এই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা কাম্য নয়

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৪, ০৭:১৫

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খাদ্য নিরাপত্তা পরিসংখ্যান ২০২৩-এ বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে কৃষির ওপর নির্ভরশীল ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বঞ্চনা ও বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে শহরে এ হার মাত্র ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অথচ কৃষকের আবাস গ্রামে এ হার হচ্ছে ২৪ দশমিক ১২ শতাংশ। অনুরূপভাবে বিভাগওয়ারি হিসাবে হাওর-বাঁওড় ও কৃষিজমি বেষ্টিত বিভাগেও (সিলেট বিভাগ) বিরাজমান সর্বাধিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা। এ কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবেও সামনে আসছে কৃষি। কৃষির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর এই হতাশার প্রভাব পড়তে পারে পুরো কৃষি খাতে। ফলে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারে।

ইতিমধ্যেই বিভিন্ন কারণে গত এক বছরে কৃষি পেশা ছেড়ে দিয়েছে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ। বিভিন্ন হতাশার কারণে তারা এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল পরিবারে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, আয়ের বৈষম্য, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কারণে কাজের ক্ষেত্র কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে কৃষি পেশা ছাড়ছে মানুষ। অনেক কৃষকই এখন দেশে ফসল ফলানোর চেয়ে বিদেশে অন্যের জমি চাষ করছে। বর্তমানে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে ৪৯ শতাংশই যাচ্ছে কৃষিকাজে। শ্রমশক্তি জরিপ (অক্টোবর-ডিসেম্বর) তথ্য অনুযায়ী, কৃষি পেশায় জড়িত ৩ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার। অথচ এর আগের বছরের অর্থাত্ ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৩৩ লাখ ৬০ হাজার। কৃষকরা তাদের পেশা ছেড়ে দেওয়ার প্রভাব পড়েছে দেশের মোট দেশজ উত্পাদন তথা জিডিপিতে।

বিবিএস এখন জিডিপির হিসাব প্রতি প্রান্তিকেই দিয়ে থাকে। সর্বশেষ চলতি অর্থবছরের (২০২৩-২৪) অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে এসে দেশের জিডিপি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ০৭। এ প্রান্তিকে এসে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি এত বেশি কমেছে যে, দেশের খাদ্য উত্পাদন নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অথচ এর আগের অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই প্রান্তিকে দেশের কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ০৭ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কৃষির প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অর্থাত্ প্রতি বছরই ধারাবাহিকভাবে দেশের কৃষি খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমছে। ফলে খাদ্যপণ্যের আমদানি নির্ভরতা আরো বাড়ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানাচ্ছে, বাংলাদেশে মোট ৯ কোটি ৩৩ লাখ টন কৃষিজাত দ্রব্য উত্পাদিত হচ্ছে আর ১ কোটি ২৫ লাখ টন খাদ্য আমদানি করছে। ভোজ্য তেলের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। ২০২০ সাল পর্যন্ত খাদ্যের মোট চাহিদার ৯ দশমিক ৩ শতাংশ আমদানি করা হতো, ২০২২ সালে খাদ্য আমদানি চাহিদার ১১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছে গেছে। জনগণের মাথাপিছু জিএনআই বাড়ার কারণে বাজার থেকে খাদ্য কেনার সক্ষমতা এই তিন বছরে বেড়েছে, তেমনি দেশের খাদ্য আমদানির আর্থিক সক্ষমতাও বেড়েছে। গম, ভোজ্য তেল ও গুঁড়া দুধ আমদানির জন্য সর্বোচ্চ ব্যয় হয়। মসলাপাতি, ডাল ও ফল আমদানি বাংলাদেশে সাধারণ চিত্র, গম উত্পাদন বেশি বাড়ানোর সুযোগ নেই বিধায় ৫৫ থেকে ৬০ লাখ টন গম আমদানি করতে হচ্ছে প্রতি বছর। এক সময় সরিষা উত্পাদনে  স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও বর্তমানে এই ধারা রক্ষা করা যায়নি উচ্চফলনশীল বোরো ধান চাষের কারণে।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের কৃষকরা উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য উত্পাদন করলেও নিজের জন্য অনেক সময় কিছুই রাখেন না। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উত্পাদিত ফসল মাঠেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে, কৃষক যে খাদ্য ফলান, একটি পর্যায়ে গিয়ে সে খাদ্যই বেশি দামে কিনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে তাদের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা সবচেয়ে বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। ওপরের পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান, খাদ্য উত্পাদনকারী কৃষক, কৃষিপ্রধান গ্রাম ও অঞ্চলই এ দেশে সর্বাধিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শিকার। বিষয়টি শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয়; একই সঙ্গে ক্ষোভ এবং হতাশারও। ক্ষোভ এ কারণে, যে কৃষক এত কষ্ট করে খাদ্য উত্পাদন করলেন, তারাই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সর্বাধিক হারে। অথচ স্বাধীনতা-উত্তরকালের অতি নিম্ন প্রবৃদ্ধি হারের দেশ থেকে বাংলাদেশ যে মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হারের দেশে রূপান্তরিত হতে পারল, তা তো মূলত কৃষি খাতে দৃঢ়, ধারাবাহিক ও অতি উচ্চ ধারার প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারার কারণেই। ১৯৭২ সালে দেশে মোট খাদ্য উত্পাদন যেখানে ছিল মাত্র ১০২ লাখ টন, সেখানে ২০২২ সালে দেশে খাদ্য উত্পাদন হয়েছে ৪৮৫ লাখ টন, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ গুণ। খাদ্য উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন তার মোট চাহিদা পূরণের কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অন্য পেশাগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা কৃষির ওপর নির্ভর পরিবারগুলোর চেয়ে অনেক কম। বিশেষ করে যারা শিল্প খাতে কাজ করেন তাদের খাবারের বিপদ সব পেশার মধ্যে সবচেয়ে কম। শিল্পের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের গড় খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ১৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অন্য পেশাগুলোর মধ্যে সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীলদের ২০ দশমিক ২৮৫ শতাংশ, আয় গ্রহণ করে এমন পরিবারের ২০ দশমিক ৬২ শতাংশ। প্রবাসী আয় গ্রহণকারী পরিবারের ২০ দশমিক ০৩ শতাংশ, অন্য পেশার ওপর নির্ভরশীল পরিবারের গড় খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশের গড় খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ২১ দশমিক ৯২ শতাংশ। তবে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ০ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

বাণিজ্যিক কৃষি খামার স্থাপন করেছেন রংপুরের এক কৃষক। এ কৃষকের মতে, কৃষকের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কয়েকটি কারণ আছে। আর্থিক অসচ্ছলতা ও নিজের খাদ্য মজুদের জায়গা না থাকায় উৎপাদিত ফসল মাঠেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। সিন্ডিকেট ও ফড়িয়ারা তাদের এসব পণ্য মাঠে থাকতেই কিনে নেয়। ফলে কৃষকের যখন খাবারের প্রয়োজন হয়, তখন তাকে অন্যের কাছ থেকে অনেক বেশি দামে কিনে খেতে হয়। কৃষকরা যেহেতু অল্প আয়ের মানুষ, তাদের খাদ্য কেনার সক্ষমতাও কম। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার এটি একটি বড় কারণ।

অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা নিজের খাবারের জন্য যা রাখেন সেগুলো খুবই সামান্য, অপুষ্টিকর। কাজেই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা তাদেরই বেশি হবে। কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানুষের আয় কম। সে হিসেবে তারা মাছ-মাংস কিনে খেতে পারেন না। তারা যে সব শাকসবজি খায় সেগুলো একেবারেই নিম্নমানের, সব বিক্রি করার পর যা থাকে। এটি তো স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তারা খাদ্য সরবরাহ করলেও পুষ্টি নিয়ে তাদের শিক্ষা কম। সেজন্য তাদের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বেশি।

বাংলাদেশে ফসল সংগ্রহের পর বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ৩০ শতাংশ ফসল ও খাদ্য নষ্ট এবং অপচয় হয়। খাদ্য নষ্ট ও অপচয় কমাতে পারলে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হবে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ৩৭তম এশিয়া ও প্যাসিফিক আঞ্চলিক সম্মেলনে এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়।

লেখক: গবেষক ও অর্থনীতিবিদ

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন