সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বাংলা ভালো লিখতে কিংবা বলতে পারলেও চাকরি হচ্ছে না

সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এর গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:৩৮

ফ্রান্স, গ্রিস কিংবা জার্মান নিজেদের ভাষায় উচ্চশিক্ষা দিচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, চীন কিংবা উত্তর কোরিয়াও নিজেদের ভাষা শক্তিশালী করেছে বিভিন্ন দপ্তরে। কারণ, তারা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও কৌশলী। বাংলাদেশে এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। কারণ, বাংলা এদেশে জীবিকার ভাষা হতে পারেনি। কেউ ইংরেজিতে ভালো, তার মানেই তার চাকরিটি অনিবার্য। অথচ বাংলা ভালো লিখতে কিংবা বলতে পারলেও তার চাকরি হচ্ছে না। 

শনিবার ‘আমার ভাষা আমার শক্তি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেছেন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনেরা। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়নের অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে প্রাধান্য পায় দুই বাংলায় বাংলা ভাষার জেরবার অবস্থা। অনুষ্ঠানের আয়োজক সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

সংগঠনটির আহ্বায়ক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা বিশিষ্ট কবি ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। যার বর্ণনায় প্রাধান্য পায়, ভাষা বাংলাকে উচ্চকিত করতে সরকারের তাবত্ পরিকল্পনা। তার অভিমত, অবিলম্বে ভাষানীতি প্রয়োজন। ভাষার মৃত্যু মানেই সভ্যতার মৃত্যু। সুতরাং হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় ভাষানীতি খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।

তার অভিমত, এখনো কিছু লোক ইংরেজিতে দাওয়াত কার্ড করে। তারা আসলে অন্যদের থেকে নিজেদের আলাদা করেতে চায়। মূলত এটি তাদের মানসিক রুগ্ণতার লক্ষণ। বিভিন্ন সাইনবোর্ডে ইংরেজি লেখার আধিক্য এখনো রয়েছে। আর বাংলা অক্ষরগুলো খুবই ছোট আকারে লেখা থাকে। এটি অবশ্যই দুঃখজনক। কলকাতায় এই অবস্থা আরো ভয়াবহ। এই সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে দ্রুত সব বই বাংলায় অনুবাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে যেন বাংলার ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।

অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক ছিলেন অধ্যাপক ড. পবিত্র সরকার। যিনি ভাষাতাত্ত্বিক পন্ডিত, সাহিত্যিক, নাট্যসমালোচক ও পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। টানা সাত বছর রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর থাকাকালীর তিনি বহির্বিশ্বে কীভাবে বাংলাকে দেখেছেন, তা আলোচনায় আনেন। তার অভিমত, একসময় বলা হতো বাংলায় ধর্মগ্রন্থ পড়লে নরকে যাবে। এখনো একটি শ্রেণি বিশেষ ভাষাকে এমন অবস্থানে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। তবে ব্যবসায়িক বিশ্বায়নে বাংলাকে তুলে ধরলে শঙ্কা অনেকাটাই দূর হবে।

অনুষ্ঠানে বাংলা ভাষার ব্যাপারে আরো সজাগ হওয়ার আহ্বান জানান রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. বিশ্বজিত্ ঘোষ। তার মতে, বিশ্ব পুঁজিবাদ তৃতীয় বিশ্বের ভাষাকে মেনে নিতে চায় না। আমাদের সুবিধা যে, নিজের টাকায় আমরা পদ্মাসেতু করছি। এ কারণে দেশের মান বেড়েছে বিদেশে। অর্থনীতি শক্তিশালী হলে ভাষার মান এমনিতেই বেড়ে যায়।

বাংলা ব্যবহারে অনীহার নানা ইস্যু ও কারণ তুলে ধরে প্রত্থিতযশা এই শিক্ষাবিদ বলেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা শিখেছিল। এমনকি তারা বাংলায় অনুবাদও করেছিল। তার মানে ইংরেজরা বাংলাকে গুরুত্ব দিয়েছিল অনেক বছর আগেই। অথচ এখন তার উল্টোটা ঘটছে।

পিএসসির ভূমিকা ও বিসিএসের নানা প্রসঙ্গ তুলে ধরে ডক্টর ঘোষ আরও বলেন, মেয়েটি ইংরেজিতে ভালো হলেই কেবল তাকে ভাইভা বোর্ডে গণ্য করা হয়। কিন্তু বাংলা পারল কী পারল না, তা ঠাহর করতে পারছে না কেউ।

সম্প্রীতি বাংলাদশের সদস্য সচিব বাংলাদেশের খ্যাতনামা লিভার বিশেষজ্ঞ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল ছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট কথাকার অধ্যাপক ড. রতন সিদ্দিকী, সাবেক সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, শিক্ষাবিদ রেভারেন্ড মার্টিন অধিকারী, থিয়েটারকর্মী অধ্যাপক ফাহমিদা হক, সম্প্রীতি বাংলাদেশের নেত্রী জয়শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, ডিরেক্টর গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক ও সম্প্রীতি বাংলাদেশের সংগঠক সাইফ আহমেদ,  মেজর (অব.) আফিজুর রহমান, মহিলা পরিষদের নেত্রী ফরিদা ইয়াসমিন, একুশে টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক ড. অখিল পোদ্দারসহ অন্যরা।

প্রফেসর ড. রতন সিদ্দিকী বলেন, ভাষার লড়াই খুব প্রাচীন। যুগে যুগে যারাই এসেছে তারা আমাদের ভাষা দখল করতে চেয়েছে। কেউ এসেছেন কর্তৃত্ব করতে। এরপরও ভাষা বিলুপ্ত হয়নি।

ইত্তেফাক/এএইচপি