সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বিশ্বভারতীতে এক দিন

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৪, ০৬:৩০

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের  লিড প্রতিষ্ঠান, তা-থই নৃত্যকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ অর্পিতা বিশ্বাসের আমন্ত্রণে এবার বোলপুর যাওয়া। তার আয়োজিত বসন্ত উত্সব ছিল ১৭ মার্চ। এবারই প্রথম বোলপুরের শান্তিনিকেতনে যাওয়া। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শতাব্দী এক্সপ্রেস নামের ট্রেনটি গিয়ে দাঁড়াল বোলপুর রেলওয়ে স্টেশনে। নামামাত্রই ফোন পেলাম যুবক  প্রভাকর ঘোষের। 

আয়োজকরা এই যুবককে আমার গাইড হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন। প্রথমে আবাসনে, এরপর বিকালবেলায় ঘুরে দেখার পালা। প্রভাকরের শিক্ষাদীক্ষা স্নাতক পাশ। টটো চালান বোলপুরের শান্তিনিকেতনে। সবুজ শ্যামলিমায় পরিপূর্ণ এক অপূর্ব গ্রাম শান্তিনিকেতন! গ্রামটির জন্মকথাও বেশ মজার। বীরভূম জেলার ভুবনডাঙ্গা। এই গ্রামে বসবাস করত ভুবন নামক এক কুখ্যাত ডাকাত, এই ডাকাতের নামেই ঐ গ্রামের নাম হয় ভুবনডাঙ্গা।

কালের আর্বতে গ্রামটি এখন শহর, নাম যার বোলপুর। ময়ূরাক্ষী নদীর উপনদী ‘কোপাই’। যে নদীটি শান্তিনিকেতন, বোলপুর, কঙ্কালীতলা ও লাভপুরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত। বোলপুর প্রকৃতির এক স্বর্গীয় শহর। এই শহরের হূিপণ্ডই রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন। ১৮৬২ মন্বন্তরে ১৮৬৩ সালের দিকে রবীন্দ্রনাথের বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ প্রখর এক দুপুরে রায়পুরে যাচ্ছিলেন, পথে লালচে মাটির বোলপুর (ভুবনডাঙ্গায়) পৌঁছালে তিনি ক্লান্ত  হয়ে পড়েন। বিশ্রাম নেন  ছাতিমতলায়। জায়গাটি তার পছন্দ হয়।

এই জমিটি  ছিল  তত্কালীন রায়পুরের জমিদারদের। পরে তিনি ছাতিমগাছসহ ঐ জায়গা তাদের কাছ থেকে কিনে নেন। গড়ে তোলেন উপাসনা ও প্রতীক্ষালয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোট থেকে  বাবার সঙ্গে বোলপুরে আসা-যাওয়া করতেন। আসা-যাওয়া সুবাদে ১৯০১ সালে যিনি ওখানে ব্রহ্ম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৫ সালে কবির বাবা মারা যান। পরে ব্রহ্ম বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে ১৯১৮ সালে ২৩ ডিসেম্বর কবি নিজের হাতে  বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। চলছে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আশ্রম ও গবেষণাকেন্দ্র।

পাখপাখালির কলকাকলি-মুখরিত শান্তিনিকেতনে সন্ধ্যা নামে ঝিঁঝি পোকার ডাকে। বাতাসে কান পাতলে ভেসে আসে রবীন্দ্রনাথের গানের সুর। বিকেল হলেই খোয়াইয়ের হাট, কোপাই নদীর পাড়, বাউলের একতারা, দোতারা, খমক, খঞ্জরি, মন্দিরা ও ঢোলের তালে উত্তাল হয়ে ওঠে। পূর্ণিমা রাতের সোনাঝুরির রূপলাবণ্যে মেতে ওঠে সাহিত্যপ্রেমীরা। এখানকার বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, আম্রকানন, ছাতিমতলা, তালগাছ, রবি ঠাকুরের বাড়ি, পৌষমেলার মাঠ, সৃজনী শিল্পগ্রাম প্রতিটিই সাহিত্যসাধকদের রসদ। ২০০৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সবুজে ঘেরা কারুকার্য খচিত সৃজনী শিল্পগ্রাম। যেখানে শোভা পাচ্ছে ওড়িশা, বিহার, সিকিম, অসমসহ সাত রাজ্যের শিল্প এবং আন্দামান নিকবর দ্বীপপুঞ্জের নিদর্শন।

প্রতীক হিসেবে রয়েছে প্রতিটি রাজ্যের একটি করে কুটির। ভাবার্থে লক্ষণীয় রামকিঙ্কর বেচ নির্মিত ভাস্কর্য ‘আদিবাসী পরিবার’। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের সুসজ্জিত বাড়ি ‘প্রতীচি’ ঘিরে রয়েছে নানা কাহিনি। বর্তমানে ৩ হাজার ৬০০ বিঘা (১২০০ একর) জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতন গ্রামটিকে গত ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ইউনেসকো তাদের ৪৫তম অধিবেশনে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান’ হিসেবে  স্বীকৃতি দিয়েছে। সারা বছরই শান্তিনিকেতনে উত্সব চলে, তবে ফাগুনের বসন্ত উত্সব এবং তীব্র শীতের পৌষমেলা এখানকার সর্ববৃহত্ ও আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান। এই দুই অনুষ্ঠান ঘিরে দেশ-বিদেশের গুণীজন এবং পর্যটকদের মহামিলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি।

১৭ মার্চ ভরদুপুর, একেক করে সৃজনী শিল্পগ্রামে প্রবেশ করছেন সাহিত্যপ্রেমী ও সাহিত্যসেবীরা। নাট্যকার ও শিশুসংগঠক হিসেবে আমাকে আয়োজকরা অতিথি করেছেন। এ বছর আমিই ভিনদেশী অতিথি। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত ভাবনা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক কে এস নারায়ণ থিরুভাল্লি। যিনি কেরালার মানুষ, বাংলা বোঝেন, তেমনটা বলতে পারেন না। তিনি বাংলাদেশে বেড়াতে আসার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে অর্ধশতাধিক নৃত্যশিল্পীর অংশগ্রহণে নৃত্যশোভা যাত্রা।

এক এক করে পরিবেশিত হয় রাগপ্রধান যন্ত্রসংগীত, নৃত্যনাট্য, বসন্ত, রবীন্দ্র, লোকনৃত্য এবং ভরতনাট্যম। অধ্যক্ষ অর্পিতা বিশ্বাস গ্রন্থিত এবং পরিচালিত উত্সবটি প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করছেন  জিনিয়া ব্যানার্জী। পুরো অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা শিক্ষণীয়। অন্যান্য  অতিথির মধ্যে উপস্থিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়, নৃত্যকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্রী বসন্ত মুখোপাধ্যায়, ইজেসিসি শিল্পগ্রামের অফিসার ও ভরতনাট্যম প্রতিবেদক শ্রী অমিত অধিকারী, বিশ্বভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত ভাবনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. কৌস্তভ কর্মকার, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও মিউজিক থেরাপিস্ট শ্রীমতী ঈশিতা মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও গানবাড়ির অধ্যক্ষ ড. অর্পণ রক্ষিত ও আন্তর্জাতিক লোকনৃত্যশিল্পী শ্রী সুমন মণ্ডল। অনুষ্ঠানে এসেছেন রবীন্দ্রসংগীতের গায়ক, সহচরী নামক এক সংগীতসেবী প্রতিষ্ঠানের অনুপ্রেরক, বিজ্ঞান ও সাহিত্যবিষয়ক আলাদা দুটি প্রকাশনার কর্ণধার আশি বছর বয়স্ক শ্রী শ্রীবিন্দু মুখার্জী। যিনি অনুযোগের স্বরে বললেন, ‘শিল্প-সাহিত্যে বিনিময়ে  ভারত-বাংলাদেশ মনে হয়  এখনো যথেষ্ট পিছিয়ে আছে।

’ কারণ হিসেবে তিনি জানালেন, ‘বাংলাদেশের একুশের বইমেলায় ভারতের প্রকাশকদের বই ডিসপ্লে করতে দেয় না।’  অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে অন্যান্য গুণীজনের সঙ্গে কথা বলেছি, জেনেছি শান্তিনিকেতনের উত্সব ঘিরে এখানকার জনমানুষের জীবনযাত্রার প্রকৃতি ও ধরন। আলাপচারিতায় স্পষ্ট হয়েছে, সাহিত্য শুধু বিনোদন কিংবা মনের খোরাকই নয়, সাহিত্য মানুষকে সুন্দর, সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখে এবং উপার্জনের সুবিশাল ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বীরভূম জেলা তথা বোলপুরের লাখো মানুষের বর্তমানে আয়-রোজগারের অন্যতম ক্ষেত্র শান্তিনিকেতন গ্রামটি। কেননা, এই গ্রামকে ঘিরে প্রতিনিয়ত বসছে হাট, মেলা।

লেখক :শিক্ষক ও শিশু সাহিত্যিক

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন