজ্যের তথ্যসচিব শায়ান বশির আল জাজিরাকে বলেছেন, পিটিআই এবং দলটির নেতাদের ওপর যেভাবে নৃশংসতা চালানো হয়েছে, তা পাকিস্তানের ইতিহাসে ঘটেনি।
পিএমএল-এন এর নেতা এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ চার বছরের স্ব-আরোপিত নির্বাসনের পর গত বছর পাকিস্তানে ফিরে এসেছেন। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় জামিন পেয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু একসময় এই মামলা গুলোর কারণেই তিনি দেশ ত্যাগ করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় পিটিআই নেতা শওকত ইউসুফজাই বলেছেন, নওয়াজ শরীফ যেভাবে পাকিস্তানে ফিরে আসলেন এবং তাকে বিভিন্ন মামলা থেকে যেভাবে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে পিএমএল-এন এবং এস্টাবলিশমেন্টের মধ্যে কোনো গোপন চুক্তি রয়েছে।
পিএমএল-এন মহাসচিব আহসান ইকবাল দ্য ন্যাশনালকে বলেন, শুধুমাত্র পিটিআই পিএমএল-এনকে সমর্থন করার যে অভিযোগ তুলেছেন এটি সত্য নয়।
এদিকে সাবেক পিএমএল-এন সরকারের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন মন্ত্রী ইকবাল বলেন, তার দল একটি শক্তিশালী অবস্থানে ছিল এবং পিটিআইকে ২০১৮ সালে ভোটে কারচুপি করার জন্য অভিযুক্ত করেছিল।
ইকবাল আরও বলেন, ২০১৮ সালে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ পাকিস্তানের (নিরাপত্তা) সংস্থার সমর্থনে নির্বাচনে কারচুপি তারা সরকার গঠন করেছিল।
এদিকে পিটিআই নেতা ব্যারিস্টার গোহর সাংবাদিকদের বলেছেন, পিটিআই-এর প্রতীক ক্রিকেট ব্যাট ছিনিয়ে নেওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা রিভিউ পিটিশন দায়ের করবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা শিগগিরই সোশ্যাল মিডিয়াতে পিটিআই প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রতীকও প্রকাশ করতে যাচ্ছি। কিন্তু একটি দলকে তার প্রতীক থেকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণ অন্যায়।
এদিকে দেশটির সংসদের উচ্চকক্ষ সিনেটে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার এক অদ্ভুত চেষ্টা চলেছে। সিনেটের চেয়ারম্যানের সহায়তায় কিছু সদস্য আবহাওয়া ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা বলে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে একটি বিতর্কিত প্রস্তাব তুলে ধরেন। কোনো ধরনের কোরামের তোয়াক্কা না করে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়েছে, যদিও তার কোনো বাধ্যবাধকতা বা আইনি মূল্য নেই।
কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করছেন, দেশটির সামরিক বাহিনী এবার নওয়াজ শরীফের দিকে ঝুঁকেছে। যিনি গত বছরের নভেম্বরে দেশে ফিরেছেন। নওয়াজের প্রার্থিতার বিরুদ্ধে আইনি বাধা দ্রুত সরিয়ে নিয়েছে দেশটির আদালত। শিক্ষাবিদ ফয়েজ বলেছেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান পরিবেশটা ‘প্রহসনমূলক’। দল বদলেছে, নেতা বদলেছে, কিন্তু পদ্ধতি ও উন্মাদনা একই রয়ে গেছে।
কাজেই ফেব্রুয়ারিতে এখন পর্যন্ত একটা নিষ্প্রাণ ও এলোমেলো নির্বাচনই হতে যাচ্ছে বলা যায়। অথচ দেশের সাধারণ মানুষ আশা করছে, রাজনীতিবিদরা দেশটির বহুবিধ সংকটের মধ্যে বিশেষত অর্থনৈতিক ইস্যুটির সমাধান জনসমক্ষে তুলে ধরবেন।
