মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ধরলার ভাঙন

ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব সকিতন বেওয়াসহ শতশত পরিবার

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৪, ২২:০৪

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার চরগোরকমন্ডল এলাকায় ধরলার ভাঙনে শতশত ঘর-বাড়িসহ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীনের আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা। বর্ষার আগে কর্তৃপক্ষ টেকসই তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা না করলে বর্ষা মৌসুমে চরগোরকমন্ডল এলাকার শতশত পরিবারের বাড়ি-ঘর, ভিটামাটিসহ শতশত বিঘা ফসলি জমি ও ২ কোটি টাকা ব্যয়ে মুজিব কেল্লার ভবনটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় চরম দুচিন্তায় দিন পার করছেন স্থানীয়রা।

এরমধ্যে ধরলায় শেষ সম্বল ঘর-বাড়ি ও ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীনের আশঙ্কায় চরম দুর্দিন পার করছেন চরগোরকমন্ডল গ্রামের মৃত কয়ছার আলীর স্ত্রী সকিতন বেওয়া (৬২)। ধরলার তীব্র ভাঙনে ধরলা নদীর কাছে এসে পড়েছে। তাই আগ্রাসী ধরলার ভাঙনে ঘর-বাড়ি হারানোর দুচিন্তায় বাকরুদ্ধ হয়ে দিন পার করছেন সকিতন। সকিতন ২২ বছর আগে স্বামীকে হারিয়ে অতিকষ্টে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। ইতিমধ্যে সকিতন বেওয়ার ঘর-বাড়িসহ তিন থেকে চারবার ধরলা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ধরলার ভাঙনে তিনি সব কিছুই হারিয়ে চরম দুর্দিন পার করেছেন। নিজস্ব জমিজমা না থাকায় দুই থেকে তিন বছর আগে ঘর-বাড়ি তোলার জন্য অন্যের মাত্র ৫ শতক জমি বন্ধন নিয়ে একমাত্র ছেলেসহ বসবাস করছেন। একমাত্র ছেলে দিনমজুরির কাজ-কাম করেই কোনো রকমেই ডাল-ভাত খেয়ে না খেয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করলেও সকিতনের দুশ্চিন্তা কাটেনি। ধরলার তীব্র ভাঙনে ঘর-বাড়ি হারানোর দুচিন্তায় দিন পার করছেন তিনি। ধরলা নদী একেবারে সকিতন বেওয়ার বাড়ির কাছেই আসায় চিন্তিত হয়ে পড়েন। এবার ঘর-বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হলে কোথায় জুটবে মাথা গোঁজার ঠাই!

সকিতন বেওয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, বাহে কি বলবো, বলার ভাষা নেই। তোমরা তো স্বচক্ষে দেখলেন ধরলা নদী আমার বাড়ির কাছেই এসেছে। এখন নদীতে স্রোত কম, তাই বাড়ি-ঘর টিকে আছে। কিন্তু যখন স্রোত বাড়বে তখন যেকোনো মুহূর্তে আমার বাড়ি-ভিটেটুকু বিলীন হয়ে যাবে। দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা না করলে আমার বাড়ি-ঘর ভিটেসহ এলাকার শতশত বাড়ি-ঘরসহ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে বাহে।

তিনি অশ্রুকন্ঠে দ্রুত চরগোরকমন্ডল এলাকায় ধরলার ভাঙন ঠেকাতে একটি টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

ঠিক একই আশঙ্কা করছেন তিন বারের নদী ভাঙনের শিকার সারাতুন বেগম (৫৫)। তিনিও ১০ বছর আগে স্বামীকে হারিয়ে একমাত্র প্রতিবন্ধী ছেলেসহ মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে কোনোরকমেই দিন পার করছেন।

সারাতুন বেগম  জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে ধরলার ভাঙন ঠেকাতে না পারলে অনেক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সরকার যেন দ্রুত নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে আমাদেরকে চিরতরে মুক্তি দেয়।

গত বর্ষা মৌসুমে ধরলা নদীর তীব্র ভাঙনে একই এলাকার কৃষক বদিরুজ্জামান মিয়ার বাড়ি-ভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। কিছু দিন পর শেষ স্মৃতি মায়ের কবরটিও আগ্রাসী ধরলার তীব্র ভাঙনে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পড়ে বদিরুজ্জামানের মাথা গোঁজার ঠাই মেলে চরগোরকমন্ডল আবাসনের মাঠে। বর্তমানে তিনি স্ত্রী-সন্তানসহ সেখানেই বসবাস করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন। সেইসঙ্গে বদিরুজ্জামান ধরলার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার জন্য স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

চর গোরকমন্ডল ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আয়াজ উদ্দিন জানান, চর গোরকমন্ডল এলাকার গত বর্ষায় ধরলার তীব্র ভাঙনে ইতিমধ্যে ২০ থেকে ৩০টি পরিবার ও হাফ কিলোমিটার সড়কসহ শতশত ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সে সময় কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর ৬ হাজার জিওব্যাগ দিয়েছেন। কিন্তু ভাঙন ঠেকানো যায়নি।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে হুমকির মুখে ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে মুজিব কেল্লার ভবন, স্কুল, মাদ্রাসাসহ ওই এলাকার ৮০০ পরিবার। বর্ষার আগে ধরলার ভাঙন রোধের জন্য তিনি কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন। 

নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাছেন আলী জানান, কয়েকদিন আগে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য চরগোরকমন্ডলের ভাঙন এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছে। এ সময় তিনি আপাতত ভাঙন রোধের জন্য ১০ হাজার জিওব্যাগ দেওয়ার কথা বলেছেন। ইতিমধ্যে ১ হাজার জিওব্যাগ এসেছে।

তিনি আরও জানান, জিওব্যাগ দিয়ে আপাতত ভাঙন রক্ষা হবে। কিন্তু জিওব্যাগ দিয়ে নদীগর্ভে বিলীন হাফ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক সংস্কার ও পুরোপুরি ভাঙন রোধ যাবে না। তাই তিনি সংসদ সদস্যের মাধ্যমে স্থানীয় তীর রক্ষা বাঁধের দাবি জানিয়েছেন।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. ইসমত ত্বোহা জানান, চর-গোরকমন্ডল এলাকায় ধরলা নদীর তীব্র ভাঙন ঠেকাতে ইতিমধ্যেই ৭ হাজার জিওব্যাগ ফেলানো হয়েছে। আসলে জিওব্যাগ দিয়ে ভাঙন রোধ করা সম্ভব না। ভাঙন রোধে স্থায়ী তীর রক্ষা বাঁধ দেওয়ার জন্য কয়েক দফায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে চরগোরকমন্ডল গ্রামটি চরাঞ্চল এলাকা হওয়ায় কর্তৃপক্ষ সম্মত হয়নি।  

ইত্তেফাক/এবি