বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা: উদ্বেগ ও করণীয়

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৫:১৫

বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশের বাস এশিয়ায়। তবে বিপুলসংখ্যক মানুষ এই মহাদেশে বসবাস করলেও সেই অনুপাতে নেই আবাদযোগ্য জমি। এশিয়ায় যে পরিমাণ আবাদযোগ্য জমি রয়েছে, তা বিশ্বের মোট আবাদযোগ্য জমির তিন ভাগের এক ভাগ মাত্র। এর পরও বিশ্বের অনেক দেশে খাদ্য রপ্তানি হয় এশিয়া থেকে। আর এর মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় এশিয়া গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ পল টেং। এ নিয়ে বিভিন্ন অনুসন্ধানও চালিয়ে আসছেন তিনি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে যেসব চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে এবং খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এশিয়া কিংবা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে কী ধরনের সুফল ও সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে, তা-ও অনুসন্ধান করে চলেছেন টেং।

খাদ্য নিরাপত্তায় বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে ২০১৩ সালে টেং সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় কৃষি উত্পাদন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। কমছে মোট দেশজ উত্পাদনও। ২০২১ সালে চালানো সমীক্ষায়ও তিনি অনুরূপ দাবি করেন। এরপর ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর টেং এক সমীক্ষায় তুলে ধরেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক প্রভাব বয়ে আনবে। টেংয়ের এসব ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবতা বর্তমানে আমরা অনুধাবন করছি।

মনে রাখতে হবে, এশিয়া মহাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার। এই অঞ্চলের অনেক দেশ বিরূপ জলবায়ু অভিঘাতে অতিমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত। যদিও বড় অর্থনীতির কয়েকটা দেশ রয়েছে এই অঞ্চলে। তবে ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঙ্গে সংগতি রেখে এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তা প্রভাবিত করে থাকে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকেও।

এই মহাদেশ অসংখ্য কৃষিপণ্যের প্রধান উত্পাদক বটে। চীন ও ভারতের মতো দেশগুলো বিশ্বব্যাপী বৃহত্তম কৃষি উত্পাদক হিসেবে পরিগণিত। এসব দেশের কৃষিপণ্য উত্পাদন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক খাদ্যবাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ কথাও সত্য, এশিয়ায় জনসংখ্যার চাপ যেভাবে বেড়েছে বিগত দশকগুলোতে, তাতে অভ্যন্তরীণভাবে প্রচুর খাদ্যের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী খাদ্য আমদানি-রপ্তানি প্রভাবিত হচ্ছে স্বাভাবিকভাবেই। অর্থাত্, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে এশিয়া ‘গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠছে।

এশিয়ার কিছু অংশ উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। পানির ঘাটতি ও ভূমির অবক্ষয় প্রকটতর হয়ে উঠছে অনেক অঞ্চলে। এতে করে কৃষির উত্পাদনশীলতা প্রভাবিত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। প্রাকৃতিক নিয়ামকের পাশাপাশি এশিয়ার কিছু দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও বিদ্যমান। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ায় সেসব দেশের হাত ধরে খাদ্য উত্পাদন ও বিতরণ ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা দরকার, বাণিজ্যনীতি এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব খাদ্যের জোগান ও মূল্যকে প্রভাবিত করে। এর ফলেও খাদ্য নিরাপত্তায় বিপর্যয় দেখা দেওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়।

এই যখন অবস্থা, তখন এশিয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে টেকসই কার্যক্রম বাড়ানো দরকার। স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বজায় রাখার ব্যাপারকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এরপর ভাবতে হবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের মতো বিষয় নিয়ে।

যেহেতু এশিয়া নগরায়ণ ও খাদ্যের চাহিদার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এ কারণে খাদ্য সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখার ব্যবস্থা করা না গেলে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে না। বরং খাদ্যের দাম বেড়ে যাবে হু হু করে। এক্ষেত্রে চিন্তার আরো কারণ হচ্ছে ‘জলবায়ু পরিবর্তন’। খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনকেই সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা।

খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এশিয়ার প্রায় ৪০ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশ মারাত্মকভাবে পানির ঘাটতিতে পড়বে। ঐ গবেষণায় বলা হয়, নগরাঞ্চল দখল ও ভূমি ক্ষয়ের মতো বিষয় এই অঞ্চলে কৃষিজমি ব্যাপকভাবে হ্রাস করে তুলবে। এর ফলে কৃষির উত্পাদনশীলতা ক্রমবর্ধমানভাবে জটিল হয়ে উঠবে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরো কঠিনতর হবে।

সত্যি বলতে, এশিয়ায় খাদ্য নিরাপত্তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নতুন কোনো হুমকি নয়। বরং বলা যায়, এই অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে অচিরেই। এরূপ অবস্থা থেকে উত্তরণে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তা-ই আসল কথা।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার ঐ গবেষণায় এ নিয়ে বলা হয়েছে, এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। আগামী দিনগুলোতে এ মহাদেশে ফসলের উত্পাদনশীলতায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করবে মূলত এ দুই বিষয়—দাবদাহ ও বৃষ্টিহীনতা। এর ফলস্বরূপ খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নে এশিয়ার দেশগুলোকে তো বটেই, বিভিন্ন কৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন পড়বে এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল দেশ ও অঞ্চলগুলোকেও।

প্রশ্ন হলো, খাদ্য নিরাপত্তায় শুষ্ক আবহাওয়ায় কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে উপকার পাওয়া যাবে? এক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। ড্রিপ সেচ ও বর্জ্য পানি পুনর্ব্যবহারের মতো কৌশলগুলো এক্ষেত্রে কাজে দিতে পারে।

খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে সব সময়ই খাদ্য আমদানির উত্সকে বৈচিত্র্যময় করার কথা বলা হয়। এর সহজ অর্থ হলো, কেবল একটা দেশ বা অঞ্চল থেকে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। বরং একাধিক অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এতে করে খাদ্যের মূল্যে যেমন বৈচিত্র্য আসবে, তেমনিভাবে সরবরাহ হয়ে উঠবে স্থিতিশীল। এশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং স্থানীয় কৃষিক্ষেত্রে নানাবিধ বিঘ্নতার প্রেক্ষাপটে এটা অনেক বেশি কাজে দেবে।

বর্তমানে কৃষি গবেষণাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এশিয়া অঞ্চলের জন্য কৃষি গবেষণা অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। বস্তুত, কৃষির বিকাশে গবেষণায় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা আজকের দিনে অনেক বেশি। এশিয়া অঞ্চলে জলবায়ু যেভাবে আগ্রাসি হয়ে উঠছে দিনকে দিন, সেই অবস্থায় গবেষণা করে বের করতে হবে যে, তীব্র তাপ ও খরা প্রতিরোধী কী কী ফসল এই অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তায় সহায়ক হবে। এর পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ অবকাঠামো উন্নত করার বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। বাড়িয়ে তুলতে হবে খাদ্য ব্যবস্থাপনার দক্ষতা।

বৃহত্তর খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে যেসব দেশ ও অঞ্চল কাজ করছে, তাদের সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে উত্সাহ জোগানো দরকার। কৃষি প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ করার মধ্য দিয়ে এটা সম্ভব হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার অনেক দেশে শুষ্ক জলবায়ু ও পানির ঘাটতির কারণে কৃষিকাজ সীমিত হয়ে পড়েছে। এ কারণে খাদ্য আমদানির ওপর তাদের ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। এসব অঞ্চলের অনেক দেশ যেহেতু এশিয়ার খাদ্য সরবরাহের ওপর অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরতাশীল, তাই ঐ সব অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও এশিয়া মহাদেশের খাদ্য উত্পাদন ও রফতানির দিকে নজর দেওয়া অত্যাবশ্যক। আর এ কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে এশিয়ায় টেকসই ও স্থিতিশীল কৃষি অনুশীলন গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

আরব নিউজ থেকে অনুবাদ: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন