বড় ধরনের সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে। একে অন্যের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে উভয় দেশই। এমন একসময়ে প্রতিবেশী দুই দেশ সংঘর্ষে জড়াল, যখন মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। শুধু মধ্যপ্রাচ্য কেন, এই অঞ্চলের বাইরেও আছড়ে পড়ছে সংঘাতের দামামা।
পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার (৫৬০ মাইল) সীমানা রয়েছে। এটি এমন এক এলাকা, যা বেশির ভাগ সময়েই অস্থিতিশীল থাকে। একদিকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ, অন্যপাশে ইরানের সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশ—বছরের প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই অস্থির থাকে এই দুই ভূভাগ। বিশেষত সীমান্তের অশান্ত বেলুচ অঞ্চলে উভয় দেশই দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে আসছে।
এবারের ঘটনাকে বেশ জটিলই বলতে হবে। প্রথমে হামলা চালায় ইরান। গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে চালানো ঐ হামলায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসলামাবাদ। এ ঘটনায় পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হামলার বিষয়ে তেহরান অবশ্য ভিন্ন কথা বলে আসছে। তাদের ভাষ্য, জঙ্গি গোষ্ঠী জইশ আল আদলের দুটি ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এই বক্তব্য ইসলামাবাদ মানতে নারাজ। ফলে গন্ডগোল যে আরো বাড়বে, তা জানাই ছিল।
এই ধারাবাহিকতায় ইরানের সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশে পালটা হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। মজার বিষয় হলো, হামলার বিষয়ে ইসলামাবাদও তেহরানের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলছে। তাদের ভাষ্য, সন্ত্রাসী ঘাঁটি লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। যাহোক, হামলায় চার শিশুসহ নিহত হয়েছে সাত জন।
লক্ষ করার বিষয়, দুই দেশই হামলা চালানোর বিষয়ে অভিন্ন লক্ষ্যের কথা বলছে। উভয় পক্ষই জঙ্গি-সন্ত্রাস নিধনে আক্রমণ চালাচ্ছে একে অন্যের ভূমিতে। এ যেন এই অঞ্চলের চিরচেনা দৃশ্য!
পাকিস্তান-ইরান সংঘর্ষের কারণ হিসেবে যেহেতু জইশ আল-আদলের নাম আসছে, কাজেই জেনে নেওয়া যাক, এই গোষ্ঠী আসলে কারা। জইশ আল-আদল মূলত সুন্নি মুসলিমদের একটি চরমপন্থি গ্রুপ। এই গ্রুপ জুনদাল্লাহ নামক ইরানভিত্তিক একটি সংগঠনের শাখা হিসেবে বেশ সুপরিচিত। ২০০২ সালে আব্দোলমালেক রিগির হাতে প্রতিষ্ঠা পায় জুনদাল্লাহ। ২০১০ সালে ইরান সরকার রিগির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। এর আগ পর্যন্ত জুনদাল্লাহর নেতৃত্বে ছিলেন রিগি নিজেই।
রিগির মৃত্যুর পর সংগঠনে একধরনের ভাঙন দেখা দেয়। গড়ে ওঠে আরো কয়েকটি গোষ্ঠী। এর মধ্যে একটি হলো জইশ আল-আদল। ২০১২ সালের দিকে অত্যন্ত প্রভাবশালী সংগঠন হিসেবে চারদিকে শোরগোল ফেলে দেয় জইশ আল-আদল।
জইশ আল-আদল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বেলুচকে উন্নত জীবন প্রদানের আশ্বাসের কথা শুনিয়ে আসছে। আরো স্বাধীনতা এবং আরো ভালো জীবনযাপনের বন্দোবস্ত করা হবে—এমন কথা প্রায়ই শোনা যায় এই গোষ্ঠীর নেতাদের মুখে। এই পটভূমিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর সংঘটিত বেশ কয়েকটি হামলার দায় স্বীকার করেছে তারা।
উদ্বেগের কারণ হলো, জুনদাল্লাহর মতাদর্শ অনুসরণ করা জইশ আল-আদল ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের প্রতি অনুগত। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জুনদাল্লাহ ও জইশ আল-আদল—দুই গোষ্ঠীকেই ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে সাব্যস্ত করে তাদের দমনে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলে থাকে সময়ে সময়ে।
জইশ আল-আদল নিয়ে এত কথা বলার কারণ, এই গোষ্ঠী প্রধানত ইরানের দক্ষিণাঞ্চল ও পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে; অর্থাত্, দুই দেশের ভূখণ্ডেই তাদের উপস্থিতি রয়েছে এবং তাদের দমনে দুই দেশই হামলা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে মুশকিল যেটা হচ্ছে, এসব হামলায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মারা পড়ছে বেসামরিক মানুষ। এই অর্থে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, সন্ত্রাস দমনের জন্যই এই হামলা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ‘মিশন’ আছে?
পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরান যেখানে এক জায়গায় মিলিত হয়েছে, সেই অঞ্চলটিতেই বাস বেলুচ জনগোষ্ঠীর। দীর্ঘকাল ধরে স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে আসছে এই অঞ্চলের মানুষ। কারণ, তাদের মাথার ওপর ঝুলছে দুই-দুটি পক্ষের শাসনের খড়্গ। ইসলামাবাদ ও তেহরান—দুই পক্ষের কারো শাসনই তারা মানতে চায় না। বরং দুই পক্ষের ওপরই তারা নাখোশ। এই অবস্থা চলে আসছে দশকের পর দশক ধরে। ফলে এই সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে বিদ্রোহের আগুন নেভে না কখনোই।
বেলুচ অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদে বেশ সমৃদ্ধ, কিন্তু বেলুচ-বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভিযোগ—এই অঞ্চলের লোকেদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয় না; বরং তারা সবচেয়ে দরিদ্র। বছরের পর বছর ধরে তাদের সম্পদ কমে যাচ্ছে, কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘুরছে না! এরকম নানা হিসাবনিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে বিগত এক দশক ধরে এই অঞ্চল পুড়ছে বিদ্রোহের আগুনে।
ফিরে আসা যাক মূল আলোচনায়। পাকিস্তানে হামলার এক দিন আগে ইরাকে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার দপ্তর ও সিরিয়ায় আইএসের ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান; অর্থাত্, পরপর তিনটি দেশে হামলার ঘটনা ঘটায় তেহরান। এই ঘটনাকে ‘নজিরবিহীন’ আখ্যা দিয়ে বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, ‘পালটাপালটি হামলার ঘটনা’ অনিবার্য হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের ভবিষ্যদ্বাণী শেষ পর্যন্ত সত্যে পরিণত হয়েছে। পালটা হামলার রাস্তায় নেমেছে ইসলামাবাদ। এরূপ পটভূমিতে সহজ হিসাব হলো, এই অঞ্চলে যে সংঘাত-সংঘর্ষ শুরু হয়েছে, তা অচিরেই থামবে বলে মনে হয় না!
আমরা লক্ষ করছি, উভয় পক্ষের সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা শুরু হয়েছে। ইরানের হামলার মধ্য দিয়েই মূলত এর শুরু। কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের খেসারত হিসেবে ইরান থেকে রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করেছে পাকিস্তান। এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোতে সব ধরনের উচ্চ পর্যায়ের সফর স্থগিত করা হয়েছে। এরপর পাকিস্তানের হামলার ঘটনার পর ইরান নড়েচড়ে বসে। ‘অবিলম্বে ব্যাখ্যা’ চেয়ে ইসলামাবাদকে শাসিয়েছে তেহরান।
ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘর্ষকে খুব ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। বরং এই ঘটনা নতুন কোনো দিকে মোড় নিলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। ঘটনার তাত্পর্য বিবেচনায় এ নিয়ে কথা বলছে পাশের দেশগুলোও।
ভারত বলেছে, এটি সন্ত্রাসবাদের প্রতি শূন্য সহনশীলতা এবং আক্রমণটি ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যকার একটি বিষয়। চীন উভয় দেশকে সংযমে থাকতে আহ্বান জানিয়েছে। উত্তেজনা যাতে আরো না বাড়ে, সেই বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছে। এ নিয়ে স্পষ্ট স্বরে কথা বলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাট মিলার বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য যাতে পূর্ণ মাত্রায় সংঘাতের ময়দান হয়ে না ওঠে, সেজন্য কাজ করছে ওয়াশিংটন।’ পাকিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ার হামলার ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, ইরান গত কয়েক দিনে তার তিনটি প্রতিবেশীর সার্বভৌম সীমানা লঙ্ঘন করেছে।’ পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের মিত্রদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন কথাও বলা হয়েছে, ‘আমরা আশা করি, এটি একটি সমস্যা এবং যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা যেতে পারে।’
বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে নিঃশেষ করার কথা বলে নিজেদেরকে যেভাবে পরস্পরের স্থায়ী শত্রুতে পরিণত করে চলেছে ইরান ও পাকিস্তান, তার শেষটা কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা অজানা। পরস্পরের মধ্যে বৈরীতা আরো বাড়বে কি-না, সে সম্পর্কেও কেবল এই দুই দেশই ভালো বলতে পারবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, উভয় দেশই মুখে যা বলছে, তার চেয়ে করে দেখাচ্ছে বেশি! একটি করে হামলার ঘটনা ঘটছে এবং সেই হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই অন্য পক্ষের মাটিতে আছড়ে পড়ছে বোমার আঘাত।
পরিস্থিতি যেন আর উত্তপ্ত না হয়—এমনটাই দেখার আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়ে আসছে দুই দেশ। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানকে একটি ‘ভ্রাতৃত্বপূর্ণ দেশ’ বলে অভিহিত করেছে। শুধু তাই নয়, ‘সম্মিলিত সমাধান’ খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছে। একই ধরনের কথা বলেছে তেহরানও। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, পাকিস্তান একটি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ’। তিনি আরো বলেছেন, ‘আমাদের হামলা কেবল জঙ্গিদের নিধন করার জন্যই।’
সত্যিই কি তাই?
লেখকদ্বয় :সাংবাদিক
সিএনএন থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন

