বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

পরাশক্তিগুলোর একসঙ্গে কাজ করার বিকল্প নেই

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:৩০

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের হাউজ ইনটেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান মাইক টার্নারের এক বিবৃতি ওয়াশিংটনে রীতিমতো আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। টার্নার বলেছেন, তার হাতে যে তথ্য এসেছে, তাতে তিনি  ‘গুরুতর জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি’ খুঁজে পেয়েছেন। খুব পরিষ্কার করে টার্নার কিছু না বললেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মিত্রদের জানানো হয়, চলতি বছরেই মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র অথবা পরীক্ষামূলক নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড মোতায়েন করতে পারে রাশিয়া।

প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্লুমবার্গ নিউজ এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে মহাকাশে স্যাটেলাইট ঘায়েল করার সক্ষমতা তৈরি করছে রাশিয়া। তবে মহাকাশে পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েন করা হলে তাতে করে ১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস চুক্তি লঙ্ঘন করা হবে। কারণ, রাশিয়াও এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ।

খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানিয়েছেন, ‘ক্রেমলিন একটি স্যাটেলাইট-বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করছে।’ এ ধরনের সংবাদ রক্ত হিম করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট! প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য জিম হিমস এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘এই খবর শোনার পর কয়েকটি ফোন কল পেয়েছি। অনেকে জানতে চেয়েছেন, পশ্চিম ভার্জিনিয়ার পাহাড়ে ছুটে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে কি না?’ উল্লেখ্য, কোনোভাবে পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হলে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার পাহাড়গুলো নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজে দেবে বলে মনে করা হয়।

যাহোক, রাশিয়ার উপগ্রহবিরোধী পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সংবাদ নেহাত সহজ বিষয় নয়। কৌশলগত অস্থিতিশীলতার যুগে মহাকাশ নিরাপত্তার গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে কিছুই বলার নেই। রাশিয়া যদি সত্যি সত্যিই ধ্বংসাত্মক অ্যান্টি-স্যাটেলাইট পরীক্ষার পথে পা বাড়ায়, তাহলে বিশ্বকে পড়তে হবে নতুন ভোগান্তিতে। এর মধ্য দিয়ে শুরু হবে ধ্বংসের নতুন খেলা।

অনেকে বলছেন, মার্কিন কর্মকর্তারা এই সংবাদে বেশ ভয় পেয়ে গেছেন! পাওয়ারই কথা। যদিও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বলতে শোনা গেছে, ‘আমরা সব সময়ই মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের বিরুদ্ধে ছিলাম। এখনো আছি। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ মহাকাশে যে সব কাজ করছে, আমরাও তেমনটাই করছি মাত্র।’

রাশিয়া স্বীকার না করলেও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাকাশে মোতায়েনের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সংবাদ পৃথিবীর কক্ষপথে আক্রমণ সক্ষমতা তৈরির প্রতিযোগিতাকে সামনে আনছে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া ও চীন মহাকাশ প্রতিযোগিতা বা স্পেস রেসে জড়িয়ে পড়তে পারে। সত্যি সত্যিই যদি তেমনটা ঘটে, তাহলে পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়ংকর হয়ে উঠবে। কারণ, স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার চেয়ে আজকের দিনের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে স্পেস রেসের ঘটনা ঘটলে, তাতে নিশ্চিতভাবে জড়িয়ে পড়বে পরাশক্তিগুলো। আর এর ফলে কী ঘটতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, স্পেস রেস না ঘটুক, দুর্ঘটনাবশতও যদি মহাকাশে কিছু ঘটে, তাহলে কক্ষপথে আবর্তন করা এক-তৃতীয়াংশ স্যাটেলাইট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর ফলে বিপর্যস্ত হতে পারে পৃথিবীর যোগাযোগব্যবস্থা। মাথায় রাখা জরুরি, জাতিসংঘের মহাকাশ বিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথে রয়েছে ৭ হাজার ৮০০ স্যাটেলাইট।

