বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

জাবিতে ধর্ষণকাণ্ডে আন্দোলন চলছেই, নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবি

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৮:০৬

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বহিরাগত এক দম্পতিকে কৌশলে ডেকে এনে স্বামীকে আবাসিক হলে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় ধর্ষণ ও নিপীড়ন মুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

মঙ্গলবার (০৬ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার সংলগ্ন সড়কে ‘নিপীড়ন বিরোধী মঞ্চের’ ব্যানারে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন তারা। এতে দেড় শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অংশ নেন।

মানববন্ধনে বক্তারা অছাত্রদের হল থেকে বের করা, ধর্ষণে অভিযুক্ত অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি কার্যকর করা, ভিন্ন ঘটনায় যৌন নিপীড়নে অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহমুদুর রহমান জনির শাস্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল হাসান এবং মীর মশাররফ হোসেন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাব্বির আলমের পদত্যাগের দাবি জানান।

মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আহসান লাবিব বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি প্রক্টর-প্রাধ্যক্ষ ধর্ষককে বাঁচানোর পায়তারা করছেন। পরিশেষে তারা ধর্ষককে পালাতে সহযোগিতা করে। যারা ছাত্রলীগের ছাঁয়া হিসেবে কাজ করে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও প্রভোস্ট হিসেবে দায়িত্বে থাকার নৈতিক অধিকার নেই। আমাদের লজ্জা লাগে যখন একজন যৌন নিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষক মাহমুদুর রহমান জনির ক্লাস করতে হয়; তার কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হয়। তার বিরুদ্ধে স্ট্রাকচার্ড কমিটি গঠিত হওয়ার পরেও তাকে বহিষ্কার করা হয়নি।’

দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রাইহান রাইন বলেন, ‘ক্যাম্পাসে যত কিছুই হোক উপাচার্য সাহেব নির্বিকার থাকেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোন অভিভাবক নেই। অভিভাবক আছে ধর্ষক, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে তাদের হলে রাখছে। এই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে আমরা অছাত্রদের হল থেকে বের করতে চাই, অপরাধের বিচার চাই, ক্যাম্পাসের নির্বিকার প্রশাসনের নিরসন চাই।’

ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘হল প্রশাসন প্রথমে ধর্ষণের কথা অস্বীকার করেছে। এরপর তারা ধর্ষককে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। প্রশাসন সিন্ডিকেটে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা যদি বাস্তবায়ন না করে তাহলে আমরা এক দফা দাবিতে আন্দোলনে যাবো। উপাচার্যকে বলতে চাই আপনি আপনার চেয়ার খুবই পছন্দ করেন। আপনি যদি এ চেয়ারে থাকতে চান তাহলে অতিদ্রুত এই ঘটনার বিচার করুন।’

মানববন্ধনে সমাপনী বক্তব্যে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক পারভীন জলি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ দিন সময়ের তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ছাত্রদের কোন তালিকা প্রকাশ করতে পারেনি। ধর্ষণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা না করে থানায় শুধু একটি অভিযোগ দায়ের করেছে। উপাচার্য বারবার বলেন আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। কমিটমেন্ট দেন কিন্তু তা বাস্তবায়ন করেন না। যেমনটি হয়েছে মাহমুদুর রহমান জনির ক্ষেত্রে। প্রায় দেড় বছর পার হয়েছে এখন পর্যন্ত তার কোনো বিচার হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ধর্ষককে যারা পালাতে সাহায্য করেছে তারা ছাত্রলীগের কর্মী। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোস্তাফিজকে খুঁজে আনতে পাঠিয়েছিলেন ছাত্রলীগের দুজন কর্মীকে। তাহলে প্রক্টরিয়াল টিমের কাজ কি? এখান থেকে বোঝা যায় অভিযুক্তদের আটক করতে প্রক্টরের কোনো সদিচ্ছা ছিল না। এই প্রক্টর পদে বহাল থাকার সকল প্রকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন।’

এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন, ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক এ এস এম আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া ও অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামসুল আলম সেলিম প্রমুখ।

এছাড়া মানববন্ধনে শিক্ষকদের মধ্যে আইবিএ’র অধ্যাপক আইরিন আক্তার, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সোহেল আহমেদ, ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক সোহেল রানা, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন তুহিন ও অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রনি হোসাইন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে দুপুর দুইটায় ‘নিপীড়ন বিরোধী মঞ্চ’ প্ল্যাটফর্মের দুই সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রাইহান রাইনকে আহ্বায়ক ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজ ইসলাম মেঘকে সদস্য সচিব করা হয়েছে।

এরপর প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়। সেগুলো হলো, ধর্ষণে অভিযুক্ত অপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচার নিশ্চিত করা, অছাত্রদের হল থেকে বের করে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের আসন নিশ্চিত করা, যৌন নিপীড়নে অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহমুদুর রহমান জনিসহ অন্য সময়ে বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা, ক্যাম্পাসের সম্প্রতি সংঘটিত অপরাধের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল হাসান এবং মীর মশাররফ হোসেন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাব্বির আলমের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা ও তদন্ত চলাকালে তাদের সাময়িক অব্যাহতি প্রদান করা। এছাড়া আগামীকাল বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দেন তারা।

অন্যদিকে ধর্ষকদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিতে মৌন মিছিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এদিন দুপুর দুইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্ত্বর থেকে মিছিলটি বের করা হয়। মিছিলটি মূল সড়ক দিয়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।

ইত্তেফাক/এআই