মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষকদের ‘শিক্ষাছুটি’ যেন শেষই হয় না!

১৬ হাজার শিক্ষকের মধ্যে পাঠদানের বাইরে আছেন ৫ হাজারের বেশি, শিক্ষক
সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৫০

মাস্টার্স করার আগেই চাকরি পান ‘প্রভাষক’ হিসেবে। চাকরি পাওয়ার পর পরই শিক্ষা ছুটি নিয়ে মাস্টার্স করেন। আবার মাস্টার্স শেষ করেই পিএইচডি ডিগ্রির জন্য ছুটির চেষ্টা করেন, পেয়েও যান। ফলে ছুটি যেন শেষই হয় না। এ তো গেল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র শিক্ষকের কথা।

অন্যদিকে বিভিন্ন ডিগ্রি অর্জনের পর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কনসালটেন্সি বা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাগিয়ে নিজের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘শিক্ষা’ ছুটির আবেদন করেন শিক্ষকরা। বিনায় আয়েশেই মিলে যায় সেই ছুটিও। শিক্ষক হয়েও শিক্ষকতাকে পাশ কাটিয়ে ছুটি নিয়ে ব্যক্তিগত লাভের পেছনে ছুটছেন অগণিত শিক্ষক। শিক্ষকদের হরহামেশা এমন ছুটি মেলায় বিপাকে পড়ে যান শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস না হওয়া এখন নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা।  সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঢাকার বাইরে অপেক্ষাকৃত নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র শিক্ষকের সংকট বেশি। এমন পরিস্থিতিতে জুনিয়র শিক্ষক দিয়েই চলছে সেখানকার লেখাপড়া। এর মধ্যে আবার জুনিয়র শিক্ষকরাও চেষ্টা চালাতে থাকেন ছুটির জন্য। ফলে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ও গবেষণার ওপর প্রভাব পড়ছে।       

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বলেন, বর্তমানে মাস্টার্স ও পিএইচডির জন্য শিক্ষকরা শিক্ষা ছুটি নিয়ে থাকে। তবে ভবিষ্যতে মাস্টার্স ডিগ্রি ছাড়া কোনো শিক্ষক নিয়োগ হবে না। এ কারণে শিক্ষা ছুটি শুধু পিএইচডির ক্ষেত্রেই হবে।  এখন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষকের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ শিক্ষা ছুটি পেতে পারেন। এর বেশি ছুটি দেওয়াও উচিত নয়।

তবে ইউজিসির তথ্য বলছে ভিন্নকথা। গত সপ্তাহে প্রকাশিত ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ হাজার ২৯৯ জন শিক্ষকের মধ্যে খণ্ডকালীন বা চুক্তিভিত্তিক হিসেবে অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন ৪৭৪ জন। শিক্ষা ছুটিতে গেছেন ৩৫৫ জন। প্রেষণে/লিয়েনে রয়েছেন ২৭ জন। বিনা বেতনে ছুটি নিয়েছেন ১৬ জন আর ছুটি নিয়ে ফেরেননি চার জন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৫১০ জন শিক্ষকের মধ্যে খণ্ডকালীন বা চুক্তিভিত্তিক হিসেবে অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৫৪৭ জন। শিক্ষা ছুটিতে ১১৬ জন। প্রেষণে আট জন। বিনা বেতনে ১২ জন এবং ছুটি ছাড়াই অনুপস্থিত চার জন। ইউজিসির তথ্য বলছে, প্রায় অর্ধেক শিক্ষকই ছুটিতে রয়েছেন।

তবে ইউজিসির এই তথ্যে আপত্তি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক বেনু কুমার দে। তিনি বলেন, ‘ইউজিসির তথ্য ঠিক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়ারি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বর্তমানে ৬৯৮ জন পুরুষ শিক্ষক আর ২৯৯ জন নারী শিক্ষক রয়েছেন। ইউজিসি ১ হাজার ৫১০ জন শিক্ষকের তথ্য কোথায় পেল? তিনি বলেন, ছুটি দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম রয়েছে, সেটা মেনেই ছুটি দেওয়া হয়ে থাকে।’

তবে ইউজিসি তাদের প্রতিবেদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৫১০ জন শিক্ষকের তথ্য উল্লেখ করেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুল হক বলেন, অতিরিক্ত শিক্ষকের ছুটি খুবই অগ্রহণযোগ্য। মূলত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন সবক্ষেত্রে নতজানু। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শিক্ষকদের ছুটি প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে বিতর্ক আছে। ছুটি প্রাপ্য নয়, এমন অনেককে ছুটি দিয়ে দিচ্ছেন। অনেকে ছুটি ছাড়াই স্টেশনে থাকছে না। যখন কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন তারা প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করে। এভাবে কিছু শিক্ষকের কারণে সব শিক্ষক প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন। এসবের কঠোর মনিটরিং দরকার এবং এসব দমন করাও দরকার বলে মনে করেন এই শিক্ষক নেতা।

ইউজিসির তথ্য বলছে, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪২ জন শিক্ষকের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ৬৬ জন। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১৮ জন শিক্ষকের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বিভিন্ন ধরনের ছুটি নিয়ে আছেন ৮৯ জন।

গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩৩ জন শিক্ষকের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ছুটিতে রয়েছেন ১৩৭ জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটির ১৬ জন শিক্ষকের মধ্যে সাত জনই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে আছেন। তবে এ তথ্য নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা। শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন শিক্ষকের মধ্যে কর্মরত মাত্র ১৪ জন। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ৯৬ জনই শিক্ষা ছুটিতে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চশিক্ষার ছুটিতে শিক্ষকের জ্ঞানের পরিধি বাড়ে। কিন্তু সমস্যা হয় যখন ভারসাম্য রক্ষা করে ছুটি মঞ্জুর করা না হয়। এখন একটি বিভাগ যদি পাঁচ জন  শিক্ষকের মধ্যে তিন জনকেই ছুটি দেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নুর বলেন, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি দেওয়ার ক্ষেত্রে পাঠদানের বিষয়টি বিবেচনায় আনা উচিত। হরহামেশা ছুটি দেওয়া উচিত নয়।  এতে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইত্তেফাক/এমএএম