মহাকাশে রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের খবরে যাতে খুব বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে না পড়ে, সে ব্যাপারে মোটামুটি উদ্যোগ নেয় হোয়াইট হাউজ। নানা রকম বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে বিষয়টিকে আড়াল করার চেষ্টাও চলে! উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মুখপাত্র জন কিরবির কথা। তিনি বলেছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যে তথ্য রয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে, উপগ্রহবিরোধী অস্ত্রের সক্ষমতা রয়েছে মস্কোর। তবে তা এখনো মোতায়েন করা হয়নি। এমনকি নিরাপত্তার প্রশ্নে হুমকি তৈরি করে, তেমন কিছুও ঘটেনি এখন পর্যন্ত।’

প্রথম প্রথম মনে হয়েছিল, সেক্রেটারি অব স্টেট অ্যান্টনি ব্লিনকেন এই ঘটনাকে হালকা করেই দেখছেন। তবে কিছুদিন পর তার কথাবার্তায় মনে হয়েছে, বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই আমলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এক ঘোষণায় ব্লিনকেন উল্লেখ করেন, ‘হুমকিটি যথেষ্ট গুরুতর ও বাস্তবসম্মত ছিল।’ এ কারণে সদ্য সমাপ্ত মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে বিষয়টি তুলতে ভোলেননি তিনি। চীন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এ বিষয়ে কথা বলেন ব্লিনকেন।

একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ করা দরকার। এই অভিযোগকে রাশিয়া ‘জঘন্য, অবান্তর কথা, বানোয়াট’ ইত্যাদি বলে অভিহিত করেছে। একই ধরনের কথা বলেছেন রিপাবলিকান নেতারাও। টার্নারের তথ্যকে ‘বেপরোয়া মন্তব্য’ করে তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। রিপাবলিকান অ্যান্ডি ওগলস টার্নারকে ‘ভুল চিন্তাভাবনা এবং অসত্ উদ্দেশ্য’ নিয়ে পড়ে থাকার জন্য অভিযুক্ত করে বলেছেন, ‘টার্নারের এ ধরনের কথা বলার পেছনে অন্য মতলব আছে। ইউক্রেনের জন্য তহবিল নিশ্চিত করার জন্য তিনি এমনটা করে থাকতে পারেন।’

কংগ্রেস, ওয়াশিংটন কিংবা কে কী মন্তব্য করল, তা বড় কথা নয়। বরং সবকিছুকে ছাপিয়ে বড় প্রশ্ন হলো, মহাকাশের নিরাপত্তা ঠিকঠাক থাকছে তো? মনে রাখা জরুরি, ক্রমবর্ধমান হারে স্যাটেলাইটের সংখ্যা বাড়ছে। উন্নত প্রযুক্তি স্থাপন করা হচ্ছে মহাকাশে। এতে করে যেমন বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, একইভাবে বাড়ছে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠাও। বিশেষত ভবিষ্যতে যুদ্ধের উদ্বেগ বাড়ছে এতে করে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইঙ্গিত দিয়ে আসছে, রাশিয়া এবং চীন উভয়ই মহাকাশকে ‘একটি নতুন যুদ্ধ-ইস্যু’ বানানোর পাঁয়তারা করছে। এমন পরিস্থিতিতে স্যাটেলাইটের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে নিজের স্যাটেলাইট সক্ষমতার সুরক্ষার পাশাপাশি তা হালনাগাদ করার ব্যবস্থা নিচ্ছে ওয়াশিংটন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন এবং রাশিয়ার তৈরি মহাকাশ-ভিত্তিক হুমকি মোকাবেলা করার জন্য কক্ষপথে নতুন সিস্টেম চালুর পথে অনেকখানি এগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

২০২১ সালে একবার অ্যান্টি-স্যাটেলাইট অস্ত্র পরীক্ষা চালায় রাশিয়া। ঐ পরীক্ষার সময় একটি পুরোনো উপগ্রহ ধ্বংস হয়ে যায়। এর ফলে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে পনেরো শরও বেশি মহাকাশ ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে বিপন্ন করার জন্য যথেষ্ট। এই ধ্বংসাবশেষ আগামী বছরগুলোতে অন্যান্য উপগ্রহ ও মহাকাশযানের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।

রাশিয়ার মতোই ধ্বংসাত্মক অ্যান্টি-স্যাটেলাইট পরীক্ষা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত। এসব পরীক্ষায় হাজার হাজার টুকরো মহাকাশ ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়েছে। মহাকাশের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের জন্য এসব ধ্বংসাবশেষ মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

ভালো সংবাদ হলো, সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশের নিরাপত্তা রক্ষার্থে স্যাটেলাইট-বিরোধী পরীক্ষা বন্ধ করার চেষ্টায় জোর দিয়েছে। এই লক্ষ্যে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে স্যাটেলাইট-বিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধের বিষয়ে আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাশ করাতে রাজিও করিয়েছে। ১৫০টিরও বেশি দেশ এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। চীন, ইরান ও রাশিয়াসহ ৯টি দেশ এর বিরোধিতা করে বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। অন্যদিকে ভোটদানে বিরত থাকা নয়টি দেশের মধ্যে আছে ভারতের নাম।

প্রসঙ্গত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও রাশিয়া উভয় দেশই ১৯৬০-এর দশকে মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। এর পর অবশ্য দুই দেশ একসঙ্গে বসে চুক্তি করে। ১৯৬৮ সালে স্বাক্ষরিত সেই ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ অনুয়ায়ী, মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র বা অন্য যে কোনো ধরনের গণবিধ্বংসী অস্ত্র স্থাপন নিষিদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়া মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপন করছে—এমন দাবি যদি সত্যি হয়, তাহলে মহাকাশে হুমকির প্রশ্নে তা নতুন মাত্রা যোগ করবে। কারণ, এমন একসময়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের অভিযোগ উঠল, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ আলোচনা আটকে আছে নানা সমীকরণে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ইউক্রেন পরিস্থিতির কথা। এই ইস্যুতে উভয় দেশই যেন জিম্মি দশায় পড়েছে!

স্নায়ুযুদ্ধের কঠিন সময়ে দাঁড়িয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া মহাকাশে অস্ত্র পরীক্ষা চালানোর বিষয়ে চুক্তিতে পৌঁছাতে পেরেছিল। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় সম্মত হয়েছিল। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট এতটাই ভিন্ন যে, বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, মস্কো মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে! সিকিউর ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশনের ব্র্রায়ান উইডেন এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘রাশিয়া যদি সত্যিই মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটায়, তাতে কেবল অবাক হওয়া ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।

গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, মহাকাশে অস্ত্র স্থাপন বা পরীক্ষার বিষয়ে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা ভারতের মধ্যে নানা ক্ষেত্রে মতবিরোধ আছে। মূলত এ কারণেই জুতসই চুক্তি আটকে যায় বারবার। বহুপাক্ষিক স্তরে এ ধরনের বিভক্তকরণ মহাকাশের নিরাপত্তাহীনতার কথাই কেবল মনে করিয়ে দেয়। ঠিক এমন একটি অবস্থায় ওয়াশিংটনের ‘মহাকাশ আতঙ্ক’ বিশ্বের জন্য বেশ খারাপ খবরই! এক্ষেত্রে মহাকাশে পরীক্ষানিরীক্ষা চালানোর নিয়মকানুন আইনগত দিক নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

লেখক: আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতা। জাতিসংঘে লেবাননের সাবেক রাষ্ট্রদূত

আরব নিউজ থেকে অনুবাদ: সুমৃত খান সুজন

ইত্তেফাক/এমএএম