সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে মাস্টার জহির উদ্দিন মিয়া স্মৃতি পাঠাগার

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪:২২

মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘সত্যিকার বৈদগ্ধ ও চিৎ প্রকর্ষের অধিকারী হতে হলে লাইব্রেরির সঙ্গে অন্তরঙ্গতা সৃষ্টি করা অবশ্যই প্রয়োজন।’ এই পটভ‚মিতে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মানসে ঝালকাঠী জেলার রাজাপুর উপজেলার গালুয়া বাজারের সন্নিকটে নিজগালুয়া গ্রামে শিক্ষানুরাগী প্রয়াত মাস্টার জহির উদ্দিন মিয়ার শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্মরণে ‘মাস্টার জহির উদ্দিন মিয়া স্মৃতি পাঠাগার’ নামে একটি গণপাঠাগার স্থাপন করা হয়। 

পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন প্রয়াত জহির উদ্দিন মিয়ার সেজো ছেলে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনোয়ার হোসেন। গণপাঠাগারটি গণগ্রস্থাগার অধিদপ্তর, ১০, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, শাহবাগ, ঢাকার নিবন্ধনভুক্ত হয়, যার তালিকাভুক্তিকরণ নম্বর-ঝাল/রাজা/০৬, তারিখ-২৩/১০/২০১৮। এটি সপ্তাহের শনিবার হতে বুধবার ৫ (পাঁচ) দিন সকাল ১০টা হতে দুপুর ২টা এবং বিকাল ৪টা হতে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। গ্রামের সব বয়সের নারী ও পুরুষ পাঠকের কথা বিবেচনা করে পৃথক পৃথক পাঠ কর্নারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে পাঠাগারটিতে।

শিশুদের জন্য রয়েছে শিশু কর্নার। অতীত ইতিহাস থেকে শুরু করে সমসাময়িক সব বিষয়- মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা, সাহিত্য, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, কৃষিনির্ভর, পাঠ্যবই, বিজ্ঞান বিষয়ক, আইটি, আইন ও বিধি, সাধারণ জ্ঞান, জ্ঞানকোষসহ রয়েছে দুই সহস্রাধিক বইয়ের সংগ্রহ ও সংরক্ষণ।

প্রয়াত মাস্টার জহির উদ্দিন মিয়া গ্রামের কয়েকজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি নিয়ে ১৯২৮ সালে নিজগালুয়া গ্রামে প্রথম একটি স্কুল (বর্তমানে জি. কে. হাই স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে নিজগালুয়া গ্রাম তথা রাজাপুর উপজেলায় শিক্ষার গুনগত মান বিচারে অন্যতম স্কুল হিসেবে দাবী রাখে।

শিক্ষার প্রসার ও মানের উন্নয়নে প্রয়াত মাস্টার জহির উদ্দিন মিয়াসহ তাদের এই অবদানকে স্মরণে রাখার মানসেই ‘মাস্টার জহির উদ্দিন মিয়া স্মৃতি পাঠাগার’ গড়ে তোলা হয়। দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট গণপাঠাগারটিতে বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের বইয়ের পাশাপাশি রয়েছে আঞ্চলিক ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, সকল বয়সের নারী, পুরুষ ও শিশু শিক্ষর্থীর জন্য ভিন্ন ভিন্ন পাঠ কর্নার, ইন্টারনেট সুবিধা সম্বলিত কম্পিউটার যেখানে জরুরী প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস প্রিন্ট করা, অনলাইনে আবেদন করা কিংবা ই-মেইল যোগাযোগ করার সুযোগ রয়েছে।

এদিকে পাঠাগারের পাশাপাশি এখানে ইসলামিক ফাইন্ডেশন কর্তৃক পরিচালিত মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দৈনিক ৩০ জনের মতো শিশু শিক্ষার্থী উক্ত শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে। তা ছাড়া এখানে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে এম.এম. (মনোয়ার-মমতাজ) যুব কল্যাণ সংঘ নামে সরকারি নিবন্ধকৃত আরেকটি প্রতিষ্ঠান পাঠাগারের সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। সেখানে দুটি সেলাই মেশিন রাখা আছে; যেখানে গ্রামের মা-বোনদের স্বাবলম্বী করার মানসে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার সহায়তায় সেলাই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। সফলভাবে প্রশিক্ষণ শেষে কৃতকার্য প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ সনদপত্র বিতরণ করা হয়েছে।

সুস্থ দেহে সুস্থ মন। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় ক্রীড়াচর্চা ও ক্রীড়া নুশীলনের বিকল্প নেই। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে এবং তারা মাদকাসক্তিসহ অন্যান্য সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে থাকে। তাই সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গঠনে এম.এম. (মনোয়ার-মমতাজ) যুব কল্যাণ সংঘের উদ্যোগে ‘মাদকের বিরুদ্ধে ফুটবল’ প্রতিপাদ্যে উপজেলার মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফুটবল বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিভাবান খুদে খেলোয়াড় বাছাইয়ের লক্ষ্যে এম.এম. (মনোয়ার-মমতাজ) যুব কল্যাণ সংঘ হতে উপজেলাব্যাপী ফুটবল, ক্রিকেট ও ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছে। প্রত্যয় ‘সোনার বাংলা গড়তে সোনার মানুষ তৈরি করা’।

প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে গণপাঠাগারটিতে গ্রামের সৃজনশীল, আগ্রহী ও উদ্যমী পাঠকসমাজ নিয়ে তিনটি কমিটি করা হয়েছে, উপদেষ্টা পরিষদ, কার্যনির্বাহী পরিষদ ও সাধারণ পরিষদ। বর্তমানে গণপাঠাগারটির সাধারণ সদস্য সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।

গণপাঠাগারটির উদ্যোগ বা কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে মাস্টার জহির উদ্দিন মিয়া স্মৃতি পাঠাগারের উদ্যোগে ও আয়োজনে উল্লেখযোগ্য নাান কার্যক্রম। যেমন, সরকারি ও বেসরকারি দপ্তর, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনে বছরের শুরুতে পাঠাগার কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক ক্যালেন্ডার বিতরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বছরের শুরুতে পাঠাগার কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক ক্যালেন্ডার ও ক্লাস রুটিন বিতরণ, বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের বই ও শিক্ষা সহায়ক উপকরণ বিতরণ, মেধাবী ও অসচ্ছল অদম্য/অপরাজিতা শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া চর্চা ও ক্রীড়া অনুশীলনের জন্য ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ, উপজেলা পর্যায়ে ফুটবল, ক্রিকেট ও ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতার আয়োজন, পি.এস.সি, জে.এস.সি, এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থীদের মাঝে পরীক্ষা সহায়ক উপকরণ বিতরণ, জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসসহ সকল জাতীয় দিবস উদযাপনে অংশগ্রহণ, ২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে প্রথম হতে পঞ্চম শ্রেণির শিশুদের নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন ও বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ, ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু দিবস এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষ্যে ৬ষ্ঠ হতে স্নাতক/স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের নিয়ে রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন ও বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে শিক্ষকমণ্ডলী ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে শিক্ষকমণ্ডলী ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন, মাহে রমজান উপলক্ষ্যে প্রথম হতে এস.এস.সি পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে অন্তঃউপজেলা ক্বিরাত ও হামদ/না’ত প্রতিযোগিতার আয়োজন ও বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ, মহান স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরীয় প্রদান, গ্রাম পুলিশদের বর্ষায় ছাতা বিতরণ, অটিস্টিক শিশু শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়ক উপকরণ বিতরণ, গ্রামের অসচ্ছল পরিবারের নারী, পুরুষ ও শিশুদের ঈদবস্ত্র ও শীতবস্ত্র বিতরণ, শারদীয় দুর্গোৎসবে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী ও পুণ্যার্থীদের মাঝে শারদ শুভেচ্ছা সামগ্রী বিতরণ, করোনায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডিজইনফেকশন চেম্বার স্থাপন ও স্যালাইন পানি সরবরাহ, অতিমারী করোনায় বিনামূল্যে স্যানিটাইজেশন উপকরণ বিতরণ, অতিমারী করোনায় শুকনা খাবার ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিতরণ, মহামারী করোনায় গ্রামের বাজারে বিনামূল্যে কাঁচা সবজি বিক্রি, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় আর্থিক সহযোগিতা প্রদান,  বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী অদম্য/অরাজিতা অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় আর্থিক সহায়তা প্রদান, এলাকার দরিদ্র, অসহায় ও অসচ্ছল পরিবরকে আর্থিক, চিকিৎসা ও আইনী সহায়তা/সহযোগিতা প্রদান, এলাকার দরিদ্র, অসহায় ও অসচ্ছল পরিবরকে স্বাবলম্বী করার প্রয়াসে জীবন-জীবিকার জন্য/উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার উপযোগী/সহায়ক উপকরণ প্রদান।

গণপাঠাগারটির সাফল্য এক কথায় আকাশচুম্বী! জেলা প্রশাসন ও জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার, ঝালকাঠী কর্তৃক জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস-২০১৯, জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস-২০২০ এবং জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস-২০২৪ ‘মাস্টার জহির উদ্দিন মিয়া স্মৃতি পাঠাগার’ তিন বার ঝালকাঠী জেলার ‘সেরা বেসরকারি পাঠাগার’ হিসেবে নির্বাচিত হয়। জেলা প্রশাসক, ঝালকাঠী মহোদয় পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনোয়ার হোসেনের হাতে সম্মাননা স্মারক ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেন গত ১৭/০২/১৯ হতে ২৪/০২/১৯ পর্যন্ত উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার সহায়তায় দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক দিয়ে পাঠাগারের উদ্যোগে ও আয়োজনে গ্রামের নারীদের সাবলম্বী করার মানসে ও প্রয়াসে হাতে-কলমে ৩২ (বত্রিশ) জন নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণ শেষে উত্তীর্ণ ২০ (বিশ) জন নারীকে সনদপত্র বিতরণ করা হয়, জেলা প্রশাসন, ঝালকাঠী কর্তৃক আয়োজিত জীবনানন্দ দাশ উৎসব-২০১৯ এ পাঠাগারের সেরা স্টলের স্বীকৃতি লাভ।

আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, ‘জ্ঞান অন্বেষণের জন্য তোমার যে জিনিসটা প্রয়োজন হবে তা হলো লাইব্রেরির অবস্থান জানা।’ লাইব্রেরিতে অনেক ধরণের বই সংরক্ষিত থাকে, যেখান থেকে জ্ঞান অর্জন করা যায়। লাইব্রেরির সহায়তায় নিজেকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যাওয়া যায়। তাই আমাদের উচিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং লাইব্রেরির সহযোগিতা নেওয়া। কারণ, লাইব্রেরি হলো বিভিন্ন উদ্ভাবনী চিন্তা জন্ম নেওয়ার স্থান এবং এমন একটি জায়গা যেখানে ইতিহাস জীবনের সঙ্গে মিশে যায়।

ইত্তেফাক/পিও