মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

হাজারো পুকুর খনন, ১৩ বছরে ফসলি জমি কমেছে ১৫১০ হেক্টর 

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৪, ১৩:৪৫

বিলের তলানি থেকে পাকা সড়কের ধার। কোনো জমিই বাদ যায়নি রাক্ষুসে মাটি খাদকদের হাত থেকে। বিলের এসব তিন ফসলি জমি নির্বিচারে কেটে পুকুর বানানো হয়েছে। হাঁড়িভাঙ্গা, কুমারখালী, চাকলের বিলের যতদূর চোখ যায় একটার পর একটা পুকুর।

এভাবে পুকুর খননের ফলে গত ১৩ বছরে গুরুদাসপুর উপজেলায় ফসলি জমি কমেছে ১ হাজার ৫১০ হেক্টর। কৃষি অফিসের তথ্যমতে, কমে যাওয়া জমিতে রবি শষ্য থেকে শুরু করে বছরজুড়েই ফসল উৎপন্ন হতো। বিশেষ করে বিয়াঘাটের হাঁড়িভাঙ্গ আর ধারাবারিষার চাকলের বিলে ধানের বাম্পার ফলন হতো। 

স্থানীয়রদের অভিযোগ, রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকে এবং নেতা-কর্মীদের নাম ভাঙিয়ে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সিন্ডিকেট চক্র প্রায় এক দশক ধরে কৃষকের জমি লিজ নিয়ে পুকুর খনন করছিলন। তবে পুকুর খনন বন্ধে সোচ্চার হয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সিদ্দকুর রহমান পাটোয়ারী। অভিযান চালিয়ে কারাদণ্ডের পাশাপাশি জরিমানা করছে প্রশাসন।  
 
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এক দশক আগেও ৩১২ একর আয়তনের হাঁড়িভাঙ্গা বিলে বোরো ৫২০ মেট্রিকটন, রোপা আমন ১১২ মেট্রিকটন ও ১৭৫ মেট্রিকটন বোনা আমনের আবাদ হতো। বর্ষাকালে বিলটি তলিয়ে গেলেও সেখানে বোনা আমনের আবাদ হয়। সেই বিলে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠেছে কয়েক শ পুকুর।

জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা ২০০১-এর গেজেটে বলা হয়েছে, কৃষি জমি যতটুকু সম্ভব কৃষি কাজে ব্যবহার করতে হবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কৃষিজমির প্রকৃতিগত কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। অথচ আইনের তোয়াক্কা না করে হাঁড়িভাঙ্গা বিল ছাড়াও চাপিলার কয়েকটি বিল, চাকলের বিল, ধারাবারিষার বিল, হাঁসমারি, মশিন্দা বিলসহ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের সব বিলেই কম বেশি পুকুর খনন করে আবাদি জমি নষ্ট করা হয়েছে।

গুরুদাসপুর কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালে গুরুদাসপুরে ফসলি জমির পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৬০৯ হেক্টর। এই জমির চলতি বছরে এসে দাঁড়িয়ে ১৫ হাজার হেক্টরে। অর্থাৎ ২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পুকুর খননের কারণে উপজেলাজুড়ে ১ হাজার ৫১০ হেক্টর ফসলি জমি পুকুর হয়েছে। তথ্যমতে, ১১ সালে ফসলি জমি কমেছে ৭০ হেক্টর, ২০১২ সালে কমেছে ৮০ হেক্টর, ২০১৩ সালে কমেছে ৯৫, ২০১৪ সালে কমেছে ১০৫, ২০১৫ সালে কমেছে ১২০, ২০১৬ সালে কমেছে ১৩০, ২০১৭ সালে কমেছে ১১৫ হেক্টর এবং ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪১০ হেক্টর ফসলি জমি কমেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. হারুনর রশিদ ইত্তেফাককে জানান, এভাবে ফসলি জমি নষ্ট করে পুকুর খনন করায় মারাত্মক ফসল হানি হচ্ছে। নিয়মনীতি উপেক্ষা করে নির্বিচারে পুকুর খনন করায় প্রতি বছরই আশঙ্কাজনক হারে কমছে ফসলি জমি।

হাঁড়িভাঙ্গা বিলের প্রান্তিক চাষি মকলেছুর, চাকলের বিলের কৃষক গফুর মিয়াসহ বিভিন্ন বিলের ওপর নির্ভরশীল অনন্ত ২০ জন কৃষক অভিযোগ করেন, পুকুর পাড়গুলো উঁচু হওয়ায় বর্ষায় বিলে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে সাধারণ কৃষকরা বছরজুড়েই চাষাবাদের ক্ষেতে ব্যপক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।

এদিকে ফসলি জমিতে পুকুর খনন রোধে সোমবার দুপুরে মতবিনিময় সভা করেছে গুরুদাসপুর উপজেলা প্রশাসন। এ সময় সংসদ সদস্য সিদ্দিকুর রহমান বলেন, চলনবিল অধ্যুষিত গুরুদাসপুর এলাকার মাটি পলি মিশ্রিত উর্বর। এই মাটিতে সব ধরণের ফসল উৎপাদন করা সম্ভব। সেই মাটিতে পুকুর খনন করতে দেওয়া হবে না।

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ছালমা আক্তার ইত্তেফাককে বলেন, গুরুদাসপুর, তাড়াশ, চাটমোহর, বড়াইগ্রাম এবং সিংড়া উপজেলা চলনবিলের পেটে গড়ে উঠেছে। বিলে পুকুর খনন করায় ফসলি জমি কমে যাওয়ার পাশাপাশি মারাত্মকভাবে চলনবিলের সৌন্দর্য্য হানি হচ্ছে। এ কারণে বন্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছেন তিনি।

ইত্তেফাক/পিও