সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

যুদ্ধ-বিরতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে?

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৪, ০৩:৩০

সশস্ত্র সংঘাতের ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি এক ‘অনন্য জটিল’ হাতিয়ার। যুদ্ধবিরতিকে এভাবে বিশেষায়িত করার কারণ, এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ-সংঘাত, আইন ও রাজনীতির হিসাবনিকাশে নানা ক্ষেত্রে ছেদ পড়ে। সাধারণত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাশ হলে তা আন্তর্জাতিক আইন হয়ে ওঠে। তবে মুশকিল হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইন ও বাধ্যবাধকতাকে তোয়াক্কা করা হয় না। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সিন্ডি উইটের মতে, ‘যুদ্ধবিরতি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে না। যুদ্ধবিরতির শর্ত পূরণ হয় না ঠিকঠাকভাবে।’ অর্থাত্, আন্তর্জাতিক আইনকে তোয়াক্কা করার প্রশ্নে যুদ্ধবিরতিকে প্রায়ই খাপছাড়া হয়ে উঠতে দেখা যায়। গাজা যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই লক্ষ করা যাচ্ছে।

জাতিসংঘের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ নিরাপত্তা পরিষদে গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বানসংবলিত প্রস্তাব পাশ হয়েছে সম্প্রতি। আমরা দেখেছি, একবার-দুবার নয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজায় অবিলম্বে ইসরাইলি হামলা বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাব তিন তিনবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর মুখে পড়ে। জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে বাতিল হয়ে যায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব। তবে দৃশ্যপট পালটে যায় গত ২৫ মার্চ। গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব তোলা হলে সবাইকে অবাক করে দিয়ে তাতে ভেটো দেওয়া থেকে বিরত থাকে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাশ হয়েছে শেষ পর্যন্ত।

গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাশ হওয়া এক দিকে খুশির খবর বটে, কিন্তু এতটুকুতেই যে সমস্যা শেষ হয়ে গেল, বিষয়টা তেমন নয়। বরং গাজায় যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যত্ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সিন্ডি উইটের কথাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। লক্ষণীয়, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে বিভিন্ন শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন—অবিলম্বে টেকসই ও মানবিক যুদ্ধবিরতি, মানবিক বিরতি, জরুরি মানবিক বিরতি, শত্রুতার টেকসই সমাপ্তি ইত্যাদি। প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হওয়া এসব কথা কি আদৌ তোয়াক্কা করা হবে বা হচ্ছে? বরং এর উলটো চিত্রই দেখা যাচ্ছে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাশের পর। এতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করছে না ইসরাইল। এমনকি এই প্রস্তাবের শর্ত মানবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে তেল আবিব।

এই যখন অবস্থা, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, জাতিসংঘ গৃহীত গাজা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ব্যাবহারিক ক্ষেত্রে ঠিক কতটা কার্যকর হবে? তার থেকেও বড় প্রশ্ন, এতে করে কি এই যুদ্ধে বিশেষ কোনো প্রভাব পড়বে?

গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাশ সত্ত্বেও এনফোর্সমেন্ট মেকানিজম (চুক্তি বলবত্ করা) কঠিন হবে বলেই প্রতীয়মান। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদের কোনো প্রস্তাব পাশ হলে জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্রের জন্য তা মানা বাধ্যতামূলক। অর্থাত্, এই আইন ইসরাইলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, প্রযোজ্য জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও। তবে দুঃখজনক হলো, প্রস্তাব পাশের পর ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই প্রস্তাব তারা মানবেন না। গাজায় কোনোভাবেই যুদ্ধবিরতি দেওয়া হবে না। একই ভাষ্য ইসরাইলের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী মহলের। যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাশের পরপরই গাজায় হামলা চালিয়ে এর জানানও দিয়েছে ইসরাইল। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও হামাস অবশ্য যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে।

যাহোক, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর স্বভাবতই ক্ষুব্ধ হয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়াামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় যুক্তি দিয়ে বলেছে, এর ফলে হামাসের কাজ সহজ হয়ে উঠবে। তেল আবিবের দাবি, এর মধ্য দিয়ে ইসরাইলের ওপর যে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হবে, তাতে করে হামাসের হাতে আটক ইসরাইলি জিম্মিদের মুক্তির পথ অবরুদ্ধ হয়ে উঠবে।

জাতিসংঘে গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাশ একদমই ফলদায়ক হবে না, তেমনও নয়। বলা যায়, এর ফলে গাজায় আটকে পড়া লাখ লাখ ফিলিস্তিনির জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি নেমে আসবে। অবশ্য নিরাপত্তা পরিষদের হাতে যুদ্ধবিরতি আইন কার্যকর করার যথেষ্ট ক্ষমতা বা সুযোগ থাকলে পরিস্থিতি ভিন্নরকম হতেও পারত।

যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে গুরুত্বসহকারে বলা হয়েছে, গাজা উপত্যকায় জরুরি ও প্রয়োজনীয় মৌলিক পরিষেবা এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ইসরাইলকে। যদিও ইসরাইলের তরফ থেকে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়নি এখনো অবধি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, রেজল্যুশন মেনে চলতে ইসরাইলকে বাধ্য করার প্রশ্নে সামরিক পদক্ষেপ প্রায় অসম্ভব বটে, কিন্তু অন্য রাস্তাও খোলা আছে সেক্ষেত্রে! জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলো ইসরাইলের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করা কিংবা কূটনৈতিক মিশন ও সমর্থন প্রত্যাহার করার মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসরাইলকে যুদ্ধবিরতির আইন মানতে বাধ্য করতে পারে।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই রেজল্যুশনে কেবল ‘গাজা উপত্যকায়’ মানবিক সহায়তার প্রবাহ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই পয়েন্টের ফায়দা লুটতে পারে ইসরাইল। কেননা, অবরুদ্ধ গাজাবাসী শুধু গাজা উপত্যকাতেই দুর্ভোগে নেই, বরং আরো কিছু এলাকায় তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাছাড়া বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে যেসব ত্রাণবাহী যানবাহন প্রবেশের পথে, তা-ও পড়তে পারে ইসরাইলি বাধার মুখে। আমরা দেখে আসছি, ত্রাণবাহী শত শত ট্রাক সীমান্তে আটকে দিচ্ছে ইসরাইলি সেনারা। ত্রাণের পাশাপাশি রাফাহ ও কেরেম শালোম সীমান্ত ক্রসিংয়ে আটকে আছে গাড়িভর্তি অক্সিজেন সিলিন্ডার, ভেন্টিলেটর, স্লিপিং ব্যাগ, খেজুর এবং মাতৃত্বের কিটের মতো উপকরণ। ইসরাইলি সেনারা এসব উপরকরণ সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করা চালিয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। রেজল্যুশনে এসব নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু উল্লেখ করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

এই যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাশের ফলে অন্তত একটা ক্ষেত্রে বেশ কাজ হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটদানে বিরত থাকার ফলে তেল আবিব ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একধরনের তিক্ত সম্পর্ক লক্ষ করা যেতে পারে আগামী দিনগুলোতে। মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সমর্থনের ক্ষেত্রে এটা এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনও বটে। এর মধ্য দিয়ে ইসরাইলি সরকারের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের এই স্পষ্ট বার্তা গেল যে, বাইডেন প্রশাসনের বারবার নিষেধ সত্ত্বেও গাজায় ইসরাইলের বিরতিহীন হামলার ফলে নেতানিয়াহু সরকার ওয়াশিংটনের রেড লাইনে পড়েছে। যাহোক, নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাশের পর সম্ভবত কাতার ও মিশরের নেতৃত্বে আলোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরির মধ্য দিয়ে আমরা নতুন কিছু দেখলেও দেখতে পারি! উল্লেখযোগ্য কোনো চুক্তিতে আসার জন্য উভয় পক্ষের ওপর বৃহত্তর চাপ সৃষ্টি হতে পারে আগামী দিনগুলোতে।

আরেকটা পয়েন্ট, হামাসের সবশেষ প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—কার্যকর যুদ্ধবিরতি, গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহার, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের প্রত্যাবর্তন এবং ইসরাইলি জিম্মিদের বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি প্রদানের মতো বিষয়। যেহেতু রেজল্যুশনে এসব নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই, ফলে এক্ষেত্রে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। কীভাবে? সহজ করে বলছি।

হামাসের হাতে আটক থাকা ইসরাইলিদের বিনিময়ে ঠিক কত জন বন্দিকে ফেরত চাইবে হামাস, তা স্পষ্ট নয়। সমস্যা দেখা দিতে পারে মূলত এ নিয়েই। ২০১১ সালে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে বন্দিবিনিময়ের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? গিলাদ শালিত্ নামক এক ইসরাইলি সেনাকে মুক্তির বিনিময়ে ১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি বন্দিকে ছাড়তে রাজি হয়েছিল তেল আবিব। গভীরভাবে লক্ষণীয়, ইসরাইল সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ছোটখাটো অপরাধেই গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করছে। জানা যাচ্ছে, হামাস কমপক্ষে ১০০ ইসরাইলিকে জিম্মি করে রেখেছে। এই অবস্থায় আটক ইসরাইলিদের মুক্তির বিনিময়ে হামাস কত জন ফিলিস্তিনির মুক্তির শর্ত জুড়ে দেয়, সম্ভবত সে কারণেই এভাবে বিপুলসংখ্যক ধরপাকড় চালাচ্ছে ইসরাইলি সেনারা।

যুদ্ধবিরতি গুরুত্বপূর্ণ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এক্ষেত্রে চুক্তির বিষয় ও শর্ত হতে হবে সুস্পষ্ট। যুদ্ধবিরতির পর আন্তর্জাতিক আইন লংঘনের ঘটনা যেন না ঘটে, সে বিষয়েও নজর দেওয়া দরকার। সত্যি বলতে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাশ হলেও এ নিয়ে তেমন কোনো দরকষাকষির সুযোগ থাকে না। যদিও এক্ষেত্রে অনেক কিছুু করার সুযোগ থাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে।

পরিশেষে বলতে হয়, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাশ ‘মন্দের ভালো’। এর মধ্য দিয়ে সহিংসতা বন্ধে কার্যকর গ্রহণের পথের সন্ধান সহজতর হয়ে উঠবে। আরো অর্থবহ ও ব্যাবহারিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাশের সম্ভাবনা তৈরি হবে। অবশ্য পক্ষগুলো এই প্রচেষ্টা কতক্ষণ ধরে রাখবে, সেটাই আসল কথা!

লেখক :মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির পোস্ট ডক্টরাল রিচার্চ ফেলো

দ্য কনভারসেশন থেকে অনুবাদ :সুমৃত্ খান সুজন

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন