সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

শব্দদূষণ ও একটি মোরগের কাহিনি

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৪, ০৭:৩৫

আওয়াজ ও শব্দনির্ভর আমাদের জীবন। এখানে আওয়াজ না দিয়ে কেউ কিছু করতে পারে না। হকার-ফেরিওয়ালারা আওয়াজ করেন। নেতানেত্রীরা উচ্চ স্বরে ভাষণ দেন। এসব দেখেই কি না, আমাদের দেশের বেওয়ারিশ কুকুরগুলোও রাতের বেলা সমবেত কণ্ঠে উচ্চ স্বরে ডাকাডাকি করে। মানবদরদি, ধর্মসাধকরাও এ দেশে সাড়ম্বরে ঢাকঢোল পিটিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পছন্দ করেন। কবি বলেছিলেন, ‘জানাইয়া কিছু কর যদি দান তাহাতে পুণ্য নাই।’ আর আমাদের দেশে না জানিয়ে কেউ দানখয়রাত করে না। মাইক ও ক্যামেরা নিয়ে, সবাইকে জানান দিয়ে তবেই দানখয়রাত করা হয়। আর ধর্মচর্চা তো এ দেশে যেন শব্দচর্চা! অতীতে মানুষ ধর্মচর্চা করত বন-জঙ্গলে-পাহাড়-গুহায় নির্জনে। কেননা আত্মমগ্ন হয়ে ঈশ্বরের আরাধনা বা ধ্যান করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে ধর্মচর্চা হয় সবচেয়ে বেশি আওয়াজ করে। আমরা কথাও বলি চেঁচিয়ে। চেঁচিয়ে কথা না বললে আমাদের অস্তিত্ব যেন প্রমাণ হয় না।

বায়ুদূষণে তো আমরা নাম্বার ওয়ান আছিই, শব্দদূষণেও আমরা সীমা ছাড়াচ্ছি। ফলে আমাদের ভবিষ্যত্-প্রজন্ম এক ভয়াবহ পরিণামের দিকে এগোচ্ছে। হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তা আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়নি। ফলে নগরে, শহরে, বন্দরে, অলিগলি, হাইওয়েতে হাইড্রলিক হর্ন দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। অথচ আধুনিক বিশ্বে হর্ন ব্যবহার উঠে গেছে, হর্ন ব্যবহার করলে সবাই মনে করে সে কোনো বিপদে পড়েছে। আর আমাদের দেশে হর্ন ব্যবহারের পরও কেউ সরে না। বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে দেখে মাত্র।

একজন মানুষের স্বাভাবিক শব্দ গ্রহণের মাত্রা ৪০-৫০ ডেসিবেল। কিন্তু আমাদের রাজধানীতে দিনের বেলা শব্দের মাত্রা ৮৫ ডেসিবেলের নিচে নামে না, অনেক সময় তা আরো বেড়ে যায়। বিধিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না। বাণিজ্যিক এলাকায় তা যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ ডেসিবেল। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের আশপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা রয়েছে।

কিন্তু কে শোনে কার কথা, কে মানে আইন? রাস্তায় সমস্বরে হর্ন বাজে। এলাকায় এলাকায় বিল্ডিংয়ে-ছাদে নিয়মিত গায়ে হলুদ, বিয়ে, পার্টি, ব্যান্ডসংগীত হয়। ১০০ ডেসিবেলেরও বেশি শব্দে হিন্দি গান বাজে। অন্যদিকে নতুন ফ্ল্যাট উঠছে কোনো সময় নির্ধারণ না করে, দিনরাত ২৪ ঘণ্টা কাজ হচ্ছে। ছাদ ঢালাই এবং পিলার তৈরির জন্য মসল্লা তৈরি হচ্ছে, মোজাইক করা হচ্ছে, গরগরকরকর আওয়াজ হচ্ছে। এটাও ১০০ ডেসিবেলের কম না। কর্মজীবী মানুষ রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। রোগীরা বিশ্রাম নিতে পারে না।

মাথা ধরা, হার্টের অসুখ, কানে কম শোনা, খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদি নানা উপসর্গ এখন শহুরে মানুষদের কাহিল করছে। এসবের মূল কারণ এই মাত্রাতিরিক্ত শব্দ। কিন্তু এই শব্দদূষণের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। নেই কোনো ব্যবস্থা।

তবে সম্প্রতি মাহবুব কবির মিলন নামে এক ব্যক্তি মোরগের ডাকের বিরুদ্ধে ‘জেহাদ’ ঘোষণা করে সংবাদ-শিরোনাম হয়েছেন! অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসর নেওয়া এই ব্যক্তি বাস করেন ঢাকার মোহাম্মদপুরে। সেখানে মোরগের ডাকে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার কারণে তিনি প্রতিবেশীদের মোরগ পালন বন্ধ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

মুরগি ডাকে না বলে তা নিয়ে আপত্তি নেই মিলন সাহেবের। তবে আপত্তি মোরগ নিয়ে। তাই প্রতিবেশীদের মোরগ পালন বন্ধ রাখতে লোক পাঠিয়েছেন তিনি। থানায় মামলা করার হুমকিও নাকি দিয়েছেন। এই হুমকির পর নিজের বিরক্তির অবসান ঘটেছে মিলনের। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এরপর সব বাসায় মোরগ সরিয়ে ফেলেছে। এখন কোনো সমস্যা নেই, শব্দদূষণ রোধে এভাবেই প্রতিবাদ করা উচিত সবার।’

কথা হলো, মিলন সাহেব বিভিন্ন গাড়ি, মোটরসাইকেলের হর্ন, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, নির্মাণযন্ত্র, মাইক, উচ্চ শব্দের সাউন্ড সিস্টেমের আওয়াজ বাদ দিয়ে মোরগের ডাকের ওপর এত ক্ষিপ্ত হলেন কেন? প্রায় ৮ হাজার বছর থেকেই তো মানুষের ঘুম ভাঙছে মোরগের ডাকে! কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে শব্দদূষণের অভিযোগ কখনো কেউ এনেছে বলে শোনা যায়নি।

এদিকে মোরগের ডাকের কারণে শব্দদূষণের ক্ষেত্রে কোনো আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আছে কি না, এটা জানতে এক রসিক গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৈয়দ আহম্মদ কবীরের কাছে জানতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় কোনো যন্ত্র বা ডিভাইস দ্বারা উত্পাদিত শব্দের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করলে, সে বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা আছে। কিন্তু মোরগের ডাকের মাধ্যমে শব্দদূষণের বিষয়ে কিছু বলা নেই।’

বিষয়টা সত্যিই দুশ্চিন্তার। বাংলাদেশে কত বিষয়ে কত বিচিত্র সব আইন আছে, অথচ চিত্কার করা মোরগের ব্যাপারে আইনে কোনো দিকনির্দেশনা নেই! আমাদের দেশের আইনপ্রণেতাদের বিষয়টি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার সুযোগ আছে। প্রয়োগ না হোক, আইন থাকতে অসুবিধা কী?

তবে অনেকে এ কথাও বলছেন যে, মোরগের বিরুদ্ধে মোরগের ডাকের বিরুদ্ধে মিলন সাহেবের এতটা চটে যাওয়া উচিত হয়নি। মানবসমাজে মোরগের অবদান কোনোমতেই তুচ্ছ নয়। যদিও আমাদের দেশে শখ করে কিংবা মাংসের চাহিদা পূরণের জন্য মোরগ-মুরগি পালনের প্রবণতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আগে গ্রাম থেকে শহরে মোরগ-মুরগি ও ডিম রপ্তানি হতো, এখন বিদেশ থেকেই আমদানি করতে হয়। এগুলো এখন গৃহস্থের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে বাণিজ্যিক লাভের আশায় খামারি ব্যবসার অংশ হয়ে গিয়েছে!

মোরগ-মুরগি গৃহস্থের পচা, বাসি, উচ্ছিষ্ট খাদ্যকণা খেয়ে গৃহস্থকে মিতব্যয়ী রাখে। এছাড়াও বাড়ির আশপাশের ঝোপজঙ্গলের পোকামাকড় খেয়ে গৃহস্থের বাড়তি উপদ্রব কমায়। খাদ্য তালাশের কারণে, গৃহস্থের বাড়ির চারপাশের হালকা পচা মাটি, নখ দিয়ে উলটিয়ে শুকিয়ে ঝরঝরে করে ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।

ছোটবেলায় ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগে মোরগের ডাকে আমাদের ঘুম ভাঙত। মোরগের ডাক শুনে আমরা বুঝতাম যে রাত পোহাবার আর বেশি বাকি নেই। যদিও আধুনিক মানুষ মোরগ-পোলাও পছন্দ করলেও মোরগের ডাক পছন্দ করে না। যেমন করেন না মিলন সাহেব! 

ছোটবেলায় সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘একটি মোরগের কাহিনী’ পড়তে গিয়ে সেই মোরগটির পরিণতির কথা ভেবে বেশ খানিকটা দুঃখবোধ হয়েছিল। সেখানে অবশ্য তার জীবনের অধিকারের বেশি আর কিছু ভাবার অবকাশ ছিল না। আসলে গল্পের মোরগ তো আর শুধু মোরগ হয়েই থাকে না। সে হয়ে ওঠে অনেকের, অনেক কিছুর প্রতিভূ। সমাজের খানিকটা অংশের আয়নাও। তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্যদীর্ণ গদ্যময় জীবনে, ক্ষয়িত সমাজব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই বেঁচে থাকার অধিকারটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।

যাহোক, মোরগবিষয়ক আলোচনার শেষ প্রান্তে এবার দুটি পুরোনো গল্প বলা যাক। এক ব্যক্তি মুরগির খামার দিয়েছেন। কিন্তু মুরগি ঠিকমতো ডিম দেয় না। একদিন রেগে গিয়ে ঐ ব্যক্তিটি মুরগিদের বলল, ‘কাল থেকে প্রত্যেকে যদি দুটি করে ডিম না দিস, তবে জবাই করে খেয়ে ফেলব!’

পরদিন ঐ ব্যক্তিটি খামারে গিয়ে দেখল যে, সব মুরগি দুইটি করে ডিম দিয়েছে। কিন্তু দুটি মুরগি একটি করে ডিম দিয়েছে।

প্রথম মুরগিকে ব্যক্তিটি বলল, ‘কিরে তুই একটা ডিম পেড়েছিস কেন?’

মুরগি বলল, ‘আমি দুটি ডিমই পেড়েছিলাম স্যার, কিন্তু একটি  ডিম চুরি হয়ে গেছে!’

পরের মুরগিকে সে বলল, ‘ওর তো ডিম চুরি হয়ে গেছে। তোর কী সমস্যা’

পরের মুরগি মাথা নিচু করে বলল, ‘আমি তো মোরগ হয়েও একটি ডিম দিয়েছি। আমার কাছে আর  কী আশা করবেন স্যার!’

পরিশেষে এক কাক আর মোরগের গল্প।

একটি দাঁড়কাক নিয়মিত একটা গাছের মগডালে বসে বসে ঝিমায়। কিছুই করে না। একদিন এক মোরগ এসে সেই গাছের তলায় দাঁড়াল। দাঁড়কাককে জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা কাক ভায়া, তুমি যে সারা দিন এমন বসে বসে ঝিমাও, তোমার খারাপ লাগে না?’ কাক জবাব দেয়, ‘খারাপ লাগবে কেন? আমার তো বেশ ভালোই লাগে। বসে বসে কত কী যে চিন্তা করি! মাঝে মাঝে নিজেকে কবি ও দার্শনিক মনে হয়।’

মোরগ বলে, ‘আমারও খুব ইচ্ছে করে, কোনো কিছু না করে মাঝে মাঝে তোমার মতো ঝিমোই।’ কাক বলে, ‘ইচ্ছে করছে তো ঝিমোও। কে তোমাকে বারণ করেছে?’

এই কথা শোনার পর মোরগও বসে বসে ঝিমোতে লাগল। আহা ঝিমোনোতে কী শান্তি!

কাছাকাছি একটা শেয়াল ছিল ওত পেতে। মোরগটাকে ঝিমোতে দেখে সে সুযোগ বুঝে আক্রমণ করল এবং মোরগটার ঘাড় কামড়ে ধরে ছুটে পালাল!

গল্পের মর্মার্থ কী? যদি তুমি কোনো কিছু না করে কেবল ঝিমোতে চাও, তবে অবশ্যই তোমাকে অনেক অনেক উঁচুতে অবস্থান করতে হবে!

লেখক: রম্যরচয়িতা

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন