মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

আবাসন ও শিল্পকারখানায় হারিয়ে গেছে ভালুকার ৬০ ভাগ জলাশয়

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৪, ০৬:০৪

ভালুকায় প্রতি বছর বাড়ছে নতুন নতুন শিল্পকারখানা। বাড়ছে শ্রমিক ও জনসাধারণের বসতঘরের প্রয়োজনীয়তা। বসতঘর ও শিল্প কারখানা নির্মাণে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে দেদারসে জলাশয় ভরাট করায় অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে এই উপজেলার প্রায় ১৫ লক্ষাধিক বাসিন্দা। পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।

সরজমিনে পৌরসদর ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পৌরসদরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরা বিল ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণের বিলার প্রায় তিন একর জলাশয় ভরাট করে প্লট আকারে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিয়েছে নকুল মন্ডল। পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের উনছিলা বিলের ৪০ ভাগ জলাশয় ইতিমধ্যে ভরাট করেছে মেগা ফিশারিজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। অপরদিকে ভালুকা-মল্লিকবাড়ি সড়কের দক্ষিণ পাশে ভায়াবহ মৌজার ধাম্মাকুঁড়ি বিলের দুই একর জলাশয় ঢাকার জনৈক শিল্পপতির স্থানীয় প্রতিনিধি উপজেলার ভায়াবহ গ্রামের সাইফুল তালুকদার, নজরুল ইসলাম পাঠান ও নিজাম উদ্দিনের নেতৃত্বে জলাশয় ভরাটের কাজ চলছে।

পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের পারবাইল বিল ভরাট করছে একই এলাকার সাইফুল হুদা সোহাগ নামে এক ব্যক্তি। অপরদিকে একই ওয়ার্ডের ভান্ডাব মোল্লাপাড়া এলাকার আন্ধাবিল ভরাট করছেন হোসাইন মোহাম্মদ রাজিব ও ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ পারভেজ। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২৫টির মতো ব্যক্তি মালিকাধীন জলাশয় ভরাটের কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। কোথাও দিনের আলোতে, কোথাও রাতের আঁধারে। ইতিমধ্যে পৌরসদরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পানি নিষ্কাশনের ২৯টি সরকারি খালের অধিকাংশই জবরদখলের মাধ্যমে ভরাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের জলাভূমি রয়েছে, তার মধ্যে প্লাবন ভূমি, নিচু জলা, বিল, হাওর-বাঁওড়, জলমগ্ন এলাকা, উন্মুক্ত জলাশয়, নদী তীরের কাদাময় জলা, জোয়ার ভাটার প্লাবিত নিচু ও সমতল ভূমি।

ভালুকা উপজেলায় গত ২০ বছরে আবাসন ও শিল্প কারখানার কারণে ৬০ শতাংশ জলাশয় ইতিমধ্যে ভরাট হয়ে গিয়েছে। এতে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ভারসাম্য ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি পৌরসদরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানি নিষ্কাষণের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

ময়মনসিংহ জজকোটের আইনজীবী ভালুকা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট রাখাল চন্দ্র সরকার বলেন, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ অনুযায়ী কোনো পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ইত্যাদি ভরাট করা বেআইনি। আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গায় শ্রেণি পরিবর্তন বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি। কোনো ব্যক্তি এই বিধান লঙ্ঘন করলে আইনের ৮ ও ১২ ধারা অনুযায়ী ৫ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (২০১০ সালে সংশোধিত) ৫ অনুযায়ী যে কোনো ধরনের জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর ভালুকা আঞ্চলিক শাখার সদস্য সচিব সাংবাদিক কামরুল হাসান পাঠান জানান, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ অনুযায়ী পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ইত্যাদি ভরাট করা বেআইনি। জলাশয় ভরাটে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও ভারসাম্য ব্যাহত হচ্ছে। অতি দ্রুত এ ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

উপজেলার ভায়াবহ গ্রামের ধাম্মাকুঁড়ি বিল ভরাটকারী সাইফুল তালুকদার জানান, আমাদের প্রয়োজনে নিজস্ব সম্পত্তিতে মাটি ভরাটের কাজ করছি। এখানে জমির শ্রেণি পরিবর্তন বা আইনের ব্যত্যয় ঘটল কীভাবে।

ভালুকা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের পারবাইল বিল ভরাটকারী সাইফুল হুদা সোহাগ জানান, এটি আমাদের নিজস্ব সম্পত্তি। ইতিপূর্বে এই বিলে মত্স্য চাষ করতাম। পৌর কর্তৃপক্ষ নোটিশ দিয়েছে পৌরসভার ভিতরে কোনো মাছের প্রজেক্ট রাখা যাবে না। তাই মাটি ভরাট করছি অন্য কিছু করার জন্য। একই রকম বক্তব্য অন্য ভরাটকারীদেরও। কেউ কেউ আবার সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন। ভালুকা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আলীনূর খান জানান, খোঁজ নিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম