বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১১ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

প্রাইভেট কোচিংয়ে যৌন হয়রানি বাড়ছে

সাম্প্রতিক আলোচিত কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কোচিং সেন্টারে, অথচ এক যুগেও বাস্তবায়িত হয়নি কোচিং-বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

বিতর্কিত শিক্ষক সেই পরিমল জয়ধরের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। ২০১১ সালে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বাংলার এই শিক্ষক কোচিং করানোর সময় এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন। সাড়া জাগানো ঐ ঘটনায় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বসুন্ধরা শাখার ঐ শিক্ষককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, পরিমল জয়ধর স্কুলের পাশে একটি বাড়িতে কোচিং করানোর সময় ঐ ছাত্রীকে প্রলোভন দেখিয়ে প্রথম ধর্ষণ করেন ২০১১ সালের ২৮ মে। সে সময়ের ভিডিও চিত্র মোবাইলে ধারণা করা হয়েছিল। অল্প কিছুদিন পর  সেই ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে আবারও ধর্ষণ করেন।

ভিকারুন নিসার বসুন্ধরা শাখার নবম শ্রেণির দিবা শাখার এক ছাত্রী ঐ শাখার ইংরেজি শিক্ষক আবু সুফিয়ানের কাছে প্রাইভেট পড়ত। প্রাইভেট পড়ানোর ফাঁকে ঐ শিক্ষক বিভিন্ন সময় ছাত্রীকে অশালীন এসএমএস পাঠাতেন। যেগুলো খুবই আপত্তিকর ও সম্মানহানিকর। বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেন ছাত্রীর অভিভাবক। বিষয়টি প্রমাণ পাবার পর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর আবু সুফিয়ান নামে ইংরেজির ঐ শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছিল। সর্বশেষ ঘটনাটি চলতি সপ্তাহের। একই স্কুলের আজিমপুর শাখার সুযোগ না পেয়ে কোচিং সেন্টারে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেই যৌন হয়রানির সুযোগ মিলছে এসব শিক্ষকের। এ কারণে তারা আতঙ্কিত। 

সম্প্রতি আরেকটি ঘটনা ঘটে চট্টগ্রামে। নগরের চান্দগাঁওয়ের একটি কোচিং সেন্টারে শিক্ষকের ধর্ষণের ফলে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে এক ছাত্রী। বিষয়টি পরিবারের লোকজন জেনে ফেলায় লজ্জায় ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায় মেয়েটি। অবশেষে হাসপাতালে ১০ দিন  চিকিত্সাধীন থাকার পর মারা যায় মেয়েটি। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক হামিদ মোস্তফা জিসান বর্তমানে কারাগারে আছেন।

অভিভাবকরা বলছেন, সামনে আসা এমন তিন-চারটি ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে। এর বাইরে কত নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, যা শিক্ষার্থীরা নানা কারণে মুখ বুজে সহ্য করছে। এগুলো হিসাবের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। তারা বলছেন, এই সব প্রাইভেট কোচিং অনৈতিক শিক্ষকদের যৌন হয়রানির সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের বাধ্য করে কোচিংয়ে নেওয়া হয়। আর কোচিংয়ে নিয়েই এই সর্বনাশ করে।

কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালার বাস্তবায়ন নেই :২০১১ সালের উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশ দেওয়ার ঠিক পরের বছরই একটি নীতিমালা জারি করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এটি ছিল শিক্ষকদের ‘কোচিং বাণিজ্য’ বন্ধ করা নিয়ে। এটির নাম দেওয়া হয়েছিল— ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা, ২০১২’। ঐ বছরের ২০ জুন এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা হয়। কিন্তু নীতিমালা জারির ১২ বছর পর ২০২৪-এ এসে দেখা গেল, মাঠ পর্যায়ে এই নীতিমালা বাস্তবায়নের হার  প্রায় শূন্য ভাগ। নেই কোনো মনিটরিং কার্যক্রমও।  এতে খুশি কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনিতে সুবিধাভোগী শিক্ষকরা। আর সর্বনাশ ঘটছে ছাত্রীদের।

এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য ছিল, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কোচিংবাজ শিক্ষকদের হাত থেকে রক্ষা করা, পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ কমানো ও শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে মনোনিবেশ করানো। যৌন নির্যাতন থেকে ছাত্রীদের রক্ষার জন্য সরকার এই নীতিমালা না করলেও এখন যৌন নির্যাতন বন্ধেই এই নীতিমালার বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়ছে।

নীতিমালার উল্লেখযোগ্য অংশ হলো, ‘কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ছাত্রছাত্রীর তালিকা, রোল, নাম ও শ্রেণি উল্লেখ করে জানাতে হবে।’ এই নীতিমালা বাস্তবায়ন হচ্ছে এমন উদাহরণ কোথাও নেই। রাজধানীর নামি, অখ্যাত যে প্রতিষ্ঠানই হোক; প্রাইভেট কোচিংয়ে জড়াননি, এমন শিক্ষকের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম।

যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত ভিকারুন নিসা নূন স্কুলের শিক্ষক মুরাদ সরকার নতুন কারিকুলামের জেলা পর্যায়ের মাস্টার ট্রেইনার। অথচ তিনি নিজেও কোচিং বাণিজ্যে অভিযুক্ত। এছাড়া কোচিংয়ে জড়ানোর অভিযোগের বিষয়ে আরও দুজন শিক্ষকের নাম উঠে আসে। এরা হলেন লাভলী ইসলাম ও কানিজ ফাতেমা। এরা যে এভাবে কোচিং বাণিজ্যে জড়িত, তা স্বয়ং অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরীও জানতেন। কিন্তু তিনি এক্ষেত্রে ছিলেন নীরব।

কোচিং বাণিজ্য বন্ধে শিক্ষাবিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘নতুন কারিকুলামে কোচিং করার সুযোগ কমে গিয়েছে। কোচিং বাণিজ্য নীতিমালা বাস্তবায়নের বিষয়ে আমি ব্যবস্থা নেব।’ যৌন নির্যাতন নিয়ে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যে নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।

নীতিমালা না মানলে তিন ধরনের শাস্তির কথা বলা হয়েছিল। ‘প্রথমত, এমপিওভুক্ত হলে এমপিও স্থগিত, বাতিল, বেতন কমিয়ে দেওয়া কিংবা বরখাস্ত করা হবে। দ্বিতীয়ত, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এমপিওবিহীন শিক্ষক হলে প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া, বেতন স্থগিত কিংবা চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত না হলে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা, বেতন স্থগিতের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সরকার ঐ সব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেবে।’ অথচ কোচিংয়ে জড়িত কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন শাস্তি হয়েছে, তার কোনো উদাহরণ নেই। 

এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, ‘কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা অনুযায়ী নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট কোচিংয়ে পড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু পড়ানো হচ্ছে এমন আমরা জানছি। কিন্তু শিক্ষা অধিদপ্তরের কম জনবল থাকায় বিষয়টি মনিটরিং করার সুযোগ কম। বিষয়টি অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষক মনিটরিং করতে পারে। তবে এই নীতিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ 

ইত্তেফাক/এমএএম