মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

অর্থনীতি রক্ষায় আবারও আইএমএফ-এর ভরসায় পাকিস্তান

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৪, ১৪:৫১

অর্থনীতি বাঁচাতে আবারও আইএমএফ-এর দীর্ঘমেয়াদী উদ্ধার তহবিলের আশায় পাকিস্তান। খরচ কমানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ এখন শাহবাজ শরীফের নবনির্বাচিত জোট সরকারের সামনে। এক প্রতিবেদনে এমনটি জানিয়েছে জার্মানি সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে।

দীর্ঘ সময় ধরে চরম অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে পাকিস্তান। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, অব্যস্থাপনা, কোভিড মহামারি, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বেড়ে চলা প্রাকৃতিক দুর্যোগ একসঙ্গে অর্থনীতিকে নাজুক করে তুলেছে। এমন অবস্থায় নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ আন্তর্জাতিক মুদ্র্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে আরেক দফা উদ্ধার তহবিল পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। আর সেটি কতটা প্রয়োজনীয় তা বোঝাতে গিয়ে গত সপ্তাহে তিনি বলেছেন, ‘‘আইএমএফ-এর আরেক দফা প্রকল্প ছাড়া আমরা টিকতে পারব না।

তার একদিন আগে ৩০০ কোটি ডলারের আগের প্রতিশ্রুত উদ্ধার তহবিলের শেষ কিস্তির ১১০ কোটি ডলার পাকিস্তানকে দেয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন  আইএমএফ কর্মকর্তারা। এরইমধ্যে সংস্থাটি জানিয়েছে ইসলামাবাদ আবেদন জানালে দেশটির জন্য মধ্য-মেয়াদী একটি ঋণ প্রকল্পের পরিকল্পনা তারা তৈরি করতে পারে। তবে পাকিস্তান সরকার এখনও পরবর্তী উদ্ধার তহবিলের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রত্যাশিত ঋণের পরিমাণ জানায়নি। 

অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে যা দরকার

পাকিস্তানের ২৪ কোটি মানুষের অনেকেই নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছেন দরিদ্র মানুষেরা। ৩০ শতাংশ মূল্যস্ফীতির কারণে একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অনেক বেড়েছে, অন্যদিকে প্রকৃত মজুরি কমে গেছে।

দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঠেকেছে ৮০০ কোটি ডলারে, যা মাত্র দুই মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে পারবে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত নড়বড়ে জোট সরকারের সামনে দেশটির অর্থনীতির পুরাতন কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলার বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

করাচিভিত্তিক ব্রোকারেজ কোম্পানি টপলাইন সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ সোহাইল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সরকার দীর্ঘমেয়াদি আইএমএফ ঋণ পেলে এবং চুক্তির শর্তানুযায়ী কাজ করলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।''

তবে সমস্যা হলো আইএমএফ-এর এ ধরনের তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত হিসেবে সাধারণত সরকারের ব্যয় কমানোর মতো অজনপ্রিয় কর্মসূচি ও অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের বাধ্যবাধকতা থাকে। পাকিস্তানকে এক্ষেত্রে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে দেয়া ভর্তুকি তুলে দেয়া, করের আওতা বৃদ্ধি এবং লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোকে বিক্রি করে দেয়া লাগতে পারে।

এরইমধ্যে সরকার দেশটির খুড়িয়ে চলা জাতীয় পতাকাবাহী বিমান পরিবহণ কোম্পানি পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনকে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির কোনো কোনো অর্থনীতিবিদও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর বেসরকারিকরণের পক্ষে মত দিচ্ছেন। তাদেরই একজন সাফিয়া আফতাব। 

ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘বেসরকারিকরণ করা হলে মানুষ চাকরি হারাবে এমন কথার বিপরীতে যেটা এড়িয়ে যাওয়া হয় তা হলো আমরা সবাই এমনকি দরিদ্র্যরাও বসে থাকা বা লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় শিল্পের জন্য টাকা দিচ্ছি।'' তিনি বলেন, ‘‘আমরা টাকা দিচ্ছি কারণ সরকার তাদের লোকসানের অর্থ বাজেটের মাধ্যমে বরাদ্দ করছে বা ঋণের মাধ্যমে নির্বাহ করছে।''

তিনি মনে করেন এক্ষেত্রে এয়ারলাইনসহ আরো লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারিকরণ করা হলে সরকারের ক্ষতি কমবে। ১৯৯০ সালের দিকে ব্যাংকগুলোকে বেসরকারিকরণের মাধ্যমে সরকার কীভাবে লাভবান হয়েছে সেই উদাহরণ দেন তিনি।

বেসরকারিকরণের নামে সামরিক অলিগোপলি

তবে কর্তৃপক্ষ যে প্রক্রিয়ায় বেসরকারিকরণ করছে তা নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞ ওসামা মালিক মনে করেন, বেসরকারিকরণের ক্ষেত্রে আইএমএফ যে পরামর্শ দেয় আর পাকিস্তানের সরকার যা করে তার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। গত বছর দ্রুত ও সহজ বিনিয়োগের স্বার্থে গঠিত স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কাউন্সিলের উদাহরণ দেন তিনি। পাকিস্তানের সেনা প্রধানকে এর পরিচালনায় যুক্ত করার মাধ্যমে কাউন্সিলটিকে আসলে সেনা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘‘আমরা সম্প্রতি দেখেছি কেন্দ্রীয় সরকারের মালিকানায় থাকা প্রধান বিনোদনকেন্দ্রগুলোকে সামরিক বাহিনীর মালিকানার একটি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ধরনের বেসরকারিকরণ একটি দেশে সামরিক অলিগোপলি তৈরি করতে পারে যেখানে এরইমধ্যে বিভিন্ন কর্পোরেট শিল্পে  সশস্ত্র বাহিনীর বড় শেয়ার রয়েছে।''

অন্যদিকে অর্থনীবিদেরা সতর্ক করে বলেছেন কঠোর সংস্কার কর্মসূচী স্বল্প মেয়াদে সাধারণ মানুষকে আরো কষ্টকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। আমদানি কমালে তা শিল্প খাতে প্রভাব ফেলবে এবং সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচির খরচ কমিয়ে দিলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হ্রাস পাবে। এতে কয়েক বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর গতিতে হলেও তা রাজস্ব ঘাটতি কমানো ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ সাফিয়া আফতাব।

ইত্তেফাক/এএইচপি