মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

রপ্তানির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৪, ০৬:৪০

যে কোনো দেশের অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষ করে পণ্য ও সেবা রপ্তানি খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উত্স হচ্ছে পণ্য রপ্তানি খাত। বাংলাদেশের মতো দ্রুত বিকাশমান একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য বেশ সম্ভাবনাময়। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে আমরা এখনো পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হচ্ছি না। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য সামান্য কিছুসংখ্যক পণ্য এবং গন্তব্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বাণিজ্য এখন কার্যত তৈরি পোশাকনির্ভর হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই আসছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ খাত থেকে প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তার অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামালসহ বিভিন্ন উপকরণ আমদানিতে পুনরায় বিদেশে চলে যায়। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে কম। আমরা যদি তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য উপকরণ স্থানীয়ভাবে জোগান দিতে পারতাম, তাহলে জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের মূল্য সংযোজন তথা অবদান আরো অনেক বৃদ্ধি পেত।

বাংলাদেশে এমন অনেক অপ্রচলিত পণ্য আছে বিশ্ববাজারে যার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে এসব পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় অনেক গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের কথা অনেক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছে কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের সাফল্যের হার খুব একটা বেশি নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান এখন অনেকটাই কমে গেছে। বাংলাদেশ কার্যত একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কিন্তু কৃষি খাতের সেই অপার সম্ভাবনাকে আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য তালিকায় কৃষিজাত পণ্যের উপস্থিতি খুবই সামান্য। অথচ রপ্তানি বাণিজ্যে কৃষিজাত পণ্যের উপস্থিতি বাড়ানো গেলে রপ্তানি আয় বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।

বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের একটি বড় সুবিধা হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশকে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) প্রদান করে থাকে। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশে ব্যাপক হারে পণ্য রপ্তানি করতে পারছে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরো তিন বছর অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে জিএসপি প্রদান করবে। তারপর এই সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা ২০৩২ সাল পর্যন্ত জিএসপি চেয়েছিলাম। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাতে সম্মত হয়নি। ২০২৯ সালের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন উন্নয়নশীল দেশের জন্য জিএসপি+ নামে নতুন একধরনের শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা প্রদান করবে। আমাদের জেএসপি+ পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালাতে হবে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্য দূত প্রেরণ করে। বিভিন্ন দূতাবাসে ইকোনমিক মিনিস্টার প্রেরণ করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কাজ করে থাকে। কিন্তু এদের কাজের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। যিনি ট্রেডের জন্য যান তাকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো একটি টার্গেট (লক্ষ্যমাত্রা) নির্ধারণ করে দেয়। এই লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে তারা কখনোই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করে না। তারা কীসের ভিত্তিতে এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানে না। এখানে যথেষ্ট কাজ করার সুযোগ রয়েছে। যদি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পূর্বালোচনা করতেন, তাহলে ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব হতো। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এখানে বড় ধরনের গ্যাপ রয়েছে, যা নিরসন করা একান্তই প্রয়োজন। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে বিভিন্ন বিভাগ বা উইং আছে। তারা যার যার মতো কাজ করে। সঠিক সমন্বয় এদের মধ্যে নেই। যদি সরকারের উদ্দেশ্য হয় বাণিজ্য বাড়ানো, তাহলে শুধু বর্তমানে যা রপ্তানি হচ্ছে তা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। আমাদের দেখতে সংশ্লিষ্ট দেশের ভোক্তাদের চাহিদা কী বা কেমন এবং তা কীভাবে পূরণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে তুলনামূলক প্রতিযোগিতা মূল্যে কীভাবে পণ্যটি সরবরাহ করা যায়, তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। প্রতিযোগী দেশগুলোর কথা বিবেচনায় রেখেই আমাদের রপ্তানি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আয়রন উৎপাদন করে থাকে। একই সঙ্গে তারা বিপুল পরিমাণ আয়রন প্রতি বছর আমদানি করে থাকে। আমি সেক্রেটারি অব স্টেটকে বলেছি, আমি তোমাকে আয়রন দেব। তুমি আয়রন উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল এবং ইনডেন্ট পাঠাবে—আমি সেই মোতাবেক আয়রন উত্পাদন করে তোমাকে দেব। তারা তাদের কোনো কোম্পানিকে আয়রন নির্মিত যন্ত্রপাতি উত্পাদনের জন্য আদেশ দেয়। কোম্পানিটি সেই আয়রন সামগ্রী তৈরির জন্য ভারতীয় বা চীনের কোনো কোম্পানিকে অনুরোধ করে। তারা তুলনামূলক সস্তা মূল্যে পণ্যটি তৈরি এবং সরবরাহ করে। ঠিক একইভাবে আমরা ওষুধ জাতীয় পণ্য রপ্তানি বাড়াতে পারি। আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ অত্যন্ত উচ্চ মূল্যে বিক্রি করা হয়। অনেক সময় রোগীরা ওষুধ ক্রয় করতে পারেন না। বাংলাদেশে  তুলনামূলক কম খরচে ওষুধ উৎপাদন ও রপ্তানি করা সম্ভব।

বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসে যে ট্রেড কাউন্সিলর থাকেন সংশ্লিষ্ট দেশের পণ্য চাহিদা এবং রপ্তানি সম্ভাবনা যাচাই করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের আরো দায়িত্বশীল এবং তত্পর  হওয়া উচিত। এখন যে অবস্থায় চলছে তা হচ্ছে তারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদেশে যান। চাকরি করেন। রুটির ওয়ার্কস ব্যতীত বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের তেমন কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যায় না। আমি যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের পক্ষে সৌদি আরবে কাজ করতাম। সেই সময় মার্কিন নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করে রিপাবলিকানরা। ডেমোক্রেটিক সরকারের সব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো। ওখানে এক ভদ্রমহিলা এলেন, তিনি ট্রেড কাউন্সিলর। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পরই আমাকে বললেন, সৌদি সরকারের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আরো বাড়াতে হবে। সেই সময় ইরাক যুদ্ধ চলছিল। সৌদি আরব মার্কিন কোম্পানিগুলোর উত্পাদিত দামি দামি গাড়িগুলো ক্রয় করছে না। এমনকি খাদ্য পণ্যের দোকানে গিয়ে সৌদি মহিলারা মার্কিন পণ্য ক্রয় না করার জন্য ভোক্তাদের অনুরোধ জানাতে থাকে। পরিস্থিতি খুবই খারাপের দিকে চলে যায়। মার্কিন ট্রেড কাউন্সিলর আমার অফিসে এলেন। আমি যে প্রজেক্টটা করতাম, তাতে সৌদি সব কোম্পানির বিভিন্ন ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করা হতো। কীভাবে তারা পণ্য উৎপাদন করে। কোথা থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে এসব তথ্য আমার কাছে সংরক্ষিত থাকত। ট্রেড কাউন্সিলর আমার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট সৌদি কোম্পানিতে যান। তিনি কোম্পানি কর্মকর্তাদের বলেন, তুমি এই পণ্যের কাঁচামাল জার্মানি থেকে আমদানি করছো। তোমরা ইচ্ছে করলে এই কাঁচামাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করতে পারো। আমরা তুলনামূলক কম মূল্যে এই কাঁচামাল জোগান দেব। তিনি বিভিন্ন কোম্পানিতে গিয়ে রীতিমতো এ ব্যাপারে অনুরোধ করতে থাকেন। এই হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের দূতাবাসের ট্রেড কাউন্সিলরগণ এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের কথা চিন্তাও করেন না। তারা বিদেশে যান, নির্দিষ্ট সময় চাকরি করে দেশে ফিরে আসেন। আমি মনে করি, বিদেশে অবস্থিত কোনো কোনো বাংলাদেশি মিশনে ট্রেড কাউন্সিলর হিসেবে ব্যবসায়ীকে পাঠানো হয়, তাহলে ভালো হতো।

বাংলাদেশ যেসব পণ্য রপ্তানি করে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক সম্পূর্ণরূপেই আমদানিকৃত কাঁচামালনির্ভর। আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পে সম্ভাব্য ক্ষেত্রে স্থানীয় কাঁচামালে ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর জন্য কার্যকর ও পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশে তুলা উত্পাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু স্থান স্বল্পতার কারণে আমরা হয়তো বেশি পরিমাণে তুলা উৎপাদন করতে পারব না। কিন্তু তুলার বিকল্প উদ্ভাবন করা যেতে পারে। ইতিমধ্যেই গবেষকগণ তুলার সঙ্গে পাটের মিশ্রণ ঘটিয়ে একধরনের সুতা উৎপাদনের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। এই উদ্যোগকে উৎসাহিত করা যেতে পারে।

লেখক: সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সভাপতি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
অনুলিখন: এম এ খালেক

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন