বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

স্বাধীনতা এক দুর্লভ জিয়নকাঠি

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৪, ০৫:৩০

মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীন। প্রকৃতি তাকে সে স্বাধীনতা দিয়েই পাঠায়। যে শিশু ধনীর ঘরে বড় হয় কিংবা যে শিশুটি ভাঙা ঘরে বড় হয়, তাদের দুই জনের জন্য একই চাঁদের আলো। দিনের বেলায় এক সূর্য আর সে একই বাতাস। এর নাম অবাধ স্বাধীনতা। মানুষ যে স্বাধীনতা চায় এবং না পেলে বিদ্রোহ করে, এটাও চিরন্তন। আমাদের সমাজে স্বাধীনতা বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের ঝামেলা আছে। সেটি বুঝতে হলে শিশুকাল থেকে বড় হয়ে ওঠার কথা বুঝতে হবে। ঐ যে বললাম, মাতৃগর্ভে ও শিশুকালে নিষ্পাপ স্বাধীনতা, তার রকমফের শুরু হয় বড় হতে হতে।

সংসার বা পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার ওপর বদলে যেতে থাকে স্বাধীনতা। ধনী পরিবারের সন্তান আর মধ্যবিত্ত বা গরিবের সন্তানের জন্য জামাকাপড়, খাবার; এমন কি স্কুল-পাঠশালাও আলাদা হতে শুরু করে। একদিকে বিত্তের স্বাধীনতা, অন্যদিকে টানাপোড়েনের স্বাধীনতা। এ যুদ্ধে বেশির ভাগই ধনীরা জয়ী হয়। যে দুই-এক জন ব্যতিক্রম কিংবা অন্যদিক থেকে উঠে আসে, তাদের নিয়ে আমরা গল্প বলি, কবিতা লিখি; ইদানীং সামাজিক মিডিয়ায় আলোড়ন তুলি। বাস্তবে পরাধীনতার মূল শৃঙ্খল পরিয়ে দেয় অর্থনীতি।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জিত হয় ১৯৭১ সালে। জনক বঙ্গবন্ধুর ডাকে ৭ মার্চের পরই নির্ধারিত হয়ে যায় যে, আমরা আর পাকিস্তানের সঙ্গে থাকব না। ২৬ মার্চ সে ঘোষণা আমাদের স্বাধীনতা দিবসের ভিত্তি। মনে রাখা দরকার, যুদ্ধটির নাম ছিল মুক্তিযুদ্ধ, যার অর্থ কেবল ভৌগোলিক নয়, জাতি অর্থনৈতিক, সামাজিক  ও সাংস্কৃতিক মুক্তিও কামনা করেছিল। তা না হলে রবীন্দ্রনাথ ফিরতেন না। নজরুল হয়ে উঠতেন না আমাদের জাতীয় কবি। এই সব মুক্তির প্রশ্নে আমাদের স্বাধীনতা আজ কোথায় দাঁড়িয়ে?

এটা সবাই মানি, বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অর্জন ও উন্নয়ন চোখ ধাঁধানো। দেশের বাইরে টাকাপয়সা আর লবিং বাণিজ্যে নিযুক্ত এক দল বায়বীয় প্রচারক যত চেষ্টাই করুক না কেন, তারা বাংলাদেশের অর্জন ঠেকাতে পারেনি। এই যে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা, এ-ও একধরনের স্বাধীনতা। দীর্ঘ মেয়াদের দেশশাসনে থাকা শেখ হাসিনার সরকার সে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারছে বলেই ব্রিটিশ আমলের পর কক্সবাজারে রেলপথ তৈরি হয়েছে। উড়ালসেতু ও মেট্রোরেলে যানবাহনের সুফল ভোগ করছেন জনগণ। মানুষকে এই স্বাধীনতা উপহার দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার কথা বলছিলাম। আমার ধারণা, এই দুই জায়গায় আমাদের স্বাধীনতা অর্থবোধক হয়ে উঠতে পারছে না। সামাজিক স্বাধীনতা বলতে আমরা বুঝি সমাজে সবার সমান অধিকার, আইনের শাসন, জাতি ও নৃগোষ্ঠীর সমতা। বাংলাদেশের জনগণ খুব বেশি সমস্যায় আছেন, এমনটি মনে হয় না কিন্তু ক্রমাগতভাবে সাম্য ও সহাবস্থানের ওপর চাপ বাড়ছে। ধর্মের নামে আচরণের নামে, সংস্কারের নামে একসঙ্গে মিলেমিশে থাকার স্বাধীনতা হরণ করা হচ্ছে; যে কারণে প্রায়ই আমরা নেগেটিভ খবরে আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। কথা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজ পাকিস্তানের মতো হবে না। পাকিস্তানের স্বাধীনতা তাদের মতো। তারা কী করবে কী চাইবে সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু ক্রমাগত উগ্রতা ও লড়াই করার স্বাধীনতা পাকিস্তানকে আজ বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়া এই দেশ যে এককালে কতটা এগিয়ে ছিল, সেটা ভাবাও এখন স্বপ্নের মতো।  ফলে স্বাধীনতার সবটাই খালি ভোগ আর সমাজে একক কর্তৃত্ব বিস্তার করা নয়। আমাদের দেশ তার সবকটি সূচকে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে; এটা আমাদের স্বাধীনতার সুফল। কিন্তু আমাদের সমাজ এখনো পাকিস্তানের কায়দায় চলার জন্য আকুলিবিকুলি করে; যার প্রমাণ আমরা খেলাধুলা থেকে বাণিজ্য বা বিনোদন—সবকিছুতে দেখতে পাই।

এই ইচ্ছের লালন বা প্রসারকে আমরা স্বাধীনতা বলতে পারি না। ঠিক একই ভাবে ভারত বা অন্য কোনো দেশ কিংবা তাদের সামাজিক বা অর্থনৈতিক আগ্রসনের নামও স্বাধীনতা হতে পারে না। এ কারণেই স্বাধীনতার বড় স্তম্ভের নাম অর্থনীতি। আমাদের দেশে,  বিশেষ করে আর্থিক খাতে এখন আর কোটি টাকার কোনো গল্প নেই। যে মানুষটি দারোয়ান বা ড্রাইভারের কাজ করেন, তিনিও নাকি কয়েক শ বা হাজার কোটি টাকা লোপাট করেন। টাকা থাকা, ধনী হওয়া গর্বের ব্যাপার। কিন্তু চুরি-ডাকাতি করে বড়লোক হওয়ার এই অপচেষ্টা স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণে স্বাধীনতার অবস্থা নাজুক। আমি যত দেশে ঘুরে বেড়িয়েছি, তাদের মধ্যে তারাই শক্তিশালী, যাদের স্বতন্ত্র নিজস্ব স্বাধীন সংস্কৃতি আছে। ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর সর্ববৃহত্ মুসলিমপ্রধান দেশ। সে দেশে জটায়ু পাখির মূর্তি দেখবেন রাস্তায়। তাদের এয়ারলাইনসের নাম গরুড়া। আপনি রামায়ণ পড়লে বা জানলে নিশ্চয়ই জানেন এ দুই পাখির ভূমিকা কী ছিল? এক জন সীতাকে রাবণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করে রক্তাক্ত হয়ে পড়েছিল; আর এক জন ছিল বাহক। অথচ এ দুই পাখির মূর্তি বা ভাস্কর্য স্থাপন এবং রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইনসের নাম এর নামে হওয়াটা ইন্দোনেশিয়ানদের স্বাধীনতাকে বিপন্ন করেনি; করেনি প্রশ্নবোধক। তাদের নাম-গান-বাজনা, এমনকি খাদ্যেও ভারতীয় প্রভাব। তাতেও স্বাধীনতা গেল গেল বলে কেউ হামলে পড়েনি; যেমনটা আপনি দেখবেন মালয়েশিয়ায়।

সংস্কৃতি কেন বিপন্ন মনে হচ্ছে? যে সমাজে পাড়ায় পাড়ায় গলি-মহল্লায় বাড়িতে বাড়িতে সন্ধ্যা নামলেই হারমোনিয়াম বেজে উঠত, যে সমাজে ক্লাব বা পাড়ার সংগঠনগুলোর দায়িত্ব ছিল বছরে একটা নাটক দুটো গানের অনুষ্ঠান আয়োজন করা, আজ সে স্বাধীনতা হরণ হয়ে গেছে। কে করেছে, কারা করেছে, সে কথা সবাই জানেন। সেটা যতটা মুখ্য, তারচেয়ে বড় ব্যাপার, সমাজ আজ গান-বাজনা, উদার পোশাক, এমন কি খাবারের বেলায়ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সংকুচিত হয়ে আসছে সংস্কৃতির পরিধি। সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে একটি-দুটি জনগোষ্ঠীর ভেতর। এটি আমাদের স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থি।

স্বাধীনতা অর্জনের ৫৩ বছর পর কোনো দেশের পরিবেশ বা চেহারা অবিকল আগের মতো থাকে না। জাতির পোশাক, খাবার, আচরণ, সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, সব দেশের কতগুলো মৌলিক বিষয় থাকে, যেগুলো তার চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের সেসব মৌল বিষয়ের ভেতর ছিল গণতন্ত্র, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতা। মজার ব্যাপার, এই যারা গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে মুখে ফেনা তোলে, সেই বিরোধী মানুষজন এক ফোঁটা গণতন্ত্র মানে না। ঘরে বাইরে দেশ ও প্রগতিশীলতাবিরোধী আচরণের নাম গণতন্ত্র? অন্যদিকে সমাজ এখন আর অসাম্প্রদায়িকতা বা সাম্যে আস্থা রাখে বলে মনে হয় না।

তারপরও স্বাধীনতা আমাদের পরম ধন। আমাদের দেশটি রক্তে অর্জিত এক মূল্যবান ভূখণ্ড। এর নেতৃত্বে আছেন জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা। তার কাছে স্বাধীনতা  অবশ্যই নিরাপদে থাকবে। এটাই আমাদের চাওয়া। বাংলাদেশের জনগণ ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাধীনতার অর্থবহ মূল্যবান বিষয় তাদের জীবন ও অধিকার। এই মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্যই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমাদের এই দেশটি হবে সবার। স্বাধীনতা সবার হয়ে উঠুক। পরাধীন দেশগুলোর দিকে তাকালেই বুঝবেন, স্বাধীনতা এক দুর্লভ জিয়নকাঠি, যা মৃত জাতিকেও জাগিয়ে তোলে, তুলতে পারে।

লেখক :সিডনি প্রবাসী কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